Ajker Patrika

৪৭ বছরের বৈরিতা: অবশেষে যেভাবে চুক্তিতে পৌঁছাল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে কারা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ১০: ০০
৪৭ বছরের বৈরিতা: অবশেষে যেভাবে চুক্তিতে পৌঁছাল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে কারা
কাতার–মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: সংগৃহীত

তেহরানে কয়েক ঘণ্টার জন্য কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে হয়তো সবচেয়ে খারাপ সময়টা পেরিয়ে গেছে। ইতিহাস বলছে, বিগত ৪৭ বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে বৈরিতা বিরাজ করছে।

সেই বৈরিতা বিগত কয়েক মাস ধরে যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। এই অবস্থায় কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের প্রতি তিক্ত মনোভাবসম্পন্ন দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে বারবার যাতায়াত, আর ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর আলোচনার পর ছোট এই প্রতিনিধিদল দেখতে পাচ্ছিল একটি সমঝোতা গড়ে উঠছে। সেই সমঝোতার মধ্যে ছিল দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি ফের উন্মুক্তকরণ এবং পারমাণবিক আলোচনা শুরুর একটি কাঠামো।

তারপর গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে দোহায় ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দক্ষিণ ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান হামলা চালায়। আমেরিকান বোমাবর্ষণ থামার আগেই ইরান জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়তে শুরু করে। কাতারিরা তখন রানওয়ের ধারে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। প্রায় সাত ঘণ্টা, সকাল ৭টা পর্যন্ত, তাঁরা রানওয়েতে অপেক্ষা করেন। সেই সময় পর্যন্ত তাঁরা যে ভঙ্গুর কূটনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, তা যেন দ্বিগুণ গতিতে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, ‘এটা ছিল রোলারকোস্টারের মতো অভিজ্ঞতা।’

এ ঘটনাটি এক মাসব্যাপী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মূল টানাপোড়েনকে সামনে আনে। লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার যুদ্ধে ফিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখা। কিন্তু প্রতিবারই যখন মধ্যস্থতাকারীরা কোনো অগ্রগতির কাছাকাছি পৌঁছেছেন, তখনই আরেকটি হামলা, হুমকি বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তাঁদের সমঝোতাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

কাতার ও পাকিস্তানের আলোচনায় থাকা এক পাতার, ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকটির উদ্দেশ্য ছিল ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা। কিন্তু এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রায় অর্ধশতাব্দীর অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে হতো। পাশাপাশি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা ও দ্রুত ফল পাওয়ার তাগিদ, আর তেহরানের সেই প্রয়োজন যেকোনো সমঝোতা যেন দেশের ভেতরে গ্রহণযোগ্য ও বৈধ বলে প্রতীয়মান হয়।

এক কূটনীতিক বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল দুই পক্ষের ‘ধারার’ পার্থক্য। একদিকে দ্রুত চুক্তি চাওয়া ট্রাম্প, অন্যদিকে ইরানের ধীরস্থির ‘প্রক্রিয়া’, যেখানে আলোচনায় সপ্তাহ নয়, কখনো বছরের পর বছরও লেগে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘চুক্তিটিকে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে বৈধ হিসেবে দেখা দরকার। যেন মনে না হয় তারা গিয়ে নিছক আত্মসমর্পণ করেছে।’

এক টুকরো আবর্জনা

আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি এবং পরে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরও আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ছে বলেই মনে হচ্ছিল। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, এটি ‘বিশাল লাইফ সাপোর্টে’ আছে এবং ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবকে তিনি ‘আবর্জনা’ বলে বর্ণনা করেন।

পর্দার আড়ালে আলোচনা চললেও আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন কাতারকে আরও সক্রিয় হওয়ার অনুরোধ জানায়। তখন পর্যন্ত দোহা মূলত সহায়ক ভূমিকায় ছিল। মধ্যস্থতায় নেতৃত্বে ছিল পাকিস্তান, যা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত নির্বাচন। তাদের সঙ্গে ছিল মিসর ও তুরস্ক।

কাতার ওয়াশিংটনের পছন্দের যোগাযোগমাধ্যমগুলোর একটি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। হামাস থেকে তালেবান এবং ভেনেজুয়েলার বলিভারিয়ান শাসন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগে তারা ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর মতো কাতারও ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক উদ্যোগে কিছুটা পেছনের সারিতে চলে যায়।

কিন্তু যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার মুখে ট্রাম্পের সতর্কবার্তার পর অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারী আলি আল-থাওয়াদি ও হামাদ আল-কুবাইসির নেতৃত্বে কাতারি প্রতিনিধিদল তেহরানের উদ্দেশে রওনা হয়। মিশনটি গোপন রাখতে তারা তুরস্ক হয়ে যাত্রা করে। মধ্যস্থতার ভূমিকায় তুলনামূলক নতুন পাকিস্তানও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে নিজেদের যোগাযোগ কাজে লাগায়। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতেও তারা ভূমিকা রেখেছিল। এরপরই ১৯৭৯ সালের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

আস্থার সংকট

মধ্যস্থতাকারীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল দুই পক্ষের মধ্যে ন্যূনতম আস্থাও গড়ে তোলার চেষ্টা করা। আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের ভাষায়, ইরানিরা ‘ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে খুবই সন্দিহান’ ছিলেন। আলোচনার মাঝেই ইরান দুবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়। প্রথমবার গত বছরের জুনে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ শুরুর আগে, দ্বিতীয়বার ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ সংঘাত শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময়।

আলোচনার বিষয়ে অবগত ওই ব্যক্তি বলেন, ‘তাদের মনে হচ্ছিল এটি আবার হামলার পূর্বাভাস। আমেরিকানরা বারবার অবস্থান বদলাচ্ছে, কোনো প্রকৃত অঙ্গীকার নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাই মধ্যস্থতাকারীদের কাজের একটি বড় অংশ ছিল সেই আস্থা তৈরি করা।’

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিনিধিদল তেহরান ছাড়ার সময় মধ্যস্থতাকারীরা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তাঁরা একটি শক্তিশালী প্রস্তাব তৈরি করেছেন, যার প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদেরও সমর্থন রয়েছে।

কিন্তু সেই আশাবাদ দ্রুত ভেঙে যায়। ইরান ছাড়ার সময় তাঁদের জানানো হয়, ট্রাম্প হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ফোন করেন। তাঁরা জানান, মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন এবং তাঁকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

ট্রাম্প তাঁদের পরামর্শ শোনেন। সেদিনই তিনি পোস্ট করে জানান, পরদিনের জন্য নির্ধারিত ইরানের ওপর হামলা তিনি স্থগিত করেছেন। কারণ, তেহরানের সঙ্গে তখন ‘গুরুতর আলোচনা’ চলছিল। পরদিন সকালে, মঙ্গলবার ১৯ মে, কাতারের প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটনে উড়ে যায় ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ব্রিফ করতে। এর আগে গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে শেষোক্ত দুজনের সঙ্গে তারা কয়েক মাস ধরে কাজ করেছিল।

ট্রাম্পের সময়সীমার বিরুদ্ধে দর-কষাকষি

এরপর ট্রাম্প একটি সময়সীমা বেঁধে দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যস্থতাকারীদের স্পষ্ট করে জানান, সপ্তাহান্তের মধ্যেই তাঁর ইরানের জবাব দরকার, না হলে তিনি হামলা থেকে বিরত থাকবেন না। কাতারি ও পাকিস্তানি আলোচকরা আবার তেহরানে ফেরার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু আবারও নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা পুরো মিশনের ওপর ছায়া ফেলে। তেহরানে মধ্যস্থতাকারীদের যাওয়ার আগের রাতে, দুটি পশ্চিমা দেশ কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের জানায় যে ইসরায়েল ওই সপ্তাহের শেষ দিকে ইরানে হামলার কথা বিবেচনা করছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন।

ওই ব্যক্তিদের একজনের ভাষ্য, কাতারি কর্মকর্তারা তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাতে তাঁদের দল তেহরানে থাকা অবস্থায় ইসরায়েল হামলা না চালাবে সে বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। সেই নিশ্চয়তা পাওয়ার পর তারা আবার ইরানে ফিরে যায় এবং শুক্রবার ২২ মে সকালে তেহরানে অবতরণ করে।

মধ্যস্থতাকারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করেন। বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে দরকষাকষি চলতে থাকে। মূল বিষয়গুলো ছিল—যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে ইরানের দাবি অনুযায়ী অঙ্গীকার নিশ্চিত করা; উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর নিয়ে তেহরান আলোচনা করবে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ।

উভয় পক্ষই মনে করছিল তাদের অবস্থান শক্তিশালী। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। নতুন পাওয়া কৌশলগত সুবিধায় সাহসী হয়ে ওঠা ইরান জোর দিয়ে বলে আসছিল, এই জলপথ দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে তারা ফি আদায় করবে।

কিন্তু সমঝোতা চূড়ান্ত করতে মধ্যস্থতাকারীদের ইরানকে অন্তত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সময়ের জন্য ওই দাবি থেকে সরে আসতে রাজি করাতে হয়। একই শুক্রবার সন্ধ্যায় চাপ বাড়াতে তেহরানে পৌঁছান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ‘পাকিস্তানিরা পুরো বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিল এবং ফিল্ড মার্শালের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের কারণে তারা ছিল এই প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান মুখ। কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধনে নীরবে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে কাতারিরা।’

ট্রাম্প বারবার বলে আসছিলেন, ইরানকে প্রায় অস্ত্রমানের কাছাকাছি সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতেই হবে। শেষ পর্যন্ত ২৩ মে শনিবার ভোরে কাতারি প্রতিনিধিদল চলে যাওয়ার আগে ইরান ইউরেনিয়ামকে কম সমৃদ্ধ করার বা মজুত হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের একটি প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়, যা চূড়ান্ত চুক্তির দিকে আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল থাকবে।

শনিবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প বলেন, একটি চুক্তি ‘বেশির ভাগই আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত’ হয়েছে এবং ‘খুব শিগগির ঘোষণা করা হবে’। তবে পক্ষগুলো দর-কষাকষি চালিয়ে যেতে থাকে। ২৫ মে সোমবার গালিবাফ ও আরাঘচি আরও আলোচনার জন্য কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে দোহায় যান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও।

আলোচনার বিষয়ে অবগত একজন বলেন, ‘ইরানিরা অত্যন্ত সতর্ক আলোচক। তারা প্রতিটি শব্দ পরীক্ষা করে এবং তার অর্থ নিয়েও দর-কষাকষি করে।’ এরপরও প্রত্যাশামতো ইরান চুক্তিতে চূড়ান্ত সম্মতি দেয়নি। বিলম্বে বিরক্ত হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক বিষয়সংক্রান্ত কিছু ভাষা সংশোধন করে।

ইসরায়েলের জটিলতা

কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা আবার বিমানে ওঠেন। এবার তাঁরা যান মায়ামিতে, যেখানে তাঁরা এক দিন ধরে উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে আলোচনা করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। ৬ জুন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি যুদ্ধ শুরুর পর চতুর্থবারের মতো তেহরানে যান। তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির জন্য একটি চিঠি বহন করে নিয়ে যান।

কিন্তু আরও খারাপ পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছিল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৈরুতে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলার হুমকি দেন, যার ফলে লেবাননে ইরান-সমর্থিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঘিরে সংঘাত আরও তীব্র হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তেহরান, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে এই সংঘাতকেও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছিল, সে কারণে ১ জুন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করেছে।

এ কারণে ট্রাম্প ওই সোমবার বিকেলে ফোন করেন নেতানিয়াহুকে এবং যুদ্ধে তাঁর অংশীদারকে অশ্রাব্য ভাষায় তিরস্কার করেন। এতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরের সপ্তাহান্তে ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো আবারও ইসরায়েল ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়ে। কারণ, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ বৈরুতে একটি ভবনে হামলা চালায়। ওই এলাকা ছিল লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি, যা ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্সি শক্তি হিসেবে বিবেচিত। এই পাল্টাপাল্টি হামলা শেষ হয় ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর। তিনি বলেন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ সম্মত হয়েছে যে ‘গুলি বিনিময় বন্ধ হবে।’

অ্যাপাচি বিপর্যয়

সম্ভাব্য চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার একটি বড় কারণ তখন পর্যন্ত সামাল দেওয়া হয়েছিল। আর গত সপ্তাহের মঙ্গলবার মধ্যস্থতাকারীরা আবারও মনে করেছিলেন যে তাঁরা চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু দ্রুতই আরেকটি সংকট দেখা দেয়। আগের রাতে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার জন্য ট্রাম্প ইরানকে দায়ী করেন।

হেলিকপ্টারের ক্রুদের উদ্ধার করা হয় এবং ইরান ইঙ্গিত দেয় এটি ছিল ভুলবশত ঘটে যাওয়া ঘটনা। কিন্তু ট্রাম্প বলেন, তাঁকে এর জবাব দিতেই হবে। এর ফলে টানা দুই রাত পাল্টাপাল্টি হামলা চলে, যার মধ্যে সেই সংঘর্ষও ছিল যেখানে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা বিমানবন্দরে আটকা পড়ে যান। কাতারের প্রতিনিধিরা দোহায় ফিরে যাওয়ার পর আঞ্চলিক পর্যায়ে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয় ট্রাম্পকে বোঝাতে যে একটি ভালো চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং নতুন হামলা থেকে বিরত থাকা উচিত।

পাকিস্তানি ও আরব কূটনীতিকদের তথ্য অনুযায়ী, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল সানি, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক প্রধান সবাই মার্কিন নেতাকে ফোন করে আরও হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

এরপর, বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে ট্রাম্প আরও হামলার হুমকি দেন এবং সতর্ক করেন যে মার্কিন সেনারা ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল করে নিতে পারে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি জানান, তেহরানের সঙ্গে চুক্তির শেষ দফার বিষয়গুলো ‘সব পক্ষ’ অনুমোদন করেছে এবং তিনি একে ‘যুদ্ধের এক মহান নিষ্পত্তি’ বলে বর্ণনা করেন।

পুরো সপ্তাহজুড়ে সংঘর্ষ চললেও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক আলোচনা থামেনি। দোহায় নিম্নপর্যায়ের মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনা চালিয়ে যান। কিন্তু শুক্রবার ট্রাম্প—যিনি পুরো সপ্তাহজুড়ে কখনো বলছিলেন চুক্তি খুব কাছাকাছি—আবার কখনো ইরানের ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিলেন, ক্ষুব্ধভাবে অভিযোগ করেন যে তেহরান চুক্তির বিষয়বস্তু বিকৃতভাবে তুলে ধরছে। এতে আবারও আশঙ্কা তৈরি হয় যে মধ্যস্থতাকারীরা যখন সপ্তাহান্তে সুইজারল্যান্ডে প্রাথমিক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তিনি হামলার নির্দেশ দিতে পারেন।

আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি বলেন, ‘চুক্তির সবচেয়ে বড় বাধা ছিল উভয় পক্ষের চুক্তিবিরোধী নেতিবাচক গণমাধ্যম প্রচার এবং লবিং অভিযান।’

শেষ ধাক্কা

শনিবার ট্রাম্প যখন বলেন যে সমঝোতা স্মারক রোববার স্বাক্ষরিত হবে, তখনই কাতারের আলোচকেরা আবার তেহরানে ফিরে যান। ঠিক সেই সময় ইসরায়েল আবার বৈরুতে হামলা চালায়। এতে ট্রাম্প আবারও ক্ষুব্ধ হয়ে ফোন করেন এবং বলেন, ওই হামলা ‘ঘটা উচিত ছিল না’। কারণ, এটি ছিল হিজবুল্লাহর ‘খুব ছোট ও অর্থহীন’ হামলার জবাব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে তিনি বলেন, লেবাননের ‘কোথাও’ ইসরায়েলের আর কোনো হামলা হওয়া উচিত নয়।

অন্যদিকে কাতারের প্রতিনিধিরা চেষ্টা করছিলেন ইরানকে পাল্টা জবাব না দিতে রাজি করাতে। তাঁরা তেহরানে ১৭ ঘণ্টা কাটান। একপর্যায়ে তাঁরা তাঁদের ইরানি সমকক্ষদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের একটি ফুটবল ম্যাচও দেখেন। আরেক পর্যায়ে কাতারের প্রতিনিধিরা আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দেন। কারণ, ইরানিরা চুক্তির ভাষায় আরও পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

কাতারিরা সতর্ক করেন, ট্রাম্প তাঁর ৮০ তম জন্মদিন উদ্‌যাপনের জন্য হোয়াইট হাউসে আয়োজিত ইউএফসি অনুষ্ঠানে প্রবেশ করার আগেই যদি চুক্তি না হয়, তাহলে পরদিন আবারও মার্কিন হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তেহরান সময় রাত ১টার কিছু আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রথম নেতা হিসেবে ঘোষণা দেন, চুক্তিতে পৌঁছানো গেছে।

আলোচনা সম্পর্কে অবহিত ওই ব্যক্তি বলেন, ‘এটা ছিল অত্যন্ত তীব্র দেন–দরবার।’ তিনি বলেন, ‘এটা ছিল ক্লান্তিকর, কিন্তু স্বস্তিও ছিল। ম্যারাথন শেষ করার মতো, পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সতর্ক আশাবাদ আছে। কারণ, স্বাক্ষরের আগে এখনো পাঁচ দিন বাকি।’

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত