Ajker Patrika

টেলিগ্রাফের নিবন্ধ

হেঁটেও যেভাবে সবচেয়ে সফল ‘ওয়াকিং ফুটবলের অবিসংবাদিত রাজা’ মেসি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হেঁটেও যেভাবে সবচেয়ে সফল ‘ওয়াকিং ফুটবলের অবিসংবাদিত রাজা’ মেসি
গোল না পেলেও জোড়া অ্যাসিস্ট করেছেন লিওনেল মেসি। ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্টে এবারের বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তিনিই সবার ওপরে। ছবি: এএফপি

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনোই লিওনেল মেসির মতো এত বেশি বয়সী কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়—অর্থাৎ, গোলকিপার বাদে বাকি সবাই—এমন বিস্ময়কর প্রভাব ফেলতে পারেননি। ৩৯ বছর বয়সেও আর্জেন্টিনার পাঁচটি ম্যাচে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর এখনও অমলিন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, দিন দিন আরও বেশি শারীরিক সক্ষমতানির্ভর হয়ে ওঠা এই খেলায় মেসি কীভাবে তা করছেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে বলের দিকে নয়, বরং পুরো ম্যাচজুড়ে চোখ রাখতে হবে ছোটখাটো গড়নের ১০ নম্বর জার্সিধারী মানুষটির দিকে। খুব দ্রুতই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ম্যাচের অধিকাংশ সময় মেসি হয় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন, নয়তো ধীর পায়ে হাঁটেন।

একসময় তিনি ছিলেন বিশ্বের সেরা ড্রিবলার, পাসদাতা এবং ফিনিশার। এখন সেই তালিকায় আরেকটি পরিচয় যুক্ত হয়েছে। তিনি সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর ‘হাঁটাহাঁটি করা’ ফুটবলার। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপে মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তাঁর শক্তি সঞ্চয় করে রাখার ক্ষমতা এবং আক্রমণের জন্য নিখুঁত মুহূর্তটি বেছে নেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা। তিনি এখন এমন এক ফুটবলার, যিনি ম্যাচের অধিকাংশ সময় নিজেকে সংযত রাখেন, আর প্রয়োজনের মুহূর্তে কয়েক সেকেন্ডের বিস্ফোরক গতিতে পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন। এদিকে তাঁর সতীর্থরা নিজেদের শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি নিংড়ে দেন, যেন মেসির শরীরে সেই প্রয়োজনীয় শক্তিটুকু অক্ষুণ্ন থাকে।

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে মেসি মোট ৩৫ হাজার ৮৬৮ মিটার বা প্রায় ৩৬ কিলোমিটার অতিক্রম করেছেন। এর মধ্যে ২২ হাজার ৯৫৮ মিটার, অর্থাৎ মোট দূরত্বের ৬৪ শতাংশই তিনি কাটিয়েছেন ‘জোন ওয়ান’ গতিতে, যেখানে গতি থাকে ঘণ্টায় ০ থেকে ৭ কিলোমিটার (৪ দশমিক ৩ মাইল)।

কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় শেষ ষোলোর ম্যাচে টেলিগ্রাফ স্পোর্ট একটি ভিন্নধর্মী পরীক্ষা চালায়। দ্বিতীয়ার্ধের ১৫ মিনিটের একটি নির্দিষ্ট সময়ে, মেসি যখনই প্রকৃত অর্থে দৌড় শুরু করেছেন, তখনই টাইমার চালু করা হয়েছে। সেই ১৫ মিনিটে তিনি মোট দৌড়েছেন মাত্র ৫১ সেকেন্ড। পুরো ৯০ মিনিটের হিসাবে সেটি দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ মিনিট। এটি নিখুঁত বৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়, কারণ প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিপক্ষ এবং পরিস্থিতি আলাদা। তবু এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, এবারের বিশ্বকাপে মেসি কতটা সংযত গতিতে খেলছেন।

গ্রুপ পর্ব শেষে টুর্নামেন্টের ৬১৮ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে গোলসংখ্যায় শীর্ষে ছিলেন মেসি। একই সময়ে প্রতি ৯০ মিনিটে সবচেয়ে কম দূরত্ব অতিক্রমকারী খেলোয়াড়ও ছিলেন তিনিই। অর্থাৎ, তিনি এমন এক বিরল ফুটবলার, যিনি সবচেয়ে কম শারীরিক পরিশ্রম করেও সবচেয়ে বেশি গোল করছেন। এর পেছনে যেমন রয়েছে তাঁর অসাধারণ ফুটবলবুদ্ধি, তেমনি রয়েছে তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক নিবেদিতপ্রাণ দল।

আরেকটি পরিসংখ্যান আরও বিস্ময়কর। বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচ শেষে মেসি মোট ২৯৮টি উচ্চগতির দৌড় (হাই-স্পিড রান) দিয়েছেন। অথচ কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই অন্য শীর্ষ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। হ্যারি কেইন দিয়েছেন ৬০০ বার, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ৫১৪ বার, উসমান দেম্বেলে ৪৭৭ বার, মিকেল ওইয়ারজাবাল ৪৬১ বার এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে ৩৩৬ বার। এই তালিকায় কেবল আর্লিং হালান্ডই কিছুটা কাছাকাছি ছিলেন, তাঁর উচ্চগতির দৌড়ের সংখ্যা ৩১৪ টি। অথচ নরওয়ের তৃতীয় ম্যাচে তিনি এক মিনিটও মাঠে নামেননি।

তবে এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে, যখন মেসিকে বাধ্য হয়ে নিজের গতি বাড়াতে হয়েছে। মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার শেষ ষোলোর ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটে তিনি যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ ধারণ করেন। দল ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ডান প্রান্তে সরে গিয়ে অনেকটা কৈশোরের সেই মেসির মতো খেলতে শুরু করেন। উইংয়ে বল পেয়ে একের পর এক ড্রিবলে প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করতে থাকেন। ৭৬ তম মিনিট থেকে ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বল স্পর্শ, সবচেয়ে বেশি শট, সবচেয়ে বেশি ড্রিবল এবং সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেন তিনিই।

ম্যাচ শেষে, আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের নায়ক হওয়ার পর, মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তিতে তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে, তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কেঁদে ফেলেন। ম্যাচটি জিততে তাঁকে নিজের সবটুকু নিংড়ে দিতে হয়েছিল। প্রথম চার ম্যাচে তিনি মোট ১৫টি ‘টেক-অন’ বা ড্রিবলের চেষ্টা করেছিলেন। অথচ শুধু মিসরের বিপক্ষের ম্যাচেই করেছেন ৯টি।

এই কৌশলের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ দেখা গেছে কেপ ভার্দের বিপক্ষে। আর্জেন্টিনার প্রথম গোলটি করার সময় হঠাৎ করেই যেন জেগে ওঠেন তিনি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পেছনে বজ্রগতিতে ছুটে যান। তিনি দৌড় শুরু করার মুহূর্ত থেকে বল জালে জড়ানো পর্যন্ত সময় লেগেছিল মাত্র তিন সেকেন্ড। আসলে এই তিন সেকেন্ডই যেন মেসির প্রয়োজন।

তবে এই কৌশল কার্যকর করতে হলে একটি দলের দুটি বিশেষ গুণ থাকতে হয়। প্রথমত, মেসির নিজের অসাধারণ খেলা পড়ার ক্ষমতা এবং কোথায় ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে তা বুঝে নেওয়ার দক্ষতা। দ্বিতীয়ত, বাকি নয়জন আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে মেসির সীমিত চলাফেরার ঘাটতি নিজেদের পরিশ্রম দিয়ে পূরণ করতে হয়। তাঁরা জানেন, মেসি যখন আক্রমণের মাঝের বিরতিতে শক্তি সঞ্চয় করছেন, তখন দলকে কার্যত ১০ জন নিয়ে রক্ষণ সামলাতে হবে।

এই দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি পালন করেন নিরলস পরিশ্রমী রদ্রিগো দি পল। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডের ডান পাশে খেলতে থাকা দি পল অধিনায়কের পেছনে নিরবচ্ছিন্নভাবে ছুটে চলেন। যেখানে মেসি ম্যাচের ৬৪ শতাংশ সময় ‘জোন ওয়ান’ গতিতে কাটিয়েছেন, সেখানে দে পল পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ৪৪ শতাংশ সময় এত ধীর গতিতে ছিলেন।

৪৬৮ মিনিট মাঠে থেকে মেসি মোট ৩৫ হাজার ৮৬৮ মিটার অতিক্রম করেছেন। প্রায় একই দূরত্ব, ৩৪ হাজার ৬৭৯ মিটার দি পল অতিক্রম করেছেন মাত্র ৩৪৭ মিনিটে। অন্যদিকে, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজ প্রত্যেকে প্রায় ৫০ হাজার মিটার করে দৌড়েছেন। ২০২২ বিশ্বকাপ থেকেই মজা করে দি পলকে মেসির ‘দেহরক্ষী’ বলা হয়। মেসিকে ফাউল করা হলে সাধারণত সবার আগে ছুটে যান তিনিই। মাঠের বাইরেও তাঁদের বন্ধুত্ব অত্যন্ত গভীর। গত গ্রীষ্মে দে পল ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়ে মেসির ক্লাবসঙ্গীও হয়েছেন।

পুরো মাঠজুড়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ছুটছেন, ঘাম ঝরাচ্ছেন, নিজেদের নিঃশেষ করে দিচ্ছেন একজন মানুষের জন্য। যেন পুরো দলটির অস্তিত্বই মেসিকে ঘিরে। আর সেই বিশ্বাস ও আত্মত্যাগের প্রতিদানও তিনি দিয়েছেন দারুণভাবে। পাঁচ ম্যাচে করেছেন আটটি গোল, সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট।

তিনি শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে শিরোপার চূড়ায় পৌঁছে দিতে পারবেন কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় এখনই নিশ্চিত করে বলা যায়, ফুটবলে হাঁটতে হাঁটতে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার শিল্পকে লিওনেল মেসি এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে ‘ওয়াকিং ফুটবল’ও রুদ্ধশ্বাস, মুগ্ধকর এবং অবিশ্বাস্যভাবে উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত