লন্ডনের স্কুলছাত্রী থেকে সিরিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে

‘বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
কিন্তু যদি নর-নারীর যুগলবন্দী হয়ে ওঠে ক্ষমতার মোহে অন্ধ, তবে সেই সৃষ্টি কখনোই কল্যাণকর হয় না; তা রূপ নেয় এক বিভীষিকায়। ঠিক এমনটাই যেন ঘটেছে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও তাঁর স্ত্রী আসমা আল-আসাদের ক্ষেত্রে।
২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর সিরিয়ায় পতন হয় বাশার আল-আসাদ সরকারের। এর পর থেকে পুরো দেশে একের পর এক গণকবর, নির্যাতন কেন্দ্র এবং গোপন কারাগারের সন্ধান মিলতে শুরু করে। প্রায় ১৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে অন্তত ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি, অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং অসংখ্য শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পেছনে আসাদ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে শুরু হয় তদন্ত। তবে এই তদন্তের সূত্রে সামনে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম—আসমা আল-আসাদ, সাবেক ফার্স্ট লেডি।
লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা এবং বেড়ে ওঠা এই ব্রিটিশ নারী শুধু সিরিয়ার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণই নেননি, সেই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা, নিরাপত্তা সংস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন মানবিক সাহায্য সংস্থার ওপরও একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অবজারভার’-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আসমার ক্ষমতার অন্দরমহলের অজানা এসব তথ্য।
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মী এবং আসাদ পরিবারের ঘনিষ্ঠ বহু সূত্রের দেওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, আসমা শুধু প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সিরিয়ার স্বৈরশাসনের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি।
যুদ্ধের ধাক্কায় সিরিয়ার অর্থনীতি যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, আসমা আল-আসাদ তখন নিজেকে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনীতিক হিসেবে পরিণত করেন। জানা যায়, তিনি আড়ালে থেকে একটি শক্তিশালী ‘ইকোনমিক কাউন্সিল’ বা অর্থনৈতিক পরিষদ পরিচালনা করতেন। এই কাউন্সিলের কাজ ছিল দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার ও কর ফাঁকির ভয় দেখানো, কারখানা বন্ধ করে দেওয়া এবং জোর করে সম্পদ দখল করা।
এমনকি দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার অন্যতম ক্ষমতাধর ধনকুবের এবং বাশারের চাচাতো ভাই রামি মাখলুফকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনেও মূল ভূমিকা ছিল আসমার। মাখলুফের নিয়ন্ত্রণে থাকা বড় বড় কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া হয় অথবা তা আসমার অনুগতদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী আসমার বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের সিরিয়ার ব্যবসায়ী মহলে ডাকা হতো ‘রুজাল আল সিত্ত’ বা ‘ম্যাডামের লোক’ নামে। সিরিয়ার এক ব্যবসায়ী জানান, সরকারি কর্মকর্তারা প্রায়ই বলতেন, ‘এটা ম্যাডামের নির্দেশ’ কিংবা ‘এটাই ম্যাডাম চান’।
এর অর্থ দাঁড়ায়, অর্থনীতির রাশ টানতে ম্যাডাম যা চাইতেন, তা-ই হতো।

যুদ্ধের সময় সিরিয়ার সাধারণ মানুষের জন্য আসা জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মানবিক সহায়তাও চলে যায় আসমার নিয়ন্ত্রণে। আসমার প্রতিষ্ঠিত সিরিয়া ট্রাস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট নামক এনজিওর মাধ্যমে এই ফান্ডের বড় অংশ তছরুপ করা হতো। একজন আন্তর্জাতিক সহায়তা কর্মী জানান, জাতিসংঘের অনেক কর্মকর্তাই জানতেন যে সহায়তার একটা বড় অংশ সরকার-ঘনিষ্ঠ চক্র আত্মসাৎ করছে। তবু সীমিত পরিসরে হলেও সাধারণ মানুষের কাছে যেন কিছু সাহায্য পৌঁছায়, সেই নৈতিক দোটানা নিয়েই তাঁরা কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন।
আসমার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর ও অমানবিক অভিযোগটি শিশুদের নিয়ে। ‘দ্য অবজারভার’ জানিয়েছে, সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী আটক রাজনৈতিক বন্দী বা বিরোধীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং বন্দিবিনিময়ের দর-কষাকষির জন্য তাঁদের সন্তানদের জিম্মি করে সরকারি এতিমখানায় রাখত। আর এই এতিমখানাগুলোর বড় অংশই পরিচালিত হতো আসমার এনজিওর তত্ত্বাবধানে।
‘দ্য অবজারভার’ এমন কিছু সরকারি নথি দেখেছে, যেখানে আসমা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন, এই শিশুদের যেন তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে কোনোভাবেই হস্তান্তর করা না হয়। এতিমখানার সাবেক কর্মীরা জানিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টি সরাসরি আসমাকে জানিয়েও কোনো ফল পাননি। এক কর্মী দাবি করেন, আসমা উল্টো তাঁদের ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘এরা সন্ত্রাসীর সন্তান, নিজের কাজে মন দিন।’
২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ যখন সিরিয়ায় আছড়ে পড়ে, তখন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের বিরুদ্ধে সামরিক জান্তার নৃশংসতা শুরু হয়। সে সময় পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত আসমাকে নিয়ে অনেকে আশাবাদী ছিলেন, তিনি হয়তো স্বামীর কঠোর অবস্থান নরম করতে ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু আসমা বেছে নেন সম্পূর্ণ নীরবতা।
বিক্ষোভকারী কিশোরদের নখ উপড়ে ফেলা এবং ১৪ বছর বয়সী হামজা আল-খতিব নামের এক কিশোরকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে যৌনাঙ্গ কেটে হত্যার মতো ঘটনা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিলেও আসমা ছিলেন নীরব। ওই সময় সিরিয়ার একদল নারী তাঁর সঙ্গে দেখা করে শিশুদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন। এরপর একটি রহস্যময় ফোনকল পাওয়ার পর আসমা নিজের অবস্থানকে আরও কঠোর করে তোলেন। ২০১২ সালে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মী রিমা দালি যখন ‘হত্যা বন্ধ করুন, আমরা সবার জন্য একটি সিরিয়া চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে ধরা পড়ে গ্রেপ্তার হন, তখনো নিশ্চুপ ছিলেন আসমা।
প্রকৃতপক্ষে, আসলে পর্দার আড়ালে আসমাই ছিলেন বাশারের সবচেয়ে শক্তিশালী উপদেষ্টা। অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, দিনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অফিশিয়ালি যা-ই ঠিক হোক না কেন, রাতে বালিশে মাথা রেখে আসমার সঙ্গে আলোচনার পর সেই সিদ্ধান্ত বদলে যেত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সরকারের প্রতিটি স্তরে আসমার নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ছিল। এ কারণে সরকারের অনেক মন্ত্রী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাঁকে ভেতরে-ভেতরে অপছন্দ করতেন। তাঁদের মতে, আসমা ফার্স্ট লেডি ছিলেন না, ছিলেন সিরিয়ার ‘দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট’।
লন্ডনের কুইনস কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ডয়চে ব্যাংক ও জেপি মর্গানে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হিসেবে আসমার সামনে ছিল উজ্জ্বল ক্যারিয়ার। কিন্তু ২০০০ সালে বাশারকে বিয়ে করে তিনি দামেস্কে চলে যান। শুরুতে প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী সেজে সিরিয়ার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করলেও যুদ্ধের পর তাঁর সেই মুখোশ খুলে যায়।
বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। কিন্তু সিরিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্য না হওয়ায় বাশারের বিচার করা কঠিন। তবে আসমা ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ায় তাঁর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।
আইসিসির সাবেক প্রধান কৌঁসুলি লুইস মোরেনো-ওকাম্পো বলেছেন, ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ায় আসমার বিরুদ্ধে আইসিসিতে মামলা করা সম্ভব। ২০২১ সালে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের যুদ্ধাপরাধ ইউনিট তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করে একটি নথি ব্রিটিশ ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসে পাঠালেও আসমা যুক্তরাজ্যে না থাকায় মামলাটি তখন এগোয়নি। কিন্তু বর্তমানে স্বৈরশাসনের পতনের পর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে।
‘দ্য অবজারভার’-এর তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসমা ও বাশার আল-আসাদের রয়েছে আবাসিক অনুমতি। সেখানে তাঁদের অনেক বিনিয়োগ আছে বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া বুলগেরিয়া, রাশিয়া ও লেবাননেও আসাদ দম্পতির বিপুল অঙ্কের বেনামি বিনিয়োগ রয়েছে। তবে তাঁরা দুবাইয়ে বেশি যাতায়াত করছেন। সর্বশেষ গত মাসেও আসমা দুবাইয়ের ওয়াল্ডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে ছিলেন বলে ‘অবজারভার’-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আসাদ পরিবারের কয়েকজন আত্মীয় জানিয়েছেন, তাঁদের সন্তান, আসমার মা ও এক ভাই বর্তমানে দুবাইয়ে বসবাস করছেন। অন্যদিকে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আসমা মস্কোতে লিউকেমিয়ার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে দ্য অবজারভার আরও জানিয়েছে, আসমার দুই ভাইকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘আসমা ব্রিটেনে আসতে পারবেন না। তবে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব এখনো বাতিল করা হয়নি।’
দ্য অবজারভারের অনুসন্ধানে আসমার বিরুদ্ধে উঠে আসা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন তাঁর বাবা ডা. ফাওয়াজ আখরাস। লন্ডনে বসবাসরত এই চিকিৎসকের দাবি, ব্যবসা দখল, শিশুদের জিম্মি করা অথবা মানবিক সাহায্য আত্মসাতের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে ক্ষমতালোভী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি যে মানুষকে চিনি, তার সঙ্গে এগুলো কোনোভাবেই মেলে না।’
আসমার বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের বিচার কি আদৌ হবে? সিরিয়ার নতুন সরকারের হাতে আগের সরকারের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হলেও আসমা কিংবা বাশারের বিচার এখনো শুরু করা হয়নি।

সমস্যা: আমি অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি। লেখাপড়া শেষে চাকরি করার ইচ্ছা রয়েছে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মিশতে পারি না। আমার এই ইনট্রোভার্ট বৈশিষ্ট্যের জন্য কর্মজীবনে কাজ করতে অসুবিধা হবে মনে হচ্ছে। এই হীনম্মন্যতা থেকে চেষ্টা করেও বের হতে পারছি না। সবাই যখন চাকরির কথা বলে, আমি তখন এই বিষয় ভেবেই ভয়ে থাকি।
২ ঘণ্টা আগে
বেলুচিস্তানের এক শান্ত উপত্যকা তাফতান। সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পশুপালন আর ডালিম, অ্যাপ্রিকট, চেরি ও আপেলের বাগান করে জীবিকা নির্বাহ করছে স্থানীয় জনগোষ্ঠী। ২০২২ সাল থেকে সেই শান্ত জীবনের ছন্দ কেটে যায়। আঞ্জিরক বা মাধোফাতি সোনার খনিতে অনিয়ন্ত্রিত খননকাজ শুরু হতেই হঠাৎ শুকিয়ে যেতে থাকে শত বছরের
৩ ঘণ্টা আগে
ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ‘সের্তানেজো’ সংগীত একটা সময় পুরোদস্তুর পুরুষদের হাতে বন্দী ছিল। সের্তানোজো সংগীতকে এই পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি দেন মারিলিয়া মেন্ডোন্সা। ১৯৯৫ সালের ২২ জুলাই ব্রাজিলের গোয়াস রাজ্যের রাজধানী গোইয়ানিয়ায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী মাত্র ১২ বছর বয়স থেকে গান লেখা শুরু করেন।
৪ ঘণ্টা আগে
৪ জুন ১৮১৭ সাল। পাগলাগারদের নিঃসঙ্গ, নির্জন শীতল কুঠুরিতে মারা গেছেন একজন নারী। যৌবনে তাঁকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁর আর বাড়ি ফেরা হয়নি। কেউ তাঁর জন্য অপেক্ষা করে থাকেনি। প্যারিসের সালপেত্রিয়ের এক মানসিক হাসপাতালে জীবনের ২৩টি বসন্ত অবরুদ্ধ থাকার পর মৃত্যুবরণ করলেন ৫৪ বছরের নারী থেরোইন....
৭ দিন আগে