
আলী লারিজানি ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং মেধাবী ব্যক্তিত্ব। তিনি গত চার দশক ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিবর্তনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একজন কট্টরপন্থী পারিবারিক উত্তরাধিকারী হয়েও পশ্চিমা দর্শনে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁকে বিশ্বমঞ্চে একজন স্বতন্ত্র কৌশলী হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।

জন্ম
৩ জুন ১৯৫৮ সালে ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফে জন্মগ্রহণ করেন আলী লারিজানি। তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ মির্জা হাশেম আমোলি ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ের একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ ধর্মীয় পণ্ডিত।
তাঁর ভাই সাদেক লারিজানি দীর্ঘদিন ইরানের প্রধান বিচারপতি ছিলেন এবং মোহাম্মদ জাভেদ লারিজানি মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান ছিলেন। ২০০৯ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিন তাঁদের এই ব্যাপক প্রভাবের কারণে ‘কেনেডি পরিবার’ হিসেবে অভিহিত করে।
মাত্র ২০ বছর বয়সে লারিজানি মোর্তজা মোতাহহারির কন্যাকে বিয়ে করেন। মোতাহহারি ছিলেন ইসলামী বিপ্লবের প্রধান নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং বিপ্লবের প্রধান তাত্ত্বিকদের একজন। এই বিয়ে লারিজানির জন্য ক্ষমতার পথকে প্রশস্ত করে দেয়।

শিক্ষা
আলী লারিজানি ইরানের হাতেগোনা কয়েকজন নেতার একজন যারা ধর্মীয় শাসনের ভেতরে থেকেও পশ্চিমা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন এবং গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন। ১৯৭৯ সালে ইরানের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন আলী লারিজানি। পরে তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এমএ এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল ১৮শ শতাব্দীর জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট। কান্টের ‘যৌক্তিক নীতিবাদ’ তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়ই প্রতিফলিত হয়। রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে তাঁর অন্তত চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে।
রাজনৈতিক পথচলা
বিপ্লবের পর লারিজানি ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ডে (আইআরজিসি) যোগ দেন এবং পরে সরকারি পদে আসেন। তিনি প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানির অধীনে সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান ছিলেন। এ সময় সমালোচকেরা তাঁর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করার অভিযোগ তোলেন।
২০০৫ সালে লারিজানি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। কিন্তু শিগগিরই সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব এবং প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে নিযুক্ত হন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে ২০০৭ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।
লারিজানি ২০০৮ সালে কোম-এর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ভূমিকায়, তিনি ইরান ও বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির (আনুষ্ঠানিকভাবে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ নামে পরিচিত) সংসদীয় অনুমোদন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০২১ এবং ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট পদে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁকে বাধা দেয়। ওই সময় গার্ডিয়ান কাউন্সিলের পদক্ষেপগুলোকে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পেছনে ক্ষমতা সুসংহত করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। তা সত্ত্বেও, ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁকে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে পুনরায় নিয়োগ দেন।
রাজনৈতিক বিবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে লারিজানিকে একজন প্র্যাগম্যাটিক বা বাস্তববাদী নেতা হিসেবে দেখা হতো। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার অবস্থান বদলে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ২০২৫ সালের আগস্টে তাঁকে পুনরায় জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব পদে ফিরিয়ে আনেন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিকে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করে সব সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করেন, যা পশ্চিমাদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। অবশ্য ওই বছরের জুনে আলোচনা চলাকালে ইরানে একতরফা হামলা চালায় ইসরায়েল। এ সময় বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হন। ইরান অভিযোগ করে, আলোচনা ভেস্তে দিতেই ইসরায়েল বিনা উসকানিতে এই হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।
বর্তমান সংকটে ভূমিকা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর লারিজানি ইরানের অঘোষিত ‘সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে আবির্ভুত হন। অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বের প্রধান মুখ এবং যুদ্ধের কৌশলী হয়ে ওঠেন তিনি।
গতকাল ইসরায়েলি হামলায় নিহত হওয়ার আগে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলে, আমেরিকা ও ইসরায়েলি হামলা ইরানের ‘হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে’। ইরান এর এমন প্রতিশোধ নেবে যা ইতিহাসে নজিরবিহীন হবে। তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন, ইরান এখন আর কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করবে না।
লারিজানি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো দেশের মার্কিন ঘাঁটি যা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে, তা সরাসরি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে।
এক সময়ের নিভৃতচারী দার্শনিক আলী লারিজানি হয়ে উঠেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্রের প্রধান সেনাপতি। একদিকে তাঁর প্রজ্ঞালব্ধ কূটনৈতিক জ্ঞান এবং অন্যদিকে পূর্বপুরুষদের বিপ্লবী চেতনা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি ইরানকে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।

ইরানে যুদ্ধ সাম্প্রতিক সময়ে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি। এর সূচনা হয়েছিল আরও কয়েক দশক আগে। ১৯৫৩ সালের দমবন্ধ করা আগস্টে, সিআইএ কর্মকর্তা কারমিট রুজভেল্ট জুনিয়রের দপ্তরে। তিনি ছিলেন এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাতি এবং একটি অভ্যুত্থানের নকশাকার।
২৩ মিনিট আগে
শ্রীলঙ্কা ১৯৭০ সালে আরব রাষ্ট্রগুলোর চাপে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু দেশটির নির্মম গৃহযুদ্ধ শুরুর প্রায় এক বছর পর, ১৯৮৪ সালে কলম্বোয় মার্কিন দূতাবাসে একটি ইসরায়েলি ‘ইন্টারেস্টস সেকশন’ (স্বার্থরক্ষা দপ্তর) খোলা হয়।
৪ ঘণ্টা আগে
রাজনীতিক, নিরাপত্তাপ্রধান ও দার্শনিক আলী লারিজানি ছিলেন ইরানের এক ‘রেনেসাঁস মানব।’ ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারানো ৬৭ বছর বয়সী এই নেতা ইরানি রাষ্ট্রের অন্যতম বহুমুখী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সামরিক, আইনসভা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রজুড়ে তাঁর ছিল কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা।
৬ ঘণ্টা আগে
ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যেই এশিয়ায় আরেকটি সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে। নতুন এই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্ত। সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ বিমান হামলাকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক এখন খোলামেলা সংঘর্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
১৮ ঘণ্টা আগে