Ajker Patrika

এবার ‘রহস্যময়’ গাণিতিক সমীকরণ পোস্ট করে হুমকি দিল ইরান, ব্যাখ্যা কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ২৮
এবার ‘রহস্যময়’ গাণিতিক সমীকরণ পোস্ট করে হুমকি দিল ইরান, ব্যাখ্যা কী

হরমুজ প্রণালি অবরোধের মার্কিন হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এক নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া দিয়েছে ইরান। কোনো গতানুগতিক রাজনৈতিক বিবৃতির বদলে এবার গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে বিশ্ববাজার ও যুক্তরাষ্ট্রে জন্য চরম বিপদের সতর্কতা দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি অবরোধের পথে হাঁটেন, তবে তেলের বাজারে এমন এক ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হবে যা সামলানো যুক্তরাষ্ট্রের সাধ্যের বাইরে চলে যাবে।

গালিবাফের গাণিতিক সূত্র

সম্প্রতি পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। এর জবাবে গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে একটি বিশেষ গাণিতিক সমীকরণ শেয়ার করেছেন:

ΔO_BSOH > 0 ⇒ f (f (O)) > f (O)

অবশ্য গালিবাফ কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে একটি মানচিত্র শেয়ার করে ক্যাপশনে ইংরেজিতে লিখেছেন, পাম্পে জ্বালানির দামের বর্তমান অবস্থা উপভোগ করো। তথাকথিত অবরোধের কারণে শিগগিরই তোমরা চার-পাঁচ ডলারে গ্যাস পাওয়ার অতীত স্বস্তি নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে থাকবে।

এই রহস্যময় সূত্রের ব্যাখ্যায় অনেকে বলছেন:

O: তেলের দাম বা অয়েল শক।

BSOH: হরমুজ প্রণালির অবরোধ (Blockade of the Strait of Hormuz)।

ΔO_BSOH > 0: এর অর্থ হলো, অবরোধ বাড়লে তেলের দাম সরাসরি বৃদ্ধি পাবে।

f(f(O)) > f(O): এটিই সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া অংশ। এর মানে হলো, প্রথম দফার মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে দ্বিতীয় দফার প্রভাব হবে আরও ভয়াবহ। অর্থাৎ, বাজারে আতঙ্ক, সরবরাহে বিঘ্ন এবং জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির ফলে তেলের দাম ধাপে ধাপে লাফিয়ে বাড়বে।

ইরানের দাবি, এই অবরোধ কেবল তেলের দাম সাধারণ হারে বাড়াবে না, বরং এটি একটি চক্রবৃদ্ধি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। প্রতিটি ধাক্কা পরবর্তী ধাক্কাকে আরও শক্তিশালী করবে, যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে।

সূত্রের বিস্তারিত বিশ্লেষণ

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গারিবাফের দেওয়া সূত্রটি হলো:

ΔO_BSOH > 0 ⇒ f (f (O)) > f (O)

এই সূত্রটিকে দুটি প্রধান অংশে ভাগ করে ব্যাখ্যা করা যাক:

১. প্রথম অংশ: ΔO_BSOH > 0 (প্রাথমিক তেলের দাম বৃদ্ধি)

এখানে:

O (Oil Price) : তেলের দাম বা বাজারের ওপর তেলের ধাক্কা।

BSOH (Blockade of the Strait of Hormuz) : হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ।

Δ (Delta) : পরিবর্তনের হার।

ব্যাখ্যা: এই অংশটি বোঝাচ্ছে, যদি হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের তীব্রতা বাড়ে, তবে তার সরাসরি ফল হিসেবে তেলের দাম বাড়বে। যেহেতু বিশ্বের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ খনিজ তেল এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই পথটি বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে তেলের ঘাটতি দেখা দেবে এবং দামের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হবে।

২. দ্বিতীয় অংশ: f (f (O)) > f (O) (চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া)

এটি ক্যালকুলাস বা ফাংশনের ধারণা থেকে নেওয়া হয়েছে, যা মূলত প্রভাবের গভীরতা বোঝায়।

f (O) : তেলের দাম বাড়ার ফলে সৃষ্ট প্রথম পর্যায়ের প্রভাব (যেমন—তেলের দাম ৫ ডলার বাড়ল)।

f (f (O)) : প্রথম বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব বা ‘ফিডব্যাক লুপ’।

ব্যাখ্যা: গালিবাফ এখানে বোঝাতে চেয়েছেন, তেলের দাম বৃদ্ধি কেবল গাণিতিক হারে (১, ২, ৩...) বাড়বে না, বরং এটি চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে।

প্রথম পর্যায় f (O) : অবরোধের কারণে সরবরাহ কমার ফলে দাম কিছুটা বাড়বে।

দ্বিতীয় পর্যায় f (f (O)) : দাম বাড়ার খবরে বিশ্ববাজারে আতঙ্ক তৈরি হবে। ফলে দেশগুলো তেল মজুত করা শুরু করবে, বিমা কোম্পানিগুলো শিপিং খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং শেয়ারবাজারে ধস নামবে। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক আতঙ্ক তেলের দামকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে যা প্রাথমিক বৃদ্ধির তুলনায় অনেক গুণ বেশি শক্তিশালী।

সূত্রের মূল বার্তা:

ইরান মূলত একটি ‘Non-linear Growth’ বা অরৈখিক বৃদ্ধির হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। তাদের মতে—

১. সরবরাহ বিঘ্ন: সরাসরি তেলের ঘাটতি।

২. বাজারের আতঙ্ক: বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা।

৩. শিপিং খরচ: যুদ্ধকালীন ঝুঁকির কারণে জাহাজের ভাড়া ও বিমা বৃদ্ধি।

৪. পরবর্তী প্রতিক্রিয়া: এসব কারণ মিলে একটি লুপ তৈরি করবে, যেখানে প্রতিবার দাম বাড়লে তা পরবর্তী ধাপের দামকে আরও দ্রুত বাড়িয়ে দেবে।

গালিবাফের এই সূত্রের সারকথা হলো—যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে অবরোধের ফলে তেলের দাম সামান্য বাড়বে, তবে তারা ভুল করছে। এই অবরোধ এমন এক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে যা সময়ের সাথে সাথে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। অর্থাৎ সংকট বাড়বে জ্যামিতিক হারে।

গালিবাফ তাঁর বার্তায় হোয়াইট হাউসের নিকটবর্তী একটি পেট্রলপাম্পের বর্তমান দামের ছবি শেয়ার করে মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এখনকার তেলের দাম দেখে আনন্দ করে নিন। অবরোধ কার্যকর হলে তেলের দাম খুব দ্রুত ৪ থেকে ৫ ডলার ছাড়িয়ে যাবে এবং তখন মার্কিনরা বর্তমানের এই সস্তা দামের জন্য হাহাকার করবে।’

উল্লেখ্য, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, আজ সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ১০টা (বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা) থেকে ইরানের সমস্ত বন্দরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই অবরোধ আরব সাগর এবং ওমান উপসাগরীয় এলাকায় ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের সব দেশের জাহাজের জন্যই প্রযোজ্য হবে। তবে ইরান ছাড়া অন্য দেশগুলোর মধ্যে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই গাণিতিক বার্তার মাধ্যমে বিশ্বকে বোঝাতে চাচ্ছে যে, জ্বালানি সরবরাহে যেকোনো কৃত্রিম বাধা কেবল ইরানের ক্ষতি করবে না, বরং বৈশ্বিক বাজারকে এমন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত