স্ট্যান্ড-আপ কমেডির মঞ্চ দখল করছে আবেদনময়ী এআই তরুণীরা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দাপটে বদলে যাচ্ছে স্ট্যান্ড-আপ কমেডির জগৎ। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় নারী কমেডিয়ানের মতো দেখতে কিছু ভার্চুয়াল চরিত্র দেখা যাচ্ছে। ইটের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে তারা ফ্লার্টি ভঙ্গিতে সম্পর্ক, ডেটিং ও যৌনতা নিয়ে কৌতুক করছে। এসব ভিডিওতে দ্রুত লাখ লাখ ভিউ হচ্ছে এবং বিপুল দর্শক টানছে। কিন্তু সমস্যাটি শুধু এআই দিয়ে কমেডি তৈরিতে নয়। এসব ভার্চুয়াল কমেডিয়ানের অনেক জোকসই বাস্তব নারী কমেডিয়ানদের কাছ থেকে হুবহু চুরি করা। এমনকি কারও কারও মঞ্চে বলা জোকস, জোকসের ভাষা ও উপস্থাপনার ধরন পর্যন্ত নকল করা হয়েছে।
এআই কমেডির এই চুরির শিকার মূলত তরুণ ও তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত নারী কমেডিয়ানরা। বিশেষ করে ডেটিং ও যৌনতা নিয়ে যারা স্ট্যান্ড–আপ কমেডি করেন, তাদের কাজই বেশি নকল করা হচ্ছে। জনপ্রিয় কমেডিয়ান জিম গ্যাফিগান বা ডেভ চ্যাপেলের জোকস নকল করার বদলে এআই অ্যাকাউন্টগুলো তুলনামূলক তরুণ নারী কমেডিয়ানদের কনটেন্ট বেশি নকল করছে।
নিউইয়র্কের কমেডিয়ান নাটালি কুয়োমো জানিয়েছেন, তাঁর সাত থেকে ১০টি জোকস হুবহু চুরি হয়েছে। এসব কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জনপ্রিয় হয়েছিল।
এআই কমেডিতে ‘আবেদনময়ী’ চরিত্রের ব্যবহার
স্ট্যান্ড-আপ কমেডিতে এআই দিয়ে এমন সব চরিত্র তৈরি করা হয়েছে, যার অধিকাংশই আবেদনময়ী। অর্থাৎ প্রযুক্তির সঙ্গে যৌন আবেদনকে যুক্ত করে দর্শক টানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, এ ধরনের ভার্চুয়াল কমেডিয়ানদের অনেকের পোশাক ও উপস্থাপনা যৌন আবেদননির্ভর। বাস্তবেও নারী কমেডিয়ানদের জনপ্রিয়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে চেহারা ও যৌন আবেদনকে গুরুত্ব দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এআই নির্মাতারাও সেটিকে কাজে লাগাচ্ছে। তবে বাস্তব কমেডিয়ানদের জন্য বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এখন তাদের কাজ প্রচার ও আয়ের অন্যতম প্রধান জায়গা।
ওলগা নামে নিউ ইয়র্কের একজন কমেডিয়ান জানান, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক জোকস তৈরি করেন। সম্প্রতি তাঁর লেখা একটি জোকস এআই হুবহু নকল করে। ওই ভিডিওটি তাঁর নিজের বানানো ভিডিওর চেয়েও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। ওলগা জানেন, তাঁর লেখার মান ভালো। কিন্তু তাঁর সমস্যা শরীর নিয়ে। এআই দিয়ে বানানো জোকসটিতে যে চরিত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি অত্যন্ত আবেদনময়ী ও আকর্ষণীয় ছিল।
অক্টোবরের শুরুতে অনেক কমেডিয়ান তাদের কৌতুক চুরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করে উদ্বেগ জানান। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াই ছিল না।
ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি এক কমেডিয়ানের ভিডিওতে মন্তব্য করে বলেন, মূল শিল্পীদের কনটেন্টে আরও বেশি দর্শকদের কাছে পৌঁছানো উচিত। তবে এআইকে নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মানুষের ক্ষেত্রে কারও জোকস চুরি করা কমেডি জগতে সুনাম নষ্ট করার মতো অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে সেই সামাজিক চাপ কাজ করে না। কারণ কোনো ভার্চুয়াল কমেডিয়ানকে লজ্জা দেওয়া বা তার সুনাম নষ্ট করার সুযোগ নেই।
শুধু কৌতুক নয়, দর্শকও তৈরি করছে এআই
তবে এসব ভিডিওতে শুধু কমেডিয়ানই কৃত্রিম নয়, অনেক ক্ষেত্রে দর্শকদেরও এআই দিয়ে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ দর্শকের হাসির শব্দও আগে থেকেই তৈরি করা থাকে। এর ফলে আপনি যখন ভিডিওটি দেখবেন, তখন এক ধরনের মানসিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। কারণ মানুষ অন্যদের হাসতে দেখলে নিজেও হাসার প্রবণতা অনুভব করে। তাই কৃত্রিম দর্শকের হাসি ব্যবহার করে দর্শককে যেকোনো কোনো জোকসে হাসানো সম্ভব।
হাসি স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া নয়। মানুষ অধিকাংশ সময়েই সামাজিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে হাসে। এআই যদি সেই সামাজিক বৈশিষ্ট্যকেই কাজে লাগাতে পারে, তাহলে কমেডির সবচেয়ে মানবিক অংশটিও ধীরে ধীরে কৃত্রিম হয়ে উঠতে পারে।
তারকাদেরও নকল করা হচ্ছে
শুরুতে কম পরিচিত নারী কমেডিয়ানদের কনটেন্ট চুরি করা হলেও এখন এআই নির্মাতারা পরিচিত ও জনপ্রিয় তারকাদেরও নকল করতে শুরু করেছে। ভার্চুয়াল কমেডিয়ানদের শুধু কমেডি ক্লাবের মঞ্চে দাঁড় করানো হচ্ছে না; রাতের টক শোর উপস্থাপকদের নকল করেও ভিডিও তৈরি হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, জনপ্রিয় কমেডিয়ান ও লেখক কনান ও’ব্রায়েনের চুলের সঙ্গে জিমি ফ্যালনের মুখ মিলিয়ে অদ্ভুত এক ভার্চুয়াল চরিত্র তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ এআইয়ের মাধ্যমে বাস্তব ব্যক্তিদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য জুড়ে সম্পূর্ণ নতুন, কিন্তু পরিচিত চেহারার চরিত্র তৈরি করা সম্ভব।
এআইয়ের আরেকটি সুবিধা হলো, একই কৌতুক বিভিন্ন ভাষায় উপস্থাপন করা যায়। ইংরেজিতে তৈরি একটি কৌতুক সহজেই ফরাসিসহ অন্য ভাষায় রূপান্তর করা সম্ভব। ফলে প্রযুক্তির মাধ্যমে কমেডির বাজার আরও দ্রুত বিস্তৃত করা যেতে পারে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এআই শুধু কমেডিয়ানদের কাজ চুরি করছে না। এটি দর্শকদের কমেডি সম্পর্কে প্রত্যাশাও বদলে দিতে পারে।
ধরেন, একজন তরুণ দর্শক প্রথমবার স্ট্যান্ড-আপ কমেডি দেখার সময় বাস্তব কমেডি ক্লাবের মঞ্চের বদলে এআইয়ের তৈরি কমেডি দেখলেন। সেখানে নিখুঁতভাবে তৈরি জোকস, সহজে বোঝা যায় এমন পাঞ্চলাইন এবং কৃত্রিম হাসির শব্দ তাঁকে এমনভাবে আকৃষ্ট করল, তিনি আর কখনো মঞ্চের কমেডি দেখার প্রয়োজনই বোধ করলেন না। তিনি এআই কনটেন্টেই অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন। এর পাশাপাশি এআইয়ের যৌন আবেদননির্ভর ভার্চুয়াল চরিত্র সেই প্রবণতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে।
এখন এআই মানুষের তৈরি জোকস চুরি করছে কি না—সেটি বিষয় নয়। বড় প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি যদি মানুষের তৈরি কাজকে নকল করে আরও বেশি দর্শক পেতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই কাজের জন্য মানুষের প্রয়োজন কতটা থাকবে।
কমেডি যদি এই পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে প্রযুক্তি মানুষের শ্রমকে এমনভাবে ব্যবহার করতে পারে, যাতে নকলটি বেশি জনপ্রিয় হবে এবং মূল স্রষ্টাকেই বাজার থেকে সরিয়ে দেবে। আর হাসির মতো মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতাও তখন ধীরে ধীরে কৃত্রিমতার কাছে জায়গা হারাতে পারে।









