Ajker Patrika

এবার যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চীনে গেলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
এবার যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চীনে গেলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী
রসায়নে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ওমর ইয়াগি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি ছেড়ে চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। ছবি: চায়না সাউথ মর্নিং পোস্ট

প্রযুক্তি দুনিয়ায় বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে চীন এগিয়ে চলেছে জোরদমে। দলে টানছে বিশ্বজুড়ে নামকরা সব শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের। এবার সেই পথেই হাঁটলেন গত বছর রসায়নে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ওমর ইয়াগি। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি ছেড়ে চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন তিনি। তাঁর চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রতিভা দখলের লড়াই নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে অধ্যাপক ইয়াগির নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সিংহুয়ার নতুন প্রতিষ্ঠিত ‘এআই ম্যাটেরিয়ালস কেমিস্ট্রি’ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ইয়াগি। সেখানে এআই ব্যবহার করে নতুন উপকরণের নকশা ও সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার গবেষণার তত্ত্বাবধান করবেন তিনি। এর মাধ্যমে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক ইয়াগি ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস’ (এমওএফ) বিষয়ক গবেষণায় বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ। এমওএফ হলো ধাতব আয়ন ও জৈব অণুর সমন্বয়ে তৈরি অতিসূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত উপকরণ , যা কার্বন শোষণ, হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও বায়ুমণ্ডল থেকে পানি আহরণের মতো পরবর্তী প্রজন্মের জ্বালানি ও পরিবেশপ্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। এ গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ গত বছর অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের অধ্যাপক রিচার্ড রবসন এবং জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুসুমু কিতাগাওয়ার সঙ্গে যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান তিনি।

সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ অনুষ্ঠানে ইয়াগি বলেন, ‘পানিসংকট, কার্বন নিরপেক্ষতা ও টেকসই উন্নয়নের মতো মানবজাতির সামনে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধানে সক্ষম উদ্ভাবনী উপকরণ তৈরি করতে চাই।’

এআইভিত্তিক উপকরণ রসায়নের ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দেবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এআইসমন্বিত উপকরণ গবেষণা এখন প্রচলিত ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতি ছাড়িয়ে এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে কম্পিউটার আগে থেকেই প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উপাদান পূর্বাভাস ও নকশা করতে পারবে। ওষুধ আবিষ্কারে এআই ব্যবহারের মতো এই পদ্ধতিও নতুন উপকরণ তৈরির সময় ও ব্যয় ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে এই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ হচ্ছে।

গত বছর চীনের নানজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তৃতায় ইয়াগি বলেন, ‘এআই ম্যাটেরিয়ালস কেমিস্ট্রি হলো ভবিষ্যতের গবেষণা প্যারাডাইম, যা দ্রুত, কম খরচে ও আরও টেকসই উপায়ে নতুন উপকরণ নকশা করতে সহায়তা করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একের পর এক পরীক্ষা–নিরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার যুগ থেকে আমরা এখন কাঙ্ক্ষিত কর্মক্ষমতাকে সামনে রেখে নকশা করার যুগে প্রবেশ করছি।’

চীনের ‘ট্যালেন্ট ব্ল্যাক হোল’ কৌশল শুধু অধ্যাপক ইয়াগিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একের পর এক খ্যাতিমান বিজ্ঞানী চীনে পাড়ি জমিয়েছেন। ন্যানোবিজ্ঞান ও ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তির অন্যতম শীর্ষ বিশেষজ্ঞ এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান থাকা চার্লস লাইবার এখন সিংহুয়ার শেনজেন ইন্টারন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট স্কুলে কর্মরত। হার্ভার্ডে ডেটা সায়েন্স ও এআই গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া পরিসংখ্যানবিদ লিউ জুনও গত বছর সিংহুয়ায় চেয়ার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছেন।

এ ছাড়া ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা গাও হুয়াজিয়ান সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মেটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োমেডিকেল মেটেরিয়ালস বিষয়ে যুক্ত হয়েছেন।

এ ছাড়া একাডেমিয়ার বাইরে শিল্পখাতেও চীনের দিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভা সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে বৈশ্বিক প্রকৌশল সফটওয়্যার কোম্পানি অলটেয়ারের সাবেক কর্মকর্তা অধ্যাপক ঝৌ মিংকে নিংবো ইস্টার্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির প্রথম ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব গবেষকের চীনে যাওয়ার পেছনে রয়েছে চীনা সরকারের বিপুল গবেষণা বিনিয়োগ ও বিস্তৃত অবকাঠামোগত সহায়তা। শুধু উচ্চ বেতন নয়, নতুন গবেষণা কেন্দ্র ও গবেষক তৈরির কাঠামো স্বাধীনভাবে গড়ে তোলার ক্ষমতা দেওয়ার মতো ব্যতিক্রমী সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে এআই, মস্তিষ্কবিজ্ঞান, জৈবপ্রযুক্তি ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও বৃহৎ পরিসরের সরঞ্জামনির্ভর খাতে চীনের গবেষণা সক্ষমতা দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি ও জ্বালানি শিল্পের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত উপকরণ প্রযুক্তির সঙ্গে এআইয়ের সমন্বয় ঘটানোর কৌশল দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে চীন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যৎ শিল্পে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই কৌশল বৈশ্বিক মেধাপাচার বা ‘ব্রেন ড্রেইন’ আরও ত্বরান্বিত করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত