Ajker Patrika

‘মাকে আমার পড়ে না মনে’

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
‘মাকে আমার পড়ে না মনে’
গোলপোস্টের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে। ছবি: ফিফা

‘মাকে আমার পড়ে না মনে।

শুধু কখন খেলতে গিয়ে

হঠাৎ অকারণে

একটা কী সুর গুনগুনিয়ে

কানে আমার বাজে,

মায়ের কথা মিলায় যেন

আমার খেলার মাঝে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামই হয়তো কখনো শোনেননি ভোজিনিয়া। আটলান্টিকের বুকে ভেসে থাকা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের এক দ্বীপে বেড়ে ওঠা এই গোলরক্ষকের বাংলা কবিতার সুর চেনারও কথা নয়। কিন্তু আটলান্টার স্টেডিয়ামের মিক্সড জোনে যখন তিনি দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন, রবীন্দ্রনাথের সেই পঙ্‌ক্তিগুলোই যেন ভেসে উঠল।

বাজারে শিরোপার দাবিদার স্প্যানিশদের দামটা বেশ চড়া। এক লামিনে ইয়ামালকে দিয়ে কেনা যাবে পুরো কেপ ভার্দেকে। সেই কেপ ভার্দে পরশু স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে লেখে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় রূপকথা। আর সেই রূপকথার নায়ক ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া।

বিশ্বমঞ্চে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রূপকথা লেখার রাতে গ্যালারিতে পাশে পাননি মাকে। ভিসার জটিলতা আর আর্থিক সংকটের কারণে মা আসতে পারেননি। ট্রফি হাতে অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কেঁদেছিলাম; কারণ, আমি আমার দাদা-দাদির কাছে বড় হয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত আজকের এই দিনে তাঁরা এখানে নেই। কয়েক বছর আগে তাঁরা মারা গেছেন। তাঁরাই ছিলেন আমার সব, আমার জীবনের সবকিছু। আর (কেঁদেছি) আমার মায়ের কারণে। ভিসার কারণে তিনি এখানে আসতে পারেননি। ভিসার জন্য যে অর্থ দিতে হয়, সেটার কারণে আমরা সময়মতো গুছিয়ে উঠতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম, তিনি এখানে থাকুন।’

কাগজে-কলমে দুই দলের ব্যবধান ছিল আকাশ আর পাতাল। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে ভোজিনিয়াই স্প্যানিশ আক্রমণের সামনে হয়ে উঠলেন দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর। ম্যাচের ৩৯ মিনিটে কুকুরেয়ার মাইনাস থেকে ফেরান তোরেসের বুলেট গতির শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে ফিরতি শটটি যখন জালে জড়াচ্ছিল, তখনই বাজপাখির মতো উড়ে গিয়ে বলটি বারের ওপর দিয়ে ভাসিয়ে দেন ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষক। পুরো ম্যাচে স্পেনের আক্রমণভাগ কেপ ভার্দের গোলমুখে মোট ২৭টি শট নেয়, সেগুলোর মধ্যে ১৬টিই ছিল ডি-বক্সের ভেতর থেকে।

স্পেনের লক্ষ্যে থাকা ৭টি শটের প্রতিটিই অতিমানবীয় দক্ষতায় প্রতিহত করেন ‘চল্লিশোর্ধ্ব তরুণ’। ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে দেশের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে মাঠে নেমে সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়ের কীর্তি গড়ার পাশাপাশি ম্যাচসেরার পুরস্কারও জিতে নেন তিনি।

বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ানো এই গোলরক্ষকের আসল নাম জোসিমার জোসে ইভোরা দিয়াস। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলে খেলা হোর্হে ভালদানোর পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে তাঁর বাবা নাম রাখতে চেয়েছিলেন ভালদানো। কিন্তু কেপ ভার্দের নিয়মে বিদেশি নাম নিবন্ধন নিষিদ্ধ থাকায় রেজিস্ট্রি অফিস তাতে বাধা দেয়। বাবার দ্বিতীয় পছন্দ ছিল ব্রাজিলের তারকা জোসিমার। এভাবেই এক লাতিন আমেরিকান নামকরণের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে তাঁর নাম হয় জোসিমার।

তবু পিঠের জার্সিতে কেন ‘ভোজিনিয়া’ লেখা। তা খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, নামটির অর্থ ‘ছোট দাদি’। শৈশবে বাবা সেনাবাহিনীতে থাকায় এবং মা কাজে ব্যস্ত থাকায় দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছেন। রাস্তায় বড় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলে হেরে যখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরতেন, বন্ধুরা খেপাত—ও আবার ওঁর দাদি কাছে নালিশ করতে যাচ্ছে। বন্ধুদের সেই খেপানো নামটাই সোশ্যাল মিডিয়া নাম কুড়াচ্ছে বেশ। মাঠের এই বীরত্বে ম্যাচের আগে যেখানে তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ছিল মাত্র ২০ হাজার, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তা লাখ ছাড়িয়ে কোটির পর্যায়ে চলে যাওয়ার উপক্রম।

২৫ বছর বয়স পর্যন্ত কেপ ভার্দের ঘরোয়া লিগে খেলা এই গোলরক্ষক একসময় হতাশ হয়ে ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি যেভাবে ইতিহাস গড়লেন, তা ছুঁয়ে গেছে ফুটবলবিশ্বকে। মাঠের খেলা শেষ হলেও আটলান্টার আকাশে তখন যেন গুনগুন করে বাজছিল মায়ের না-বলা সেই সুর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত