Ajker Patrika

আমেরিকার খাল-বিল এশিয়ান কার্পের দখলে, আতঙ্কে হেলমেট পরছেন জেলেরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আমেরিকার খাল-বিল এশিয়ান কার্পের দখলে, আতঙ্কে হেলমেট পরছেন জেলেরা
নেট ওয়ালিক তাঁর টিউবের চারপাশে একটি খাঁচা তৈরি করেন এবং উড়ে আসা কার্প মাছ থেকে বাঁচাতে তাঁর সন্তানদের হেলমেট পরানো শুরু করেন। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য বা ‘হার্টল্যান্ড’ অঞ্চলে বর্তমানে এক অদ্ভুত সংকট দেখা দিয়েছে। নদীগুলোতে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেরা মাছ ধরার চেয়ে বরং মাছের আঘাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন বেশি। ‘এশিয়ান কার্প’ প্রজাতির মাছ জল থেকে লাফিয়ে নৌকায় জেলেদের ওপর আছড়ে পড়ছে, ফলে অনেকেই এখন আত্মরক্ষার জন্য মাথায় ফুটবল হেলমেট ও বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন।

ইলিনয় ও লুইসিয়ানার নদীগুলোতে সিলভার, বিগহেড, গ্রাস ও ব্ল্যাক কার্পের দাপট এখন চরমে। ক্লিন্ট কার্টার নামের এক জেলে জানান, ৩০ পাউন্ড ওজনের একটি মাছ লাফিয়ে উঠে তাঁর বুকে সজোরে আঘাত করেছিল। তাঁর এক বন্ধু মাঝনদীতেই জ্ঞান হারিয়েছিলেন, কারণ, একটি উড়ন্ত কার্প সরাসরি তাঁর দুই চোখের মাঝে আঘাত করে তাঁকে আহত করেছিল। অন্য একজনের নাক ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের মতে, নৌকার ইঞ্জিনের শব্দে ভয় পেয়ে এই মাছগুলো জল থেকে প্রায় ১০ ফুট উঁচুতে লাফিয়ে উঠতে পারে।

পিওরিয়ার বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মী নেট ওয়ালিক তাঁর বাচ্চাদের নিয়ে নদীতে যাওয়ার সময় হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করেছেন। মাছ ধরার সময় মাছের আঘাত থেকে বাঁচতে তিনি নৌকার চারদিকে খাঁচা তৈরি করেছেন। ওয়ালিক নিজে ওয়াটার স্কিইং করার সময় হেলমেট পরেন, কারণ, একবার মাছের আঘাতে তাঁর শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গে গুরুতর চোট লেগেছিল। এখন তিনি পর্যটকদের ‘বো-ফিশিং’ (ধনুক দিয়ে মাছ শিকার) করাতে নিয়ে যান এবং নৌকার চারপাশে জাল দিয়ে বেড়া তৈরি করেন, যাতে মাছ কারোর মাথায় আঘাত করতে না পারে।

এখন কার্প মাছ ধরেন ক্লিন্ট কার্টার। তিনি বলেন, মাছগুলো লাফিয়ে উঠে তাঁর হাত, পা ও বুকে আঘাত করেছে। ছবি: সংগৃহীত
এখন কার্প মাছ ধরেন ক্লিন্ট কার্টার। তিনি বলেন, মাছগুলো লাফিয়ে উঠে তাঁর হাত, পা ও বুকে আঘাত করেছে। ছবি: সংগৃহীত

এশিয়ান কার্প মূলত চীন ও রাশিয়ার মাছ। ১৯৭০-এর দশকে জলাশয়ের শৈবাল পরিষ্কার করার জন্য এগুলো যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছিল। কিন্তু বন্যার সময় এগুলো নদীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় মাছের খাদ্য ও বাসস্থান দখল করে নেয়। বর্তমানের বড় উদ্বেগ হলো, এই কার্পগুলো বড় হ্রদগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যদি তারা সেখানে পৌঁছে যায়, তবে ওই অঞ্চলের ৫ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় ওয়ালআই, ব্যাস ও ট্রাউট মাছের শিল্প হুমকির মুখে পড়বে।

ইলিনয়ের রেডনেক ফিশিং টুর্নামেন্টে এক প্রতিযোগীর মুখে মাছের আঘাত হানার মুহূর্ত। ছবি: সংগৃহীত
ইলিনয়ের রেডনেক ফিশিং টুর্নামেন্টে এক প্রতিযোগীর মুখে মাছের আঘাত হানার মুহূর্ত। ছবি: সংগৃহীত

মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার ও ইলিনয়ের গভর্নর জে বি প্রিটজার এই মাছের গতিরোধ করতে নদীতে বৈদ্যুতিক ঢাল, বুদবুদের পর্দা ও উচ্চ শব্দতরঙ্গ তৈরির জন্য ফেডারেল তহবিলের দাবি জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই মাছকে ‘অত্যন্ত সহিংস ও ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে বর্ণনা করে হ্রদগুলো রক্ষার আশ্বাস দিয়েছেন।

মাছের সংখ্যা কমাতে ইলিনয় সরকার এক অভিনব কৌশল নিয়েছে। তারা এই মাছের নাম বদলে রেখেছে ‘কপি’, যা ‘copious’ (প্রচুর) শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। নাম বদলানোর উদ্দেশ্য হলো, মানুষের মনে এই মাছ সম্পর্কে রুচি বাড়ানো। শেফরা বলছেন, এসব মাছ খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু হলেও এতে প্রচুর কাঁটা থাকে। তাই এখন এসব মাছ দিয়ে ফিশ কেক বা ক্রোকোয়েট তৈরি করে তা জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে।

ফরাসি শেফ ফিলিপ পারোলা তাঁর রান্নার বইয়ে এই কার্পের রেসিপি যুক্ত করেছেন এবং স্লোগান দিয়েছেন, ‘জিততে না পারলে খেয়ে ফেলো!’। তবে যতক্ষণ না মানুষ এই মাছের স্বাদ গ্রহণ করে এর সংখ্যা কমিয়ে আনছে, ততক্ষণ মার্কিন জেলেদের জন্য হেলমেটই একমাত্র ভরসা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত