
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক আইনি ও প্রশাসনিক সংকটের জন্ম দিয়েছে ‘কাতারগেট’ কেলেঙ্কারি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের শীর্ষ সামরিক ও কৌশলগত উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে গোপন অপপ্রচার চালানো, গণমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং স্পর্শকাতর সামরিক গোয়েন্দা নথি ফাঁসের বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’ ও পুলিশের যৌথ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাস হামলার পর গাজা যুদ্ধ চলাকালে নেতানিয়াহুর একদম কাছের লোকজন কাতারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এবং ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর ভূমিকা ক্ষুণ্ন করতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হিসেবে কাজ করছিলেন।
সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে শুরু হওয়া এই তদন্তে ইতিমধ্যে নেতানিয়াহুর প্রধান কৌশলগত উপদেষ্টা জোনাথন উরিখ, সাবেক সামরিক মুখপাত্র এলি ফেল্ডস্টাইন এবং রাজনৈতিক প্রচারক ইসরায়েল ইনহর্নসহ একাধিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্বের নাম উঠে এসেছে।
এই কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনজন ইসরায়েলি এবং একজন সাবেক মার্কিন রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
এর মধ্যে ইসরায়েল ইনহর্ন একসময় তেল আবিবের ভূগর্ভস্থ নাইটলাইফের পরিচিত মুখ এবং মিউজিক প্রোডিউসার হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০১৭ সালে ‘পারসেপশন’ নামক একটি স্ট্র্যাটেজিক কনসালটিং ফার্ম গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির হয়ে টানা পাঁচটি নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনা করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।
আরেক সহযোগী জোনাথন উরিখ নেতানিয়াহুর প্রধান কৌশলগত উপদেষ্টা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞ। নেতানিয়াহুর দৈনন্দিন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। সহকর্মীদের মতে, ‘উরিখ হলেন নেতানিয়াহুর সকালের প্রথম ফোন এবং রাতের শেষ বার্তা।’
এ ছাড়া কট্টর ধারার তরুণ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এলি ফেল্ডস্টাইন আগে চরম ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের দপ্তরে কাজ করেছেন। ৭ অক্টোবরের হামলার মাত্র চার দিন পর নেতানিয়াহুর অফিসে সামরিক মুখপাত্র হিসেবে যোগ দেন তিনি।
অপরজন জে ফুটলিক সাবেক মার্কিন অভিনেতা এবং প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও জন কেরির সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক উপদেষ্টা। ২০১৯ সাল থেকে ওয়াশিংটনে নিবন্ধিত কাতার লবিস্ট হিসেবে ‘থার্ড সার্কেল’ নামের ফার্মের মাধ্যমে বার্ষিক ৫ লাখ মার্কিন ডলার চুক্তিতে কাজ করছিলেন।
২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আগে থেকেই ‘পারসেপশন’ ফার্মের মাধ্যমে কাতারের জন্য পিআর কাজ শুরু হয়েছিল। বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলোতে ‘কোশার’ (ইহুদি ধর্মীয় বিধানসম্মত) খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে—এমন প্রচার চালিয়ে দোহাকে ইহুদি-বান্ধব হিসেবে দেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল ভুয়া সংবাদ সাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট। বিশ্বকাপের পরও প্রতি মাসে ৪৫ হাজার ডলার দিয়ে এই চুক্তি বজায় রাখে কাতার।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজা যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী রিৎজ হোটেলে লবিস্ট জে ফুটলিক ও ইসরায়েল ইনহর্ন এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন।
বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলি জনমত পুরোপুরি বদলে দেওয়া। ৭ অক্টোবরের হামলায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হওয়ার পর সাধারণ জনগণ কাতারকে ‘হামাসের প্রধান অর্থদাতা ও শত্রু’ হিসেবে দেখছিল। লবিস্টদের লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলিদের চোখে কাতারকে হামাসের পৃষ্ঠপোষক থেকে এ অঞ্চলের ‘একমাত্র কার্যকরী শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী বা মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে দাঁড় করানো।
তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ইনহর্ন ও ফুটলিকের নির্দেশনায় নেতানিয়াহুর দপ্তরে থাকা উরিখ ও ফেল্ডস্টাইন যৌথভাবে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর প্রকাশ করতে শুরু করেন।
প্রচারের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল:
১. আমেরিকান সূত্রের ভুয়া উক্তি ব্যবহার: ইসরায়েলের জনপ্রিয় চ্যানেল ১২-এর প্রাইম টাইম সংবাদে সামরিক প্রতিবেদকদের মাধ্যমে প্রচার করা হতো যে, ‘বন্ধ দরজার আড়ালে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন—কাতার ছাড়া আর কোনো দেশ চুক্তি করাতে পারবে না।’ পরবর্তী সময়ে জানা যায়, এসব ব্রিফিং ছিল সম্পূর্ণ সাজানো।
২. দীর্ঘদিনের মিত্র মিসরের অবমূল্যায়ন: যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অংশীদার মিসরকে ‘অবিশ্বস্ত’ এবং ‘অক্ষম’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, যাতে মধ্যস্থতার সমস্ত কৃতিত্ব কাতারের ঝুলিতে যায়। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে কায়রো।
৩. হামাসের সঙ্গে দোহার কৃত্রিম দূরত্ব: আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে ভুয়া রিপোর্ট ছড়ানো হয়েছিল যে, কাতার দোহা থেকে হামাস নেতাদের বের করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে এবং তাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ।
এক একটি সাজানো খবর চ্যানেল ১২ বা অন্যান্য শীর্ষ মাধ্যমে সফলভাবে প্রচার হওয়ার পর ফেল্ডস্টাইন ও উরিখ একে অপরকে এসএমএসে লিখতেন, ‘আমরা যেন বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছি!’ এমনকি জে ফুটলিক বার্তা পাঠিয়ে ফেল্ডস্টাইনকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখতেন, ‘এলি, তোমরা দারুণ কাজ করছ!’
অস্ট্রেলিয়া, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলি বিভিন্ন মাধ্যম ও থার্ড পার্টি কোম্পানির সাহায্যে এই অর্থ লেনদেন পরিচালিত হতো। উরিখ সরকারের কাজ করার পাশাপাশি থার্ড পার্টি কোম্পানির মাধ্যমে প্রতি মাসে কাতারের তরফ থেকে অন্তত ১৮ হাজার মার্কিন ডলার পেতেন।
ফেল্ডস্টাইনকে একটি মধ্যস্থতাকারী সংস্থার মাধ্যমে বেশি বেতনের ব্যবস্থা করে দিয়ে এই চক্রে ধরে রাখা হয়।
ইনহর্ন ও ফেল্ডস্টাইন নিজেদের এনক্রিপ্টেড চ্যাটে আইনি নজরদারি এড়াতে সংকেত হিসেবে কাতারকে ‘রোগী’ (patients) বা ‘বন্ধু’ (friends) বলে সম্বোধন করতেন।
২০২৪ সালের আগস্টে রাফাহ শহরের একটি সুড়ঙ্গ থেকে হামাসের হাতে অপহৃত ছয় ইসরায়েলি জিম্মির লাশ উদ্ধারের পর ইসরায়েলজুড়ে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ক্ষুব্ধ লাখ লাখ নাগরিক রাস্তায় নেমে নেতানিয়াহুর পদত্যাগ ও অবিলম্বে জিম্মি চুক্তির দাবি জানায়।
সরকার যখন তীব্র রাজনৈতিক চাপে, তখন জনমত অন্যদিকে ঘোরাতে একটি চরম স্পর্শকাতর সামরিক গোয়েন্দা নথি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেনাবাহিনীর এক রিজার্ভ অফিসারের কাছ থেকে বেআইনিভাবে সংগৃহীত আরবি ভাষার একটি গোপনীয় নথি সামরিক সেন্সর বোর্ডের চোখ এড়িয়ে জার্মান ট্যাবলয়েড ‘বিল্ড’ (Bild)-এ ফাঁস করে দেওয়া হয়। খবরটিতে দাবি করা হয়—জিম্মি স্বজনদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে ইসরায়েলি সমাজকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করছে হামাস।
পরদিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু এই খবরের সূত্র ধরে আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করে বলেন, তারা হামাসের ফাঁদে পা দিচ্ছে। গোপন নথি ফাঁসের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার পর উরিখ ফেল্ডস্টাইনকে বার্তা পাঠিয়ে লিখেছিলেন, ‘বস ভীষণ খুশি।’
এই কেলেঙ্কারি সামনে আসার পর ইসরায়েলি রাজনীতি ও জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত ঘটনাটিকে দেশের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে মারাত্মক রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ বলে আখ্যায়িত করেন।
মোসাদের সাবেক প্রধান তামির পারদো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লোক অন্য একটি বিদেশি রাষ্ট্রের পে-রোলে কাজ করবে আর প্রধানমন্ত্রী তা জানবেন না—এটি অসম্ভব। আর যদি জেনে থাকেন, তবে তাদের বরখাস্ত না করে আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।’
তেল আবিব ও জেরুজালেমের মহাসড়কগুলোতে ‘কাতার সরকার গণহত্যা এবং নেতানিয়াহুর দপ্তরে অর্থায়ন করেছে’ লেখা সংবলিত বিশালাকার বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছিল।
তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি এই আইনি তদন্তকে একটি ‘ব্লাফ’ বা রাজনৈতিক প্রতারণা বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে কাতার সরকার এ-সংক্রান্ত সমস্ত অভিযোগকে ‘সাংবাদিকতার আড়ালে অপপ্রচার’ বলে নাকচ করে দিয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদপত্র ‘হারেৎজ’-এর সাংবাদিক বার পেলেগের অনুসন্ধানী নজরে উরিখ ও ইনহর্নের ২০২২ সালের একটি গোপন গুগল ডক নথি আসার পর শিন বেত তদন্ত জোরদার করে।
২০২৪ সালের শেষভাগে শিন বেতের সশস্ত্র কমান্ডোরা গভীর রাতে ফেল্ডস্টাইনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। টানা কয়েক সপ্তাহ তাঁকে কোনো আইনি সহায়তা ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের মার্চে উরিখ ও ফেল্ডস্টাইনকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।
বর্তমানে তাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে বেআইনি সম্পর্ক স্থাপন; জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা ও সামরিক নথি ফাঁস; আন্তর্জাতিক ঘুষ গ্রহণ ও অর্থপাচার এবং প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ বিচারাধীন।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর ক্যারিয়ারে বেশ কিছু দুর্নীতির মামলা থাকলেও, নিজস্ব দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিদেশি রাষ্ট্রের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা এবং গোয়েন্দা নথি অপব্যবহারের এই ‘কাতারগেট’ কেলেঙ্কারিই তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ও নৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্কার

জুলাইয়ের শেষ দিকে রাশিয়া আবারও ইউক্রেনের খাদ্য রপ্তানি অবকাঠামোয় হামলা চালায়। ক্রেমলিন ওদেসা বন্দরে থাকা পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। যার ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ শস্য করিডরের রপ্তানি সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে যায়। দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ইউক্রেন সরকারও এর জবাবে রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরে
৭ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ শুধু বাধাগ্রস্তই হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন দেশের তেল শোধনাগারও। ফলে শোধনক্ষমতার সংকট ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে পাম্পের ডিজেলসহ অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে।
১০ ঘণ্টা আগে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে সিলিকন ভ্যালির মূলমন্ত্র ছিল—দ্রুত এগিয়ে যাও, প্রয়োজনে ঝুঁকি নাও। কিন্তু মাত্র ১০ দিনের ধারাবাহিক কিছু ঘটনায় সেই ধারণাই বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
২ দিন আগে
প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নানা চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সংকট সমাধানে আবারও আঞ্চলিক কূটনীতির দিকে নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি মাসে ঢাকা জানিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার...
৪ দিন আগে