Ajker Patrika

হরমুজ যেভাবে ইরানের কাছে পরমাণু কর্মসূচির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৬: ০৫
হরমুজ যেভাবে ইরানের কাছে পরমাণু কর্মসূচির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল
ফাইল ছবি

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের কাছে এক ‘গোল্ডেন ওয়েপন’ বা ‘সোনালি অস্ত্র’ হয়ে উঠেছে। এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলেও সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত তেহরান। এমনকি যে পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সহ্য করেছে, তার চেয়েও এখন হরমুজ প্রণালিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে দেশটি।

ইরানের কৌশলে হরমুজ প্রণালি এখন এতটা গুরুত্বপূর্ণ যে চলতি সপ্তাহে তেহরানের অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে যাওয়া কয়েকটি জাহাজের ওপর গুলি চালানো হয়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা গুলি চালায়। এই সংঘর্ষের কারণে গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তি এখন হুমকির মুখে।

বহু বছর ধরে ইরান হুমকি দিলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেনি। কারণ, এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবহন করা হয়। কিন্তু এখন ইরানের নেতারা মনে করছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধে এটিই তাঁদের সবচেয়ে শক্তিশালী চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার। তাঁদের বিশ্বাস, হরমুজের কারণেই শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে নতুন ইরানি ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিন। সামনের একমাত্র পথ এটিই।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র জানিয়েছে, হরমুজকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও তেহরানে এই নীতি নিয়ে প্রায় কোনো মতবিরোধ নেই। একটি সূত্র বলেছে, ইরান এই ইস্যুতে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, কোনো যুক্তিসংগত দেশই এত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত সুবিধা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেবে না। তিনি আরও বলেন, ‘হরমুজ ইস্যু ইরানের জন্য এক সোনালি অস্ত্র, সেটিই এখন তারা ইরানের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।’

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর আবার হরমুজ দিয়ে বেশি জাহাজ চলাচল শুরু হয়। তবে প্রণালিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চুক্তিতে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট ভাষা রাখা হয়। সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের ফি বা টোল ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

ইরানের আলোচকদের মতে, এই ভাষার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের হরমুজ প্রণালি পরিচালনার অধিকার মেনে নিয়েছে। তবে দুই মাসের জন্য কোনো ফি বা টোল নেওয়া যাবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো এই ব্যাখ্যা মানে না। তাদের মতে, চুক্তির অর্থ শুধু এটুকুই যে ইরানকে নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে ইরান বলপ্রয়োগ করে প্রণালি নিয়ন্ত্রণ বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে।

পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এখন হরমুজ

হরমুজ নিয়ে ইরানের কঠোর অবস্থানের বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের গভীর অবিশ্বাস। ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আগের পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেন। এরপর গত গ্রীষ্মে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পরও চলতি বছরে আবার যুদ্ধ শুরু করেন। এ ছাড়া কূটনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যেই কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়া হামলা চালানোয় ইরানের অবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়।

এক জ্যেষ্ঠ সূত্র বলেছেন, হরমুজ নিয়ে ইরান যদি ছাড় দেয়, তাহলে ট্রাম্প পারমাণবিক কর্মসূচি, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে নতুন দাবি তুলবেন। তাঁর ভাষায়, ‘এটি হবে আত্মসমর্পণ, আর সেটা সম্ভব নয়।’

বহু বছর ধরে ইরান বলে আসছে, চাইলে তারা খুব সহজে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে পারে। একবার তারা বলেছিল, এটি করা ‘এক গ্লাস পানি পানের মতোই সহজ।’ তবে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছিলেন, তাঁরা এই পদক্ষেপ নিতে চান না এবং এটিকে শেষ বিকল্প হিসেবে দেখেন। কারণ, প্রণালি বন্ধ করলে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলো ও বিশ্বের বড় জ্বালানি ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হবে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর ইরানি কর্মকর্তারা মনে করেন, তাঁদের আর হারানোর কিছু নেই। এরপর তাঁরা নিজেদের জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেন। এর ফলে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

প্রথমে তেলের দামের প্রভাব নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে। শেষ পর্যন্ত হরমুজ অবরোধের অর্থনৈতিক ক্ষতি এত বেশি হয়ে যায় যে, উভয় পক্ষ আলোচনায় বসতে রাজি হয়। তবে একবার হরমুজ বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারার পর এখন ইরান মনে করছে, ভবিষ্যতেও এই ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারি বলেন, ‘দুই পক্ষই তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সমস্যায় ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে দুই পক্ষই মনে করছে, তারাই জিতেছে। তাই উভয়েই বিশ্বাস করছে, নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য আরেকটু চাপ দিলেই হবে।’

বর্তমানে ইরান পারমাণবিক ইস্যুর চেয়ে হরমুজ প্রণালিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার এবং দেশের ভেতরেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতকে লঘু করার অধিকার কার্যত মেনে নিয়েছে। প্রায় ২৫ বছর ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিরোধের বিষয় ছিল। এ কারণে দেশটির ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার প্রধান কারণ হিসেবেও এটিকেই তুলে ধরা হয়।

তবে যুদ্ধ শেষের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। রয়টার্সকে জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার ইরানের বলে স্বীকার না করা পর্যন্ত তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা শুরু করবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত