Ajker Patrika

স্মরণ /টংক আন্দোলনের কুমুদিনী হাজং

ফিচার ডেস্ক
টংক আন্দোলনের কুমুদিনী হাজং
কুমুদিনী হাজং।

নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের বহেরাতলী গ্রামের এক টিলার ওপর ইতিহাসের পিদিম হয়ে বেঁচে ছিলেন এক নারী। তাঁর নাম কুমুদিনী হাজং। ২০২৪ সালের ২৩ মার্চ তিনি মারা যান। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে আমরা হারিয়েছি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও ঐতিহাসিক টংক আন্দোলনের এক কিংবদন্তি নেত্রীকে।

এ বছর তাঁর মৃত্যুর দ্বিতীয় বার্ষিকী। কুমুদিনী হাজং ছিলেন শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক জীবন্ত প্রতীক।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের সুসং জমিদারি এলাকায় প্রচলিত টংক প্রথা ছিল সামন্ততান্ত্রিক শোষণের এক চরম নিদর্শন। টংক মানে হলো ‘ধান কড়ারি খাজনা’। জমিতে ফসল হোক বা না হোক, এ প্রথায় সোয়া একর জমির জন্য বছরে ৭ থেকে ১৫ মণ ধান দিতে হতো। সেই সময়ের ধানের দর হিসেবে এটি ছিল প্রচলিত খাজনার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। টংক জমির ওপর কৃষকদের কোনো মালিকানা ছিল না। অমানবিক এই প্রথার বিরুদ্ধে ১৯৩৭ সালে কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে কৃষকেরা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেন।

টংক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি ছিল এক রক্তঝরা দিন। আন্দোলনের অন্যতম নেতা কুমুদিনীর স্বামী লংকেশ্বর হাজং ও তাঁর ভাইদের গ্রেপ্তার করতে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসের একদল সৈন্য বহেরাতলী গ্রামে হানা দেয়। আন্দোলনকারীরা আগেই গা ঢাকা দিয়েছিলেন। তাঁদের না পেয়ে সৈন্যরা লংকেশ্বরের স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে রাশি মণি হাজংয়ের নেতৃত্বে ১২ জন নারীর এক সশস্ত্র দল কুমুদিনীকে ছাড়িয়ে নিতে সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেনারা গুলি চালায়। নিহত হন রাশি মণি হাজং। কৃষকদের বল্লমের আঘাতে নিহত হয় দুজন সৈন্যও। প্রবল প্রতিরোধের মুখে সৈন্যরা কুমুদিনীকে ফেলে পালাতে বাধ্য হয়। এই আত্মত্যাগই টংক আন্দোলনকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৫০ সালে সে সময়কার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন পরিস্থিতি সামাল দিতে দুর্গাপুর গেলেও কৃষকেরা তাঁদের দাবিতে অনড় থাকেন। অবশেষে ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাসের মধ্য দিয়ে এই নির্মম প্রথার বিলোপ ঘটে।

জন্মের দুই বছর পর বাবা-মাকে হারান কুমুদিনী। মামার কাছে বড় হওয়া এই নারী আজীবন লড়াই করেছেন সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। কমরেড মণি সিংহ জাদুঘরের উদ্বোধনও হয়েছিল তাঁর হাত ধরে। ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ দেয়। এ ছাড়া তিনি অনন্যা শীর্ষ দশ (২০০৩), মণি সিংহ স্মৃতি পদকসহ অনেক পদকে ভূষিত হন। তবে জীবদ্দশায় রাষ্ট্র তাঁকে একুশে পদক বা স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেনি। কুমুদিনী হাজং ১০২ বছর বয়সে মারা যান। সুসং দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তীরে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা—সব ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন কুমুদিনী।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত