Ajker Patrika

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ২৪তম

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 
নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ২৪তম

লৈঙ্গিক সমতা শুধু একটি সামাজিক আদর্শ নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ২০২৫ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদন জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে লৈঙ্গিক বৈষম্য বর্তমানে ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ দূর হয়েছে। তবে বর্তমান অগ্রগতির গতি বজায় থাকলে পূর্ণ সমতা অর্জনে বিশ্বকে আরও ১২৩ থেকে ১৩১ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে; বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমতার এই চিত্র অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও চ্যালেঞ্জিং।

এশিয়ায় লৈঙ্গিক সমতার বর্তমান অবস্থান

এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পারফরম্যান্স বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশ ভিন্ন। পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ৬৯ দশমিক ৪ শতাংশ সমতা অর্জন করে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। স্বাস্থ্য ও জীবনধারণের ক্ষেত্রে ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ স্কোর নিয়ে এই অঞ্চল তালিকার তলানিতে অবস্থান করছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, চীন, ব্রুনেই দারুসসালাম ও পাপুয়া নিউগিনিতে জন্মের সময় লৈঙ্গিক অনুপাতের বৈষম্য এই স্কোরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ স্কোর নিয়ে পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে।

২০০৬ সাল থেকে রাজনৈতিক গ্যাপ ৪ দশমিক ১ শতাংশ কমলেও অগ্রগতির হার ধীর ও অসম। ২০২৫ সালে শুধু নিউজিল্যান্ড রাজনৈতিক সমতায় ৫০ শতাংশ অতিক্রম করতে পেরেছে। যেখানে জাপান, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, ফিজি ও ভানুয়াতু ১০ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। যদিও আমরা দেখেছি, জাপান রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে গত বছর। তবে এই অঞ্চলের দিকে তাকালে এখানে ১৯টি দেশের মধ্যে ৯টিতে এখনো কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধান দায়িত্ব পালন করেননি।

মধ্য এশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ স্কোর নিয়ে অঞ্চলটি চতুর্থ স্থানে আছে। আর্মেনিয়া ও জর্জিয়া হলো এই অঞ্চলের শীর্ষ দেশ। তবে সেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের হার মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। দক্ষিণ এশিয়ার স্কোর ৬৪ দশমিক ৬

শতাংশ। বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে এই অঞ্চল রয়েছে। এই অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান ২৪তম। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেটি শীর্ষ ৫০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ স্কোর নিয়ে তালিকার সর্বনিম্ন স্থানে থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অঞ্চলে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান ৩২তম।

দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ

পুরো দক্ষিণ এশীয় ব্লকের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ পর্যায়ে পূর্ণ লৈঙ্গিক সমতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে, ভুটান ও মালদ্বীপে সংসদীয় সমতার হার এখনো ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নজিরবিহীন ৭৫ ধাপ উন্নতি করে ২৪তম স্থানে উঠে এসেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ বৈষম্য দূর করতে সক্ষম হয়েছে। সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশে শ্রমঘন কাজে নারীর অংশগ্রহণ কমছে এবং নারী-পুরুষের আয়বৈষম্য আগের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেড়েছে।

এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

এই সময় পুরো দেশ তাকিয়ে আছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে। সেই নির্বাচনের

পর থাকছে সম্ভাবনা এবং বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের রাস্তা। শিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার গড় হার

৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে এখানে ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। মালদ্বীপে পূর্ণ সমতা থাকলেও নেপাল ও পাকিস্তানে সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের নিচে। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জন্মের সময় লৈঙ্গিক অনুপাতের অবনতি এই অঞ্চলের অগ্রগতির পথে অনেকটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এশীয় অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব ও সংকট

পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের স্কোর ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কম্বোডিয়ায় নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি। তবে একটি বড় বৈষম্য দেখা গেছে শিক্ষার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে। যদিও এশিয়ায় নারীরা উচ্চশিক্ষায় পুরুষদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তবু উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপক পদে মাত্র ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ নারী কাজ করছেন। জনতাত্ত্বিক উপাত্তে এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এক অদ্ভুত চিত্র দেখা গেছে। হংকংয়ে প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা মাত্র ৮৬ জন। এই ভারসাম্যহীনতা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও সামাজিক কাঠামোতে বড় প্রভাব ফেলবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এশিয়ায় দ্রুততম সময়ে সমতার দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উল্লেখযোগ্য। তবে এখানে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের গ্যাপ বিশ্বব্যাপী মাত্র ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। এটি পূরণ না হলে এশিয়ায় সমতার সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়। আইসল্যান্ডের মতো এশিয়ার দেশগুলোকেও এখন ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট ও কেয়ারগিভার সাপোর্টের মতো নীতিমালায় আরও জোর দিতে হবে।

তথ্যসূত্র:

১. গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)।

২. আঞ্চলিক ডেটা: পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার ওপর ডব্লিউইএফের বিশেষ বিশ্লেষণ।

৩. বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ২০২৫ সালের তথ্য।

৪. জনসংখ্যা উপাত্ত: দেশভিত্তিক নারী ও পুরুষের অনুপাতসংক্রান্ত ডেটা সেট (২০২৬ প্রজেকশন)।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

অবৈধ আয়কে ‘মায়ের দান’ উল্লেখ করেন সওজ প্রকৌশলী, দুদকের চার্জশিট

অনুসন্ধান ও তদন্তের জট কাটাতে দুদকে ১৫টি বিশেষ টাস্কফোর্স

বাহরাইনের বাসায় অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালটের ভিডিও ভাইরাল, ইসিকে ব্যবস্থা নিতে বলল বিএনপি

ইউনূস-টুর্ক ফোনালাপ: নির্বাচনে ভুয়া তথ্য ঠেকাতে সহায়তার আশ্বাস

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আইডি কার্ড চালু করল সরকার, আবেদন ফ্রি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত