Ajker Patrika

সেতার বাজানোটা ছিল অনিবার্য

রজত কান্তি রায়
আপডেট : ২১ জুন ২০২৩, ১৯: ৫৩
সেতার বাজানোটা ছিল অনিবার্য

ভারত উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হয়েছিল যে পরিবারটির জন্য, সেটা আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খাঁ পরিবার। সে পরিবারের বিখ্যাত মানুষের মধ্যে আছেন ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। ওই পরিবারের সদস্য সেতারশিল্পী, সুরকার ও সংগীত গবেষক রীনাত ফওজিয়া। তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন রজত কান্তি রায়।

তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। ঘড়িতে সাড়ে ৩টার এপাশ-ওপাশ। আকাশে বেশ মেঘ। কিন্তু বৃষ্টি নেই। আমরা রিকশা ধরে ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে যাই সরু সরু গলি ধরে।

ওয়াপদা রোড, পশ্চিম রামপুরা। এ রকম একটা ঠিকানা আমাদের কাছে ছিল। আর ছিল এটার পাশে সেটা, সেটার পাশে ওটা—এমন কিছু নির্দেশনা। আমরা সেসব নির্দেশনা একটার পর একটা মেলাতে মেলাতে এগিয়ে চলি। নিজেদের মাসুদ রানা মনে হয়! অবশেষে একটা গলিতে ঢুকে পাওয়া গেল নির্দেশনার একটি মসজিদ, তার উল্টো দিকের দেয়ালে লেখা ঠিকানা দেখে মনে হলো পাওয়া গেছে। এক কম্পাউন্ডে পাশাপাশি তিনতলা করে তিনটি বাড়ি। সেই তিনটি বাড়ির মাঝেরটির রং নীল। সেটায় আমরা ঢুকে গেলাম।

হ্যাঁ, গিয়েছিলাম সেতারশিল্পী রীনাত ফওজিয়ার খোঁজে। কিন্তু কখনো ভাবিনি, ঢাকা শহরের রামপুরা এলাকার তস্য গলির ভেতরে একটি নীল রঙের বাড়ির নিচতলায় বসে মেঘলা বিকেলে মাইহার ঘরানায় রাগ কিরওয়ানি বাজিয়ে শোনাবেন তিনি!

ধমনিতে নীল রক্ত 
ব্লু ব্লাড বা নীল রক্ত নাকি আভিজাত্যের প্রতীক। রীনাত ফওজিয়ার শরীরে যে রক্ত বইছে, তা সংগীতের ব্লু ব্লাড। এর শুরু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ওস্তাদ সবদর হোসেন খাঁ ছিলেন সে পরিবারের প্রধান। তাঁর পাঁচ ছেলের মধ্যে তিনজন পরবর্তী সময়ে ভারত উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন। তাঁরা হলেন ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ নামে। এখন সে পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্মের সংগীত চর্চা চলছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। রীনাত ফওজিয়া সে পরিবারেরই সন্তান। তিনি ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর ছেলে মোবারক হোসেন খানের মেয়ে। তাঁর মা বিখ্যাত সংগীতশিল্পী ফৌজিয়া ইয়াসমিন। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ যে বছর মারা যান, সে বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে জন্ম হয় রীনাত ফওজিয়ার। ঢাকাতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাঁর।

সংগীত ছিল অনিবার্য
‘তরিতা’ নামের সে বাড়িটির ফরাস বিছানো নিচতলার ঘরটিতে পুরোনো আমলের সোফার ওপর সেতার নিয়ে যখন রীনাত বসলেন, এক অদ্ভুত আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, এখনই তাঁর আঙুলগুলো নেচে উঠবে সেতারের তারে। সেটা হলো না। বরং প্রশ্ন করে বসলাম, কেন সংগীত? রীনাত বললেন, হয়তো অনিবার্য ছিল, তাই। নইলে একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর তাঁর চাচাতো ভাইদের সবাইকে যখন নাড়া বেঁধে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম দেওয়া হচ্ছে, তখনো স্কুল পড়ছেন। কিন্তু নিয়তি যার পথ নিজেই তৈরি করে রেখেছে, সেটা খণ্ডাবে কে? ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ অনেক যন্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন। কিন্তু সেতার ও সরোদের মতো তারের যন্ত্রের ক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতা ছিল প্রধান।

সেই ঐতিহ্যেই রীনাত ছোটবেলা থেকে পছন্দ করতেন সেতার। আর ছোটবেলায় বিভিন্ন উচ্চাঙ্গসংগীতের অনুষ্ঠানে এবং টেলিভিশনে যাঁদের যন্ত্র বাজাতে দেখতেন, তাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্য। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান, ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, ওস্তাদ  মীরকাশিম খান রীনাতের চাচা। ফুপাতো ভাই ওস্তাদ খুরশিদ খান, ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খানসহ আরও অনেকেই। এই গুণী যন্ত্রশিল্পীদের বাজানো দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই রীনাতের মনেও সেতারশিল্পী হওয়ার বাসনা তৈরি হয়।

কিন্তু মা-বাবা চাননি তিনি সেতারশিল্পী হোন। রীনাতের তত দিনে সেতারের প্রতি আলাদা ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। তিনি বাড়িতে সেতার শেখা শুরু করলেন তাঁর বড় চাচা ওস্তাদ আবেদ হোসেন খানের লেখা একটি বই পড়ে! এ দেখে তাঁর মা ফৌজিয়া ইয়াসমিনের কথায় ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খান রীনাতকে সেতার শেখানো শুরু করেন। সময়টি ১৯৮২ সাল। ১৯৮৪ সালে তিনি ছায়ানটে ভর্তি হন এবং ওস্তাদ খুরশিদ খানের কাছে সেতার শেখেন। 

সেতারশিল্পী, সুরকার ও সংগীত গবেষক রীনাত ফওজিয়াবেতার-টেলিভিশন 
ছায়ানটের লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে রীনাত ১৯৯৩ বা ১৯৯৪ সালে বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হন। তার কিছুদিন পর টেলিভিশনেও তালিকাভুক্ত হন তিনি। বর্তমানে তিনি বেতারের বিশেষ গ্রেডের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত।

দেশ ও বিদেশ 
প্রায় আড়াই দশকের সংগীতজীবনে প্রচুর একক অনুষ্ঠান করেছেন তিনি দেশে ও বিদেশে। বিদেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, জার্মানি, ফ্রান্স, ফিলিপাইন ও হংকংয়ে শো করেছেন তিনি।

প্রথম যন্ত্রসংগীতের সিডি
টাচ অব লাভ। সুরের মেলা নামে একটি সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে এটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। এটি ছিল দেশের প্রথম ইনস্ট্রুমেন্টাল অ্যালবাম। এরপর ‘ট্রিবিউট টু ওস্তাদ আয়েত আলী খান’ নামের আরেকটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। এরপর ২০১০ সালে ‘হারামানিক’। সবই যন্ত্রসংগীতের অ্যালবাম। এরপর আরও কিছু অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।

পুরস্কার
রীনাত ফৌজিয়া ২০০৯ সালে ‘অনন্য শীর্ষ দশ’ পুরস্কার লাভ করেন সংগীতে অবদানের জন্য। 

শুধুই সংগীত
সংগীতের বাইরে রীনার ফওজিয়া একজন শিক্ষক। ১৪তম বিসিএস পাস করে তিনি ১৯৯৩ সালে শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হন। এখন তিনি হোম ইকোনমিকস কলেজের অধ্যাপক এবং সামলাচ্ছেন সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব। ২০০৯ সালে তাঁকে সংগীত কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নিতে বলা হলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন মূলত সংগীতের কারণে। তিনি চেয়েছেন সব সময় সংগীতের সঙ্গে থাকতে। প্রশাসনিক পদে গেলে সেটা সম্ভব নয় বলে তিনি সে পথ মাড়াননি। রীনাত ফওজিয়া বলেন, ‘আনন্দ ছাড়া জীবনে আর কী আছে? এত চাপ নিয়ে সংগীত থেকে দূরে থাকতে পারব না বলেই কোনো প্রশাসনিক পদে যেতে চাইনি। মনে হয় সে সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল।’

দেড় ঘণ্টার কাছাকাছি সময় আলাপ শেষে আমরা বেরিয়ে আসি ঢাকা শহরের কোলাহলে। কিরওয়ানি রাগ ততক্ষণে বদলে গেছে যানবাহনের ভেঁপুর কর্কশ শব্দে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় ৩৪ বছরের নারীকে খুন ১৮ বছরের তরুণের

বিদেশ থেকে মেশিন এনে টঙ্গিবাড়ীতে ইয়াবা তৈরি, বিপুল সরঞ্জামসহ যুবক আটক

আজকের রাশিফল: চোখের পানি মুছতে সঙ্গে রুমাল রাখুন, পেটের চর্বিটা আজ খুব ভাবাবে

বনশ্রীতে স্কুলছাত্রীকে হত্যা: নিজেদের হোটেলের কর্মচারী আটক

নির্বাচনে প্রার্থিতা: বিদ্রোহে ভুগছে বিএনপি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত