
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবস এসেছে। এবারের প্রতিপাদ্য অধিকার, ন্যায়বিচার, পদক্ষেপ—সব নারী ও মেয়েদের জন্য। জাতিসংঘ ঘোষিত এই প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হচ্ছে, নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, সেটার বাস্তব প্রয়োগও করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে, এই অধিকার আর ন্যায়বিচারের অভাবের কারণে কত নারী অকালে মারা যাচ্ছেন?
অকালমৃত্যু বলতে কী বোঝায়?
সহজ ভাষায়, কোনো দেশে মানুষের গড় আয়ু পূর্ণ করার আগেই যদি কেউ মারা যায়, সেটাকে অকালমৃত্যু বলে। আমাদের দেশে বর্তমানে নারীদের গড় আয়ু প্রায় ৭৭ বছর । তার আগে বিশেষ করে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মধ্যে কোনো নারীর মৃত্যু মানে সেটা অকালমৃত্যু। এই বয়সটা একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে কাজের ও সৃষ্টিশীল সময়।
বৈশ্বিক চিত্র আর বাংলাদেশের চিত্রে পার্থক্য যেখানে
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের নারীদের অকালমৃত্যুর কারণগুলো একটু ভিন্ন। উন্নত বিশ্বে নারীদের অকালমৃত্যুর প্রধান কারণ ক্যানসার। আমাদের দেশেও ক্যানসার একটি বড় কারণ, কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হয় মাতৃত্বকালীন জটিলতা, আত্মহত্যা আর হৃদ্রোগ।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে সফল হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণা বলছে, ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের মৃত্যুর চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। ২০১০ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, এই বয়সী নারীদের মৃত্যুর ২১.৩ শতাংশের কারণ ছিল ক্যানসার, ১৬. ৪ শতাংশ হৃদ্রোগ, আর ১৪.৩ শতাংশ মাতৃত্বকালীন জটিলতা। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মৃত্যুর ২২.১ শতাংশের কারণ আত্মহত্যা।
২০২৬ সালের চিত্র
২০২৬ সালেও বাংলাদেশের নারীরা ঠিক এই কারণে অকালে মারা যাচ্ছেন। অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। শুধু মৃত্যুর ধরন বদলেছে। একসময় নারীরা সন্তান প্রসব করতে গিয়ে বেশি মারা যেতেন। এখন সেটা কমলেও ক্যানসার আর হৃদ্রোগে মৃত্যু বেড়েছে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের কথা না ভাবায় আত্মহত্যার মতো ঘটনা থামছে না। আফ্রিকার কিছু দেশে নারীরা মাতৃত্বকালীন জটিলতায় মারা যাওয়ার আশঙ্কা ইউরোপের তুলনায় ১৩০ গুণ বেশি। বাংলাদেশ যদিও সেসব দেশের চেয়ে এগিয়ে, তবু আমাদের এখানে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস আর অপর্যাপ্ত সেবার কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মা মারা যাচ্ছেন।
আমরা চোখের সামনে দেখেও হয়তো এটা বুঝতে পারছি না যে অকালমৃত্যুর পেছনে মূল কারণ হলো নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈষম্য। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্যও সেটাই বলছে।
নারীরা যেসব সমস্যার শিকার হচ্ছেন, সেগুলো হলো—
১. অবহেলা: বাড়ির মেয়ে বা বউ যদি বলেন তাঁর বুকে ব্যথা করে, আমরা ভাবি ‘নাটক’। অথচ নারীদের হৃদ্রোগের লক্ষণ অনেক সময় পুরুষদের থেকে আলাদা হয়। এই অবহেলার কারণেই রোগ ধরা পড়ে দেরিতে, মৃত্যু ঘটে অকালে।
২. পুষ্টিহীনতা: পরিবারে সবার শেষে নারীদের খাওয়ার যে সংস্কৃতি, তা তাদের শরীরকে রোগের সঙ্গে লড়ার শক্তি দেয় না। একজন কিশোরী মেয়ে যদি রক্তশূন্যতায় ভোগে, আজীবন সে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যের কথা না ভাবা: পরিবারের সবার চাপ নিয়ে নারীরা নীরবে সহ্য করে যান। মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা এগুলো আমাদের দেশে অসুখ বলেই ধরি না। ফলাফল? আত্মহত্যার মতো ঘটনা। কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার এত বেশি হার প্রমাণ করে তারা নীরবে কতটা যন্ত্রণা সহ্য করছে।
৪. অধিকার সম্পর্কে না জানা: নিজের শরীর, নিজের সন্তান, নিজের সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অনেক নারীই জানেন না; যেমন পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে গেলে অনেক সময় স্বামী বা শাশুড়ির বাধার সম্মুখীন হতে হয়, যা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
৫. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা কম গ্রহণ করা: যেখানে চিকিৎসায় খরচ হবে, সেখানে নারীদেরকে স্বাস্থ্যসেবায় নেওয়া হয় কম। তার পরও যদি হাসপাতালে নেওয়া হয়, তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দ্বারস্থ নারীরা কম হন পুরুষদের তুলনায়। সেখানে জেনারেল প্র্যাকটিশনারের দোরগোড়া পর্যন্ত ঘুরে আসাকেই নারীদের জন্য যথেষ্ট চিকিৎসাসেবা নেওয়া হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়।
সমাধান ও করণীয়
আমাদের শুধু পরিসংখ্যান দেখলে চলবে না, বাস্তবে কাজ করতে হবে।
প্রথম করণীয়, সচেতনতা বাড়ানো। শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরও। ছেলে ও মেয়েদের সমান পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। মেয়েরা যাতে স্কুলে পড়তে পারে, বিয়ে দেরিতে হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্যানসার ও হৃদ্রোগের প্রাথমিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। গর্ভবতী মায়েদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শুরু করতে হবে। স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাসায় মেয়েরা কোনো কারণে মন খারাপ করলে, সেটাকে ‘বায়না’ না ভেবে, বুঝতে চেষ্টা করতে হবে।
আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নারীদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানাতে হবে।
লেখক: সদস্যসচিব, প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশ

সমাজকল্যাণ, সাংবাদিকতা, উদ্যোক্তা ও ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ অবদান রাখার জন্য চার নারী পেলেন ‘রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননা ২০২৫’। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ৭ মার্চ রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।
৪ ঘণ্টা আগে
একটি কন্যাশিশুর জন্ম নিবন্ধনই তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রথম ধাপ। জন্ম নিবন্ধন না থাকলে বয়স প্রমাণ করা যায় না, ফলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বড় বাধা তৈরি হয়। বাল্যবিবাহ কন্যাশিশুদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মাতৃত্বের ঝুঁকি বাড়ায়, তাদের শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও...
২০ ঘণ্টা আগে
ব্যাংকের সূচনালগ্ন থেকেই নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, উদ্যোক্তা স্বপ্নপূরণ এবং ক্যারিয়ার অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে আসছে ব্র্যাক ব্যাংক। নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা, আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার নানা উদ্যোগের মাধ্যমে...
১ দিন আগে
নারী কর্মজীবীদের মধ্যে অধিকাংশ চাকরি ছাড়ছেন পারিবারিক দায়িত্ব এবং মাতৃত্বের কারণে। কর্মজীবী নারীদের ৭৫ শতাংশই এই দুটি কারণে স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে চাকরি থেকে বিরতি নিচ্ছেন বা পেশাগত জীবনে ইতি টানছেন। এ ছাড়া বিরূপ কর্মপরিবেশ, সামাজিক চাপ এবং উচ্চশিক্ষার কারণেও অনেকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
৩ দিন আগে