Ajker Patrika

অদৃশ্য আঘাত: পারিবারিক সহিংসতা ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়

সহিংসতা যে রূপেই আসুক, দায় কখনো ভুক্তভোগীর নয়; সহিংসতাকারীর।

অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া
অদৃশ্য আঘাত: পারিবারিক সহিংসতা ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়

র‍্যাচেল লুইস স্নাইডার তাঁর ‘নো ভিজিবল ব্রিসেস’ বইয়ের সূচনায় লিখেছেন, ‘আমরা একে পারিবারিক সহিংসতা বলি। আমরা একে ব্যক্তিগত সহিংসতা বলি। কখনো কখনো একে ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসও বলি। কিন্তু যা-ই বলি না কেন, আমরা সাধারণত বিশ্বাস করি না এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক আছে।’ এই কথাই আমাদের আরামদায়ক মিথ—পারিবারিক সহিংসতা যেন শুধু ‘অন্য কারও’ সমস্যা। এই মিথ আর টিকছে না।

যে চিত্র আমরা এড়িয়ে যাই

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ প্রতিদিন নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ আসে। এর মধ্যে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগই বেশি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছর পারিবারিক সহিংসতায় নিহত, আহত ও আত্মহত্যাকারী নারীর সংখ্যা কমেনি; যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার একটি বড় অংশ কোনো মামলা করেনি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, পারিবারিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মা, একজন বোন, একজন সহকর্মী—যাঁর নাম আমরা জানি না, যাঁর কষ্ট আমরা দেখতে পাই না।

যে সত্য আমরা স্বীকার করি না

বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার বেশির ভাগই নারী ও কন্যা। জাতীয় জরিপ বলছে, প্রতি চারজন নারীর তিনজনই জীবনে অন্তত একবার অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন; গত এক বছরে এই হার প্রায় অর্ধেক। অথচ ভুক্তভোগীদের অধিকাংশ কখনো কারও কাছে তা বলেননি, কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেননি।

কিন্তু এটাই সম্পূর্ণ চিত্র নয়। পুরুষেরাও পারিবারিক সহিংসতার শিকার এবং তাদের সংখ্যা কম নয়। বাংলাদেশ ম্যানস রাইটস ফাউন্ডেশনের জরিপে দাবি করা হয়েছে, বিবাহিত পুরুষদের একটি বড় অংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি জরিপে প্রতি পাঁচজন পুরুষের একজন গৃহস্থালি নির্যাতনের কথা বলেছেন; যাঁদের বেশির ভাগই মানসিক নির্যাতন। আর এখানেই নীরবতার দ্বিতীয় স্তর; পুরুষ ভুক্তভোগীদের প্রায় পাঁচজনের মধ্যে চারজনই সহায়তা চাইতে দ্বিধা করেন—সামাজিক কলঙ্ক ও বিচারব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসের কারণে।

যে মিথগুলো ভাঙা দরকার

প্রথম মিথ, ‘সমস্যা বেশি হলে সে চলে যেত।’ বাস্তবতা হলো, ছাড়ার সময়ই ভুক্তভোগীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সন্তানের ভবিষ্যৎ, সামাজিক কলঙ্ক ও প্রাণের ভয়—এসব কারণে অনেক নারী ছাড়তে পারেন না। ‘কেন চলে যায় না’ প্রশ্নটি সমাধান নয়, দায় ভুক্তভোগীর ঘাড়ে চাপানো।

দ্বিতীয় মিথ, ‘শুধু মারধরই সহিংসতা।’ পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর ৩ ধারায় শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন এবং আর্থিক ক্ষতিকে পারিবারিক সহিংসতার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মানসিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ডিজিটাল হুমকি—সবই সহিংসতা। অনেক আঘাত দৃশ্যমান নয়, তাই তার ক্ষতও অদৃশ্য।

তৃতীয় মিথ, ‘এটা ব্যক্তিগত ব্যাপার।’ পারিবারিক সহিংসতা ব্যক্তিগত নয়, পাবলিক। এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, শিশুর বিকাশ ও জননিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। ঘরের নির্যাতন প্রায়ই বাইরের সহিংসতার পথ তৈরি করে।

চতুর্থ মিথ, ‘আইন আছে, তাই সমস্যা নেই।’ ২০১০ সালের আইন সুরক্ষা আদেশ ও আইনি সহায়তার বিধান রাখে। কিন্তু এখানেই তার সীমাবদ্ধতা। এই আইনের সুরক্ষা মূলত নারী ও শিশুর জন্য; পুরুষ ও লৈঙ্গিক-বৈচিত্র্যপূর্ণ ভুক্তভোগীদের জন্য আলাদা কোনো সুরক্ষার বিধান নেই।

কেন অদৃশ্য

পারিবারিক সহিংসতা বাংলাদেশে ‘অদৃশ্য’। কারণ, এটি লজ্জা, ভয় ও নীরবতার মধ্যে বেড়ে ওঠে। নারী ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ কখনো অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন না; পুরুষ ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি।

সমাধান কোথায়

প্রথমত, ২০১০ সালের আইনের পূর্ণ ও কার্যকর প্রয়োগ, সঙ্গে পুরুষ ও লৈঙ্গিক-বৈচিত্র্যপূর্ণ ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়েও খোলামেলা ভাবনা। দ্বিতীয়ত, পুলিশ, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের লৈঙ্গিক সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ। তৃতীয়ত, প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র এবং ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার—যেখানে চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও পরামর্শ এক ছাদের নিচে। চতুর্থত, নারী-পুরুষনির্বিশেষে বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। পঞ্চমত, শিক্ষাক্রমে সম্মতিমূলক সম্পর্ক ও লৈঙ্গিক সমতার শিক্ষা। ষষ্ঠত, মিডিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা—ভিকটিম ব্লেমিং নয়, সুরক্ষা ও সমাধানকে গুরুত্ব দেওয়া।

শেষ কথা

পারিবারিক সহিংসতা এই দেশের নীরব অপরাধগুলোর একটি। এটি টিকে আছে আমাদের চোখ ফিরিয়ে রাখা, অজুহাত তৈরি করা এবং ‘এটা আমার ব্যাপার নয়’ বলার কারণে। কিন্তু এটি আমাদের ব্যাপার। এটি সবার ব্যাপার।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত