Ajker Patrika

কেপ ভার্দেতে যেমন চলছে মুসলমানদের জীবনযাত্রা

কাউসার লাবীব
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ১১: ২৯
কেপ ভার্দেতে যেমন চলছে মুসলমানদের জীবনযাত্রা
কেপ ভার্দের রাজধানী প্রাইয়া শহর। ছবি: সংগৃহীত

২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশ মুসলিম। প্রায় ৫ লাখ ৫ হাজার মোট জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই সম্প্রদায়ের সদস্যসংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার। এই জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালির মতো পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আসা সাম্প্রতিক সময়ের অভিবাসী, যাঁরা মূলত সান্তিয়াগো দ্বীপের প্রাইয়া (Praia) ও সাও ভিসেন্তে দ্বীপের মিনদেলোর (Mindelo) মতো শহুরে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছেন। এই মুসলিমরা প্রধানত সুন্নি মতাদর্শী এবং তাঁরা ছোট আকারের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবা খাতের সঙ্গে যুক্ত থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।

কেপ ভার্দেতে ইসলামের আগমন যেভাবে

১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা কেপ ভার্দেতে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে এবং আটলান্টিক দাস-বাণিজ্য ও পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলে যাতায়াতের কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে সান্তিয়াগো দ্বীপের রিবেরা গ্রান্দেতে (বর্তমানে সিদাদে ভেলহা) প্রথম বসতি গড়ে তোলে। একই সময়ে সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি থেকে আসা মুসলিম ব্যবসায়ী এবং ক্রীতদাসদের মাধ্যমে এখানে ইসলামের আগমন ঘটে। ওলোফ, মানদিলকা ও ফুলানি জাতিগোষ্ঠীর এই প্রারম্ভিক মুসলিমরা আখখেত ও গৃহস্থালি কাজের শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই রুটে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল থেকে পাঠানো ক্রীতদাসদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ইসলামিক জ্ঞান ছিল।

তবে পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষ ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ জোরালো করতে ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্মের একচেটিয়া আধিপত্য বলবৎ করে এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ইসলামি রীতিনীতি দমন করে। মুসলিম ক্রীতদাসদের জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করা হতো এবং প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত, মসজিদ নির্মাণ বা ধর্মীয় আচার পালনে নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১৫৯৪ থেকে ১৬২৫ সালের মধ্যে পর্তুগিজ লেখকদের বিবরণীতে স্থানীয় মুসলিম প্রচারকদের একটি রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। এই দমন-পীড়ন সত্ত্বেও কেপ ভার্দিয়ান ক্রেওল (Creole) সমাজে ওলোফ ও মানদিলকা ভাষা থেকে কিছু ভাষাগত উপাদান এবং শব্দভান্ডার যুক্ত হয়ে ইসলামের সূক্ষ্ম চিহ্ন টিকে থাকে। তবে ঔপনিবেশিক যুগে কোনো আনুষ্ঠানিক ইসলামি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি।

স্বাধীনতা-পরবর্তী মুসলমানদের অগ্রগতি

১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে কেপ ভার্দে স্বাধীনতা লাভ করার পর নতুন সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে ঔপনিবেশিক আমলের বিধিনিষেধ ছাড়াই প্রথমবারের মতো উন্মুক্তভাবে ইসলাম পালনের সুযোগ তৈরি হয়।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে কেপ ভার্দেতে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও বাণিজ্য উদারীকরণের ফলে পশ্চিম আফ্রিকার অর্থনৈতিক জোট ‘ইকোওয়াস’ (ECOWAS)-এর সদস্য দেশ (যেমন: সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালি) থেকে মুসলিম অভিবাসীদের আগমন বাড়ে। ১৯৯০ সালে দেশের রাজধানী প্রাইয়ায় প্রথম অফিসিয়াল মসজিদ নির্মিত হয়, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ইবাদত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ২০১৪ সালের একটি আইন অনুযায়ী, অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে বিচার মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের মাধ্যমে আইনি মর্যাদা ও করছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়, যা মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনগুলো লাভ করে। ২০০০-এর দশকে বোয়া ভিস্তা ও সালের মতো পর্যটনপ্রধান দ্বীপগুলোতে সেনেগালিজ মুসলিম ব্যবসায়ীরা তাঁদের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক আরও জোরদার করেন।

জনমিতি ও ভৌগোলিক বিস্তার

২০২১ সালের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের আদমশুমারি (মোট জনসংখ্যা ৪,৯১,২৩৩ জন) অনুযায়ী, কেপ ভার্দেতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৯০০ জন (১%)। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (IOM) ২০২২ সালের একটি সমীক্ষা দেখায় যে, কেপ ভার্দেতে বিদেশি বংশোদ্ভূত জনসংখ্যার ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ গিনি-বিসাউ ও ১১ দশমিক ৩ শতাংশ সেনেগাল থেকে এসেছে—যা এই অঞ্চলের সামগ্রিক মুসলিম জনসংখ্যার প্রধান অংশ।

ভৌগোলিক দিক থেকে, কেপ ভার্দেতে মুসলিমরা মূলত প্রধান দ্বীপগুলোর শহুরে ও পর্যটন এলাকায় কেন্দ্রীভূত, গ্রামীণ অঞ্চলে তাঁদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। সবচেয়ে বড় মুসলিম জামাত রয়েছে রাজধানী প্রাইয়া এবং বন্দরনগরী মিনদেলোতে। এ ছাড়া বোয়া ভিস্তা দ্বীপের ‘বাররাকা’ ও সাল দ্বীপের ‘সান্তা মারিয়া’ ও ‘এস্পারগোস’-এর মতো পর্যটন ও নির্মাণাধীন এলাকাগুলোতে মৌসুমি ও অস্থায়ী কাজের সন্ধানে বহু মুসলিম অভিবাসী বসবাস করছেন।

মসজিদ ও ইবাদতখানা

কেপ ভার্দেতে মুসলমানদের ইবাদতের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো এখনো সীমিত ও অনানুষ্ঠানিক। সাল দ্বীপে বর্তমানে তিনটি ছোট ইবাদতখানা রয়েছে (দুটি সান্তা মারিয়ায় ও একটি এস্পারগোসে), যা ওয়াক্তিয়া ও জুমার নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে স্থানীয় ইসলামি অ্যাসোসিয়েশন উপাসনাকারীদের ভিড় সামলাতে একটি সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে জমি বরাদ্দ চেয়েছে।

রাজধানী প্রাইয়ায় ইমাম আহমাদু নেকা থিয়ানের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ১৭টি দেশের সহায়তায় তহবিল গঠিত হলেও ভূমি বরাদ্দ-সংক্রান্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কাজ এখনো বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক ও অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতেই জুমার নামাজ, রমজানের তারাবি ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় সংগঠন ও নেতৃত্ব

কেপ ভার্দেতে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রধান সংগঠন হলো ‘কম্যুনিদাদে ইসলামিকা দে কাবো ভের্দে’। তবে যোগাযোগ ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এটি সব অঞ্চলের মুসলিমদের পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

ফলে, ২০২২ সালের শেষের দিকে ‘অ্যাসোসিয়েশন ইসলামিকা দে দাওয়াহ দে কাবো ভের্দে’ নামের একটি নতুন সংস্থা গঠিত হয়। ১১ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের এই সংস্থা ইসলামি দাওয়াহ, নতুন মুসলিমদের সহযোগিতা এবং প্রতি মাসে জাকাত ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণের মতো দাতব্য কাজ পরিচালনা করে। এই সংস্থার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম ইবরাইমা সিদি (গিনি-বিসাউয়ের নাগরিক, যিনি সৌদি আরব থেকে ইসলামি থিওলজিতে ডিগ্রিপ্রাপ্ত) ও মুয়াজ্জিন সেকু সুয়ারে। এখানকার মুসলিমদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সেনেগালের সুফি ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব রয়েছে।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব

মুসলিমরা স্থানীয় অর্থনীতিতে, বিশেষ করে খুচরা ব্যবসা ও হস্তশিল্পের বাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্যাথলিকপ্রধান ক্রেওল সমাজের সঙ্গে চমৎকার সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। দেশটির সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ধর্মের বিভেদ না থাকায় ও ১৯৯২ সালের আইনানুযায়ী পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকায় মুসলিমরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ছাড়াই বসবাস করছেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কেপ ভার্দে ধর্মীয় সহনশীলতার ওপর একটি ‘ইকোওয়াস’ (ECOWAS) সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সরকারি স্কুলগুলোতে মুসলিম শিশুদের জন্য ঐচ্ছিক নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার আবেদন করার আইনি অধিকার রয়েছে এবং জাতীয় গণমাধ্যমেও মুসলিমদের ধর্মীয় প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ দেওয়া হয়।

উৎসব ও ধর্মীয় আচার

কেপ ভার্দেতে মুসলিমরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পবিত্র রমজান মাসের রোজা পালন করেন এবং ইফতার ও সেহরির মাধ্যমে সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করেন। ঈদুল ফিতরের দিন প্রাইয়ার ‘তিরা শাপিউ’ মাল্টিপারপাস হলে শত শত মুসলিম ঈদের নামাজে সমবেত হন এবং অভাবীদের মাঝে ফিতরা বিতরণ করেন।

স্থানীয়ভাবে ‘তাবাস্কি’ (Tabaski) নামে পরিচিত ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ এখানে তিন দিনব্যাপী উদ্‌যাপিত হয়। ইমাম নেকা থিয়ানের নেতৃত্বে ঈদের জামাত শেষে ‘তেরা ব্রাঙ্কা’ নামের নির্দিষ্ট এলাকায় সাধ্যমতো পশু কোরবানি করা হয় এবং মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষেও মুসলিম মহল্লাগুলোয় সীমিত পরিসরে আলোচনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

মুসলিমদের বসবাসের চ্যালেঞ্জ ও সমসাময়িক পরিস্থিতি

ধর্মীয় দিক থেকে খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মাঝে কোনো বড় ধরনের সংঘাত নেই এবং চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রয়েছে। তবে ২০১৪ সালে কেপ ভার্দে সরকার বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ ও বসবাসের ক্ষেত্রে কঠোর রেসিডেন্স পারমিট (REJ) আইন চালু করায় অনেক সেনেগালিজ মুসলিম অভিবাসী প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও কাগজপত্রের অভাবে নানাবিধ আইনি জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এ ছাড়া মূল ভূখণ্ডের তুলনায় কেপ ভার্দেতে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও পর্যটন খাতের ওঠানামার কারণে মুসলিম অভিবাসীদের একাংশ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছেন।

উগ্রপন্থা বা চরমপন্থার কোনো রেকর্ড কেপ ভার্দেতে নেই। তবে সাহেল অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খরা ও খাদ্যসংকটের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পশ্চিম আফ্রিকা থেকে কেপ ভার্দে অভিমুখে অভিবাসনের চাপ কিছুটা বেড়েছে।

কেপ ভার্দেতে মুসলমানদের অবদান

কেপ ভার্দেতে ইসলামের প্রসারে স্থানীয় ও অভিবাসী উভয় পক্ষেরই অবদান রয়েছে। জেরাল্ডো গাউডেন্সিও গোমেজ বর্তমানে কেপ ভার্দে মুসলিম সম্প্রদায়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২২ ও ২০২৩ সালে তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলিমদের শান্তি ও জাতীয় সংহতির প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, ২০০০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে কেপ ভার্দেতে পর্যটনশিল্পের যে বিপুল জোয়ার আসে, তাতে সেনেগালিজ মুসলিম শ্রমিকেরা হোটেল সার্ভিস, নির্মাণ খাত ও হস্তশিল্প ব্যবসায় যুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া স্থানীয় কেপ ভার্দিয়ান নওমুসলিমদের দ্বারা গঠিত ‘আল ওয়াসিলাহ ফাউন্ডেশন’ সাও ভিসেন্তে দ্বীপে দরিদ্র পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্যসহায়তা প্রদান এবং আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। মুসলিম অভিবাসীদের মাধ্যমে কেপ ভার্দেতে সেনেগালিজ ঐতিহ্যবাহী খাবার জনপ্রিয় হয়েছে, যা দেশটির রন্ধনশৈলী ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

-গ্রোকিপিডিয়া অবলম্বনে

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত