Ajker Patrika

যেদিন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন অ্যানফিল্ডে

ক্রীড়া ডেস্ক    
যেদিন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন অ্যানফিল্ডে
শেষবারের মতো অ্যানফিল্ডের সবুজ গালিচা ছাড়ার সময় সালাহর চোখ ছলছল করছিল। লিভারপুলের লাল জার্সি পরে আর এই মাঠে নামা হবে না ভেবে হয়তো কষ্টটা আরও বেড়ে গেছে এই ফরোয়ার্ডের। ছবি: সংগৃহীত।

অ্যানফিল্ডে এমন অনেক সন্ধ্যা এসেছে, যখন আলোটা একটু অন্যরকম ছিল। গ্যালারির লাল সমুদ্র, ‘ইউ নেভার ওয়াক অ্যালোন’-এর সম্মিলিত সুর, আর মাঝখানে এক মানুষ দৌড়াচ্ছেন, কাটব্যাক দিচ্ছেন, গোল করছেন, হাত দুটো মেলে উদযাপন করছেন। গত নয় বছরে মোহামেদ সালাহকে নিয়ে অলরেড ভক্তদের কাছে এই দৃশ্য যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু অভ্যাসও একদিন ভেঙে যায়। সময় তাঁর সবচেয়ে প্রিয় চরিত্রদেরও বিদায় বলে। লিভারপুলের জন্য এমনই এক বিদায়ের দিন ছিল গতকাল। অ্যানফিল্ডে এদিন ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে স্কোরলাইন ছিল গৌণ, ফলাফলও যেন গুরুত্ব হারিয়েছিল। গোটা অ্যানফিল্ডের চোখ ছিল সালাহর দিকে। যিনি শেষবারের মতো লিভারপুলের জার্সি পরে চেনা আঙিনায় দৌড়েছেন। শেষবারের মতো দর্শকদের দিকে হাত নেড়েছেন এবং গান শুনেছেন নিজের নামে। শেষবারের মতো তিনি মাথা নত করে সেই ভালোবাসা গ্রহণ করেছেন।

২০১৭ সালের গ্রীষ্মে রোমা থেকে লিভারপুল যখন সালাহকে দলে ভেড়াল, তখন খুব কম মানুষই বুঝতে পেরেছিল সামনে কী অপেক্ষা করছে। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো গল্প লেখে এমনভাবে, যা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। লিভারপুলে এসে সালাহ শুধু একজন ফুটবলার নন, হয়ে উঠেছিলেন আশা, পুনর্জাগরণ আর ধারাবাহিকতার প্রতীক। দ্রুতগতির বাঁ পায়ের জাদুকর এক উইঙ্গার—এটাই ছিল তাঁর পরিচয়। শুধু গোলদাতা কিংবা ম্যাচজয়ীই নন; হয়ে উঠেছিলেন একটা যুগের নাম।

সালাহর পায়ের ছোঁয়ায় বদলে যেতে থাকে অ্যানফিল্ডের ইতিহাস। একের পর এক গোল, একের পর এক রেকর্ড। প্রিমিয়ার লিগের ডিফেন্ডারদের কাছে তিনি ছিলেন আতঙ্কের আরেক নাম। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ের কার্লিং শট—এই দৃশ্য এতবার দেখা গেছে যে, সেটিও যেন ফুটবলের এক চিরন্তন শিল্পে পরিণত হয়েছিল।

নয় বছরের এই যাত্রায় লিভারপুলে সালাহ লিখেছেন অসংখ্য গল্প। ক্লাবটির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৪১ ম্যাচে করেছেন ২৫৭ গোল। এই পরিসংখ্যানে লুকিয়ে আছে হাজারো মুহূর্তের আবেগ। প্রিমিয়ার লিগে করা ১৯৩ গোল তাঁকে দাঁড় করিয়েছে ক্লাব ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্থানে। প্রতিটি গোল যেন ছিল একেকটি ঘোষণা—তিনি এখানে শুধু খেলতে আসেননি, ইতিহাস লিখতে এসেছেন।

সালাহর গল্প শুধু সংখ্যার নয়। গোলের পর গোল, অ্যাসিস্টের পর অ্যাসিস্ট, শিরোপার পর শিরোপায় নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর সময়ে লিভারপুল জিতেছে প্রিমিয়ার লিগ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, এফএ কাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ; যেন নতুন যুগে প্রবেশ করেছে মার্সিসাইডের ক্লাবটি।

সালাহকে আলাদা করে যে জিনিসটি, সেটি হলো ধারাবাহিকতা। আধুনিক ফুটবলে যেখানে প্রতিটি মৌসুম নতুন পরীক্ষা, সেখানে তিনি প্রতি বছর নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করেছেন। কখনো গোল করে, কখনো অ্যাসিস্টে আবার কখনো শুধু প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণকে ব্যস্ত রেখে। বিদায়ের দিনেও যেন তিনি নিজের স্বভাব বদলাতে চাননি। ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে গোল না পেলেও অ্যাসিস্ট করেছেন। সেই অ্যাসিস্টই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে নতুন উচ্চতায়। পেছনে ফেলেছেন স্টিফেন জেরার্ডকে, গড়েছেন লিভারপুলের হয়ে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের (৯৩) রেকর্ড।

৭৩ তম মিনিটে যখন কোচ সালাহকে মাঠ থেকে তুলে নেন, তখন দাঁড়িয়ে যায় গোটা অ্যানফিল্ড। হাজারো কণ্ঠে ভেসে আসে গান। সেই গান, যা হয়তো সালাহ বহুবার শুনেছেন। কিন্তু এবার সুরের ভেতর ছিল বিচ্ছেদের ভার। সমর্থকেরা গান গাইছিলেন, আর সালাহর চোখে জমছিল জল। ফুটবলারেরা সাধারণত নিজেদের আবেগ লুকিয়ে রাখতে শেখেন। কিন্তু কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে মানুষের পরিচয়টা পেশার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। এদিন সালাহ শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্মৃতির আরেক নাম। সালাহ ধীরে ধীরে মাঠ ছাড়ছিলেন, হাত তুলে বিদায় জানাচ্ছিলেন। চোখে জল, মুখে চাপা হাসি—একজন কিংবদন্তির শেষ অভিবাদন।

সালাহ বিদায় নিয়েছেন লিভারপুল থেকে। অ্যানফিল্ডে রেখে গেছেন পায়ের অসংখ্য ছাপ। তাঁর নামে থাকবে গ্যালারির সেই গান, থাকবে দৌড়ে ওঠা উল্লাস, গোলের পর দুই হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষের ছবি। অ্যানফিল্ড সালাহকে হারায়নি—শুধু তাঁকে ইতিহাসে বদলে দিয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত