Ajker Patrika

ভাসমান কৃষি : গাওতায় মানিকগঞ্জের আলপনার সাফল্য

আব্দুর রাজ্জাক, (ঘিওর) মানিকগঞ্জ
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ৪২
ভাসমান কৃষি : গাওতায় মানিকগঞ্জের আলপনার সাফল্য
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষার পানিতে তলিয়ে যায় জমি, থেমে যায় চাষাবাদ। অথচ সেই পানির বুকেই গাওতায় ফলছে হলুদ, ঢ্যাঁড়স, শিম ও দেশি লাউ। মানিকগঞ্জের জয়নগর গ্রামের কৃষাণী আলপনা রানী সরকারের ভাসমান চাষে জলাবদ্ধ নিম্নাঞ্চলে বর্ষাকালেও সবজি ও মসলা উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পানিকে বাধা হিসেবে না দেখে লোকায়ত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নেওয়া এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদেরও আগ্রহী করে তুলছে।

জয়নগর অ্যাগ্রোইকোলজি শিখন কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত আলপনা রানী এ বছর জয়নগর খালের পানিতে তৈরি করেছেন ভাসমান গাওতা। কচুরিপানা ও আমন ধানের নাড়া স্তরে স্তরে সাজিয়ে তৈরি করা হয় এই বেড; যেটি স্থানীয়ভাবে ‘গাওতা’ নামে পরিচিত। ভাসমান এই বেড সাধারণত প্রায় ১০ হাত লম্বা ও ৩ হাত চওড়া করা হয়। চাষের উপযোগী হতে সময় লাগে দু-তিন মাস। ঢেউ ও স্রোত বেশি থাকলে বাঁশের খুঁটি বা বেড়া দিয়ে সেটি স্থির রাখা হয়। গাওতা প্রস্তুত হলে তাতে সরাসরি বিভিন্ন সবজি ও মসলার বীজ রোপণ করা যায়। পানির উচ্চতা বাড়লে বেডও পানির সঙ্গে ওপরে ওঠে। ফলে অতিবৃষ্টি ও মৌসুমি বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।

গাওতায় চাষে সাধারণত রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। লতাজাতীয় ফসলের জন্য বাউনি বা জাংলা দেওয়া হয়। আলপনা রানী বলেন, ‘খাল, বিল, নদী, পতিত এবং অনাবাদি জায়গাকে এ পদ্ধতিতে চাষের আওতায় আনা যায়। বর্ষায় সবজি ও মসলা উৎপাদনের পাশাপাশি আগাম শীতকালীন সবজির চারা তৈরি করা সম্ভব এখানে। আমি ঢ্যাঁড়স, শিম, লালশাক, লাউ, ধনেপাতার চাষ করেছি। পানি শুকিয়ে গেলেও গাওতা থেকে এক বছর সবজি পাওয়া যায়।’ তিনি জানিয়েছেন, সংসারের চাহিদা মিটিয়েও প্রতিটি গাওতা থেকে ২০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করা যাবে। এ বছর তিনি তিনটি গাওতা থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন।

বেসরকারি কৃষি গবেষণা সংস্থা বারসিকের বানিয়াজুরী আঞ্চলিক কর্মকর্তা সুবীর সরকার বলেন, ‘নিম্নাঞ্চলে প্রচলিত কৃষি ব্যাহত হলে ভাসমান চাষ কার্যকর অভিযোজন হতে পারে। স্থানীয় উপকরণে গাওতা তৈরি করে অনাবাদি জলমগ্ন জায়গাকে উৎপাদনে আনা সম্ভব। তবে এই পদ্ধতি ছড়াতে প্রশিক্ষণ, মানসম্মত বীজ এবং বাজার সংযোগ জরুরি।’ ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন বলেন, ‘বর্ষায় যেসব জমিতে প্রচলিতভাবে চাষ করা যায় না, সেখানে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।’

বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান কৃষির প্রচলন রয়েছে। বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও খাদ্য উৎপাদন চালু রাখার পাশাপাশি এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকের অভিযোজনেও ভূমিকা রাখে। জয়নগরের খালের পানিতে আলপনা রানীর গাওতা তাই শুধু কয়েকটি সবজি উৎপাদনের গল্প নয়, জলাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষিকে টিকিয়ে রাখার এক বাস্তব উদাহরণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত