অনলাইনে আকর্ষণীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে বিশ্বজুড়ে গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়েছে ইসরায়েলি কোম্পানি

অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়েছে ইসরায়েলি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থা ‘ডিসকভার-টেক’। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবহারকারীর ডিভাইসে অবৈধভাবে প্রবেশের সুযোগ বা হ্যাকিংয়েও সহায়তা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কানাডাভিত্তিক সাইবার নজরদারি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাব এবং নিউ ইয়র্কের বিজ্ঞাপন নিরাপত্তা সংস্থা কনফিয়েন্ট-এর পৃথক দুটি প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এসেছে।
গবেষকদের তথ্যমতে, ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিসকভার-টেক বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘ক্যান্ডিরু’-সহ একাধিক নজরদারি সংস্থাকে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ করে দেয়। তারা গুগল, কমকাস্ট এবং রাশিয়ার ইয়ানডেক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করত।
ডিসকভার-টেক প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) বা তারও বেশি বিজ্ঞাপন পরিচালনা করত। সাধারণত মোবাইল ফোন বা ইয়ারবাডের মতো সাধারণ পণ্যের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের আড়ালে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ওয়েবসাইট এবং ৭৫ হাজার অ্যাপে এই ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ওয়েবসাইট বা অ্যাপে স্রেফ এসব ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপন লোড হলেই ব্যবহারকারীদের ডিভাইস ট্র্যাক বা চিহ্নিত করা সম্ভব হতো। অনেক ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ফোন নম্বর ও ব্যক্তিগত তথ্যও হাতিয়ে নেওয়া হতো। কিছু বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ডিভাইসে ক্যান্ডিরুর শক্তিশালী স্পাইওয়্যার ইনস্টল করা হতো।
গবেষণায় জানা গেছে, ডিসকভার-টেকের এই স্পাইওয়্যার প্রচারণার পরিধি বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল নেটওয়ার্কগুলোতে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কাতারের সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রায় ৪৫টি উইন্ডোজ ডিভাইসে ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্যান্ডিরু স্পাইওয়্যার দিয়ে সাইবার হামলা চালানো হয়। আল জাজিরা এই সাইবার হামলার নিন্দা জানিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে।
কনফিয়েন্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জেরোম ড্যাঙ্গু জানান, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মতো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেও তাদের বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়েছিল। এ ছাড়া ফিলিস্তিনের প্রায় প্রতিটি ওয়েবসাইটে এই ইসরায়েলি ফার্মের বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দিয়ে তাদের সব ধরনের ডিজিটাল চালচিত্র নজরদারিতে রাখা হতো।
সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইউরোপীয় কমিশন এবং ডজনখানেক দেশের সরকারি নেটওয়ার্কেও এই ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপন পৌঁছে গিয়েছিল। পাশাপাশি এনভিডিয়া, স্যান্ডিস্ক, ব্রডকমের মতো বিশ্বখ্যাত চিপ মেকিং প্রতিষ্ঠান এবং মেক্সিকো ও ইউরোপের শীর্ষ প্রচারমাধ্যমও এর লক্ষ্যবস্তু ছিল।
এই গবেষণা প্রতিবেদনগুলো সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক অনলাইন বিজ্ঞাপনী বাজার থেকে ডিসকভার-টেককে নিষিদ্ধ ও নিষ্ক্রিয় করা শুরু হয়েছে। নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে গুগল ইতিমধ্যে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ডিসকভার-টেককে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে। কমকাস্টের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘বিসওয়াক্স’ এবং ডিজিটাল মার্কেটিং সংস্থা ‘আইএবি ইউরোপ’ তাদের অনুমোদিত তালিকা থেকে কোম্পানিটিকে সাময়িক নিষিদ্ধ ও বাতিল করেছে।
অনলাইনে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ ধরনের গোপণ নজরদারিকে বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে পেন্টাগন জানায়, যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনকৃত সেনাসদস্যদের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য বিজ্ঞাপন প্রযুক্তির ডেটা থেকে ট্র্যাক করার প্রমাণ মিলেছে। যার প্রেক্ষিতে সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু ডিভাইসেও বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং বন্ধ করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স









