Ajker Patrika

মায়ের অনুপ্রেরণায় আলোকচিত্রে রাত্রি

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান 
মায়ের অনুপ্রেরণায় আলোকচিত্রে রাত্রি
ছবি: সংগৃহীত

জেবুন্নেছা জামান রাত্রি একজন আর্কিটেক্ট। আহছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ২০২৫ সালে স্থাপত্য বিভাগে ব্যাচেলর শেষ করেছেন। চাকরির পাশাপাশি করছেন আর্কিটেকচারাল ফটোগ্রাফি। অবসরে স্কেচ আঁকেন। আর সুযোগ পেলেই ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন নতুন কোনো দৃশ্যের খোঁজে।

তবে রাত্রির এই পথচলা শুধু শখ পূরণের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক সংগ্রাম, নিজের ওপর বিশ্বাস এবং সবচেয়ে বেশি—মায়ের নিরন্তর সমর্থন। রাত্রি যখন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন মারা যান তাঁর বাবা। এরপর মা-ই হয়ে ওঠেন একমাত্র অবলম্বন। ঢাকার নিকেতন বাজার এলাকায় মা ও ভাইকে নিয়ে থাকেন রাত্রি। দেশের বাড়ি ফরিদপুর।

‘আমার মা-ই আমার বাবা-মা—সব’, রাত্রির এই ছোট্ট বাক্যেই যেন ধরা পড়ে তাঁর জীবনের একটি বড় অধ্যায়। ফটোগ্রাফির প্রতি রাত্রির আগ্রহ যে শুধু তাঁর নিজের, তা নয়; বড় ভক্ত তাঁর মা। রাত্রির তোলা ছবি দেখতে মায়ের ভালো লাগে। সেই উৎসাহই রাত্রির পথচলায় বড় শক্তি হয়ে আছে।

মোবাইল ফোনে ছবি তোলার নেশা যখন দিন দিন বাড়ছিল, তখন রাত্রির মনে হলো, এবার একটি ক্যামেরা দরকার। আরও ভালোভাবে ফটোগ্রাফি শেখার ইচ্ছা থেকে মায়ের কাছে ক্যামেরার আবদার করলেন। মা বলেছিলেন, ‘এসএসসি শেষ কর, কিনে দেব।’ কথা রেখেছিলেন মা। ২০১৭ সালে এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিনই ফরিদপুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন রাত্রি। সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির মধ্যেই মা, ভাই, খালামণি ও দুই খালাতো বোনকে সঙ্গে নিয়ে কিনে ফেলেন ক্যানন ৭০ডি। সঙ্গে প্রয়োজনীয় লেন্স। সেই ক্যামেরাই এখনো তাঁর সঙ্গী। ২০১৭ থেকে ২০২৬—প্রায় এক দশকের পথচলায় ক্যামেরাটি তাঁর নীরব সহযাত্রী।

অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পী

ফটোগ্রাফির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেননি রাত্রি। ক্যামেরা হাতে নেওয়ার পর নিজেই শেখা শুরু করেন। ইউটিউব দেখেছেন, অন্য আলোকচিত্রীদের ছবি দেখেছেন, ছবি তুলেছেন, ভুল করেছেন। সেই ভুল থেকেই শিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য পড়ার সময় ফটোগ্রাফির জন্য আলাদা করে খুব বেশি সময় বের করতে পারেননি। সেমিস্টার ব্রেক কিংবা কোথাও ভ্রমণের সুযোগ পেলেই ক্যামেরা নিয়ে বের হতেন। পড়াশোনা এবং ফটোগ্রাফি—দুটিকে তিনি নিজের মতো করে সামলে নিয়েছেন।

ভ্রমণ

এখন পর্যন্ত দেশের ৩৪টি জেলা ঘুরেছেন রাত্রি; ইচ্ছে দেশের ৬৪টি জেলা ঘুরে দেখবেন মানুষ, জীবন ও প্রকৃতি। সেই গল্পগুলো ধরে রাখবেন ক্যামেরায়। বান্দরবান ও রাঙামাটি তাঁর বিশেষ পছন্দের জায়গা। ল্যান্ডস্কেপ তাঁর প্রিয় বিষয়। পাশাপাশি পুরোনো স্থাপত্যও টানে তাঁকে। হারিয়ে যেতে বসা পুরোনো ভবনের কারুকাজ ও স্থাপত্যশৈলী ক্যামেরায় ধরে রাখতে চান তিনি।

ছবি আঁকা ও ছবি তোলা

ফটোগ্রাফির পাশাপাশি স্কেচ আঁকাও রাত্রির শখ। অ্যানিমে চরিত্র এবং আর্কিটেকচারাল স্কেচ করতে ভালোবাসেন তিনি। স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনা ও পেশার সঙ্গে এই সৃজনশীলতাও যেন তাঁর নিজস্ব জগতের অংশ।

নতুনদের প্রতি পরামর্শ

প্রচুর ছবি তুলতে হবে, ছবি দেখতে হবে, ছবি নিয়ে জানতে হবে। বই, সিনেমা, ইউটিউব কিংবা অন্যদের কাজ—যেখান থেকেই শেখা যায়, শিখতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। সমালোচনা গ্রহণ করতে হবে। রাত্রি মনে করেন, ফটোগ্রাফি শুধু ছবি তোলা নয়, একধরনের সাধনাও বটে।

ক্যামেরায় রাত্রি প্রকৃতির সৌন্দর্য ধরে রাখেন। আর নিজের জীবন দিয়ে হয়তো তিনি ধরে রাখছেন আরেকটি ছবি—স্বপ্ন থাকলে, পাশে ভালোবাসা থাকলে এবং নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে পথ যত কঠিনই হোক, এগিয়ে যাওয়া যায়।

অর্জন

২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি), চট্টগ্রাম চ্যাপটার আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম: স্থপতিদের চোখে’ আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ল্যান্ডস্কেপ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হন রাত্রি। ফটোগ্রাফি জীবনের সেটিই তাঁর প্রথম পুরস্কার। এ বছর ১৯ আগস্ট বিশ্ব আলোকচিত্র দিবসে অর্ডিনারি কালেকটিভের আয়োজনে ‘অনারেবল মেনশন’ অর্জন করেন রাত্রি। এসব ছাড়াও রাত্রি ‘এফ৩০ সিজন ৯’, ‘হ্যালো ফটোগ্রাফারস’ ফটোগ্রাফি কার্নিভ্যাল, ‘এক্সপোজার ঢাকা ২০১৯’ এবং ‘ন্যাশনাল ফটোগ্রাফি ২০১৮’-এর মতো আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত