Ajker Patrika

সেই ইতালি কোথায় হারাল

ক্রীড়া ডেস্ক    
আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৪০
সেই ইতালি কোথায় হারাল
টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপে উঠতে পারল না ইতালি। ছবি: সংগৃহীত

ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে ২০ বছর আগে ফিরে যাওয়া যাক। বার্লিনে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের উৎসবে মেতে উঠেছিল ইতালি। ব্রাজিলের পাঁচবারের শিরোপার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চারবার শিরোপা জেতে আজ্জুরিরা। আন্দ্রে পিরলো, মার্কো মাতারাজ্জি, আলেহান্দ্রো দেল পিয়েরোরা ছিলেন সেই দলে। কিন্তু সেসব এখন অতীত।

২০০৬ ফুটবল বিশ্বকাপ জয়ের পর নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে ইতালি। ২০১০ ও ২০১৪ সালে টানা দুইবার তারা গ্রুপ পর্বে বিদায় নিয়েছে ইতালির এই দলটি। পরের গল্পটা বড্ড হতাশার। ২০১৮, ২০২২, ২০২৬—টানা তিনবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারল না দলটি। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এমন অবস্থা দেখে হতাশ মাশরাফি বিন মর্তুজা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপ থেকে টানা তৃতীয় বারের মতো বাদ পড়লো ইতালি। অথচ এই বিশ্বকাপ তারা চারবার জিতেছে। ব্যাজিও, মালদিনি, ক্যানাভারো, নেস্তা, পিরলো, টট্টি, বুফনদের কথা চিন্তা করলেই কেমন যেন লাগে।’

অথচ এই ইতালির ফুটবল কাঠামো কত সমৃদ্ধশালী। ইউরোপের সেরা পাঁচ লিগের মধ্যে একটি হলো ইতালিয়ান ‘সিরি-আ’। একটা সময় নিয়ম ছিল ক্লাবগুলোতে তিন জনের বেশি নন-ইউরোপিয়ান খেলোয়াড় রাখা যাবে না। তাতে করে ইতালির খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা আরও বেড়ে যায়। তবে ১৯৯৫ সালে বসমান রায়ের পর সবকিছু বদলে যায়। ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের অধিকার বাড়াতে একটা মামলা করা হয়েছিল। তাতে করে শতাব্দীর শেষের দিকে সিরি-আতে বিদেশি খেলোয়াড়দের সংখ্যা বেড়ে যায়।

বিদেশিদের আধিক্যের কারণে ইতালির খেলোয়াড়দের জন্য ঘরোয়া শীর্ষ ক্লাবগুলোতে প্রথম একাদশে খেলার সুযোগ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়। গত কয়েক বছরে ‘সিরি-আ’য় রাজত্ব করে চলেছেন লাওতারো মার্তিনেজ, ভিক্টর ওসিমেন, রোমেলু লুকাকু, অলিভিয়ার জিরুর মতো অ-ইতালীয়রা। যেখানে ২০২৩-২৪ মৌসুমে সর্বোচ্চ ২৪ গোল করেছিলেন মার্তিনেজ। এবার (২০২৫-২৬ মৌসুমে) এখন পর্যন্ত ১৪ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি।

ইউরোপীয় ফুটবল বিশেষজ্ঞ জুলিয়েন লরেন্সের মতে ইতালির একাডেমি থেকে আশানুরূপ ফুটবলার উঠে আসছে না। বিবিসি স্পোর্টসকে তিনি বলেন, ‘ইতালির একাডেমিগুলো যথেষ্ট খেলোয়াড় তৈরি করছে না, অথবা এমন খেলোয়াড় তৈরি করছে না যারা তাদের প্রথম দলে খেলার জন্য উপযুক্ত। তারা যেভাবে অর্থ ব্যয় করে, তা ইতালীয় ক্লাবগুলোর কাছ থেকে আমরা যা দেখতে অভ্যস্ত, তার মতো নয়।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালির লীগের কয়েকটি শীর্ষ ক্লাব বড় ধরনের লোকসানের কথা জানা গেছে। সেটা তাদের ভবিষ্যত বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেক ক্লাব তাদের স্টেডিয়াম আধুনিকীকরণেও ব্যর্থ বলে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রচার হয়েছে। যদিও দেল পিয়েরো তা মনে করেন না। বিশ্বকাপের প্লে-অফের আগে দলটির সাবেক ফরোয়ার্ড দেল পিয়েরো সিবিএস-কে বলেছিলেন: ‘স্টেডিয়ামে সমস্যা?। আমরা জানি উন্নতি করতে হলে মাঠের বাইরেও ভালো খেলা দরকার। বয়সভিত্তিক ফুটবলও এর অন্তর্ভুক্ত।’

১২ বছর পর বিশ্বকাপে উঠতে হলে আর কেবল একটি জয় দরকার ছিল ইতালির। জেনিকার বিলিনো পোলজে স্টেডিয়ামে গত রাতে প্লে-অফ ফাইনালে ৪২ মিনিটে আলেহান্দ্রো বাস্তোনিকে হারিয়ে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইতালি। প্রথমার্ধ ১-০ গোলে শেষ করার পর তাদের কাছে বিশ্বকাপে ওঠা কেবল সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ ১১ মিনিট থেকেই ঘুরে যেতে থাকে সবকিছু। ৮০ মিনিটে হারিস তাবাকোভিচের গোলে বসনিয়া সমতায় ফেরার পর ট্রাইব্রেকারে ৪-১ গোলে জিতে যায় দলটি।

যে জেনারো গাত্তুসো খেলোয়াড় হিসেবে ২০০৬ ফুটবল বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, সেই গাত্তুসো এবার ইতালির কোচ। কাল রাতে বসনিয়ার কাছে হারের পর শিষ্যদের কান্না স্পর্শ করেছে তাঁকেও। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে। সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার নিজের কষ্টের চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে এই দলটাকে দেখে যারা এই কয়েক মাসে সত্যিই সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে। এটা আরেকটা বড় ধাক্কা। যদিও এবার আমরা এর যোগ্য ছিলাম না।’

২০২৫ সালের জুনে লুসিয়ানো স্পালেত্তিকে বরখাস্ত করার পর ইতালির কোচের পদে বসেন গাত্তুসো। বর্তমানে তাঁর (গাত্তুসো) চুক্তি ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। যদি ইতালি বিশ্বকাপে উঠত, তাহলে তাঁর মেয়াদ বাড়ানো হতো ২০২৮ সাল পর্যন্ত। নিজের ভবিষ্যতের চেয়েও গাত্তুসোর খারাপ লাগছে শিষ্যদের কথা ভেবে। যাঁরা এত কাছাকাছি গিয়েও উঠতে না পারার ব্যর্থতায় অঝোরে কাঁদছেন। ইতালির কোচ বলেন, ‘এখানে আমাদের ইতালির কথা বলা উচিত। জাতীয় দলের জার্সির কথা বলা উচিত। আমরা আরও বেশি পাওয়ার যোগ্য ছিলাম। আর সে কারণেই আমার ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

২০১৭ সালে সুইডেনের কাছে প্লে–অফে হেরে ২০১৮ বিশ্বকাপ খেলতে পারেনি ইতালির। উত্তর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে হারে কাতার বিশ্বকাপেও (২০২২ সাল) খেলা হয়নি আজ্জুরিদের। এবার ইতালি হেরে বসল বসনিয়ার কাছে। যেখানে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ইতালি অবস্থান করছে ১২ নম্বরে। আর বসনিয়া র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬৫তম দল। আজ্জুরিদের তাই অপেক্ষা করতে হবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত