Ajker Patrika

অসম্ভবকে সম্ভব করেন হালান্ড

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
অসম্ভবকে সম্ভব করেন হালান্ড
ব্রাজিলকে হারানোর পর ‘ভাইকিং রো’ উদ্‌যাপন আর্লিং হালান্ড ও তাঁর সতীর্থদের। ছবি: এএফপি

সবুজ গালিচায় তিনি যখন বল নিয়ে ছোটেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বুকে তখন অবধারিতভাবেই কাঁপন ধরে। শরীরী শক্তি, অতিমানবীয় গতি আর গোলপোস্টের সামনে বরফশীতল মানসিকতা—সব মিলিয়ে আর্লিং হালান্ড যেন আধুনিক ফুটবলের এক নিখুঁত বিজ্ঞাপন।

কেউ তাঁকে ডাকেন ‘গোলমেশিন’, কেউ-বা বলেন ‘দানব’। তবে নরওয়ের এই স্ট্রাইকার নিজেকে স্রেফ একজন সাধারণ ফুটবলার ভাবতেই ভালোবাসেন, যাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হলো প্রতিপক্ষের জাল খুঁজে নেওয়া।

নিউজার্সি স্টেডিয়ামে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, নরওয়ে খুব কাছাকাছি গিয়েও হয়তো আরেকটি অসমাপ্ত গল্প লিখতে যাচ্ছে। ব্রাজিল বলের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সুযোগ তৈরি করছিল, আর নরওয়ে অপেক্ষা করছিল সেই একটি মুহূর্তের। স্টেডিয়ামে ৮০ হাজারের বেশি দর্শক তখনো জানতেন না, সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক রাত, যা নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসকে নতুন করে চেনাবে।

তারপর বলটা উঠল আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের পা থেকে। আর আকাশে উঠলেন হালান্ড। দুর্দান্ত এক হেডে কাঁপল জাল। ১০ মিনিট পর আবারও হালান্ড। এবার বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে আলিসনকে পরাস্ত করলেন। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ শেষ। আর নরওয়ে—ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে।

শেষ বাঁশি বাজার পর হালান্ডকে দেখা গেল মাঠে হাঁটতে হাঁটতে কাঁদছেন। আনন্দের কান্না। এমন কান্না, যা হয়তো ২৮ বছর ধরে অপেক্ষা করা একটি দেশেরও।

হালান্ডের খেলার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক হলো মাঠে তাঁর অসামান্য কার্যকারিতা। তিনি পুরো ম্যাচে হয়তো খুব বেশি সময় বল পায়ে রাখেন না, মাঝমাঠে নেমে খেলা তৈরিতেও তাঁর খুব একটা আগ্রহ দেখা যায় না। কিন্তু যখনই বক্সের আশপাশে বল পান, প্রতিপক্ষের জন্য তা ডেকে আনে চরম বিপর্যয়। মাত্র ৩০ বার বা তারও কম বার বল স্পর্শ করেও তিনি একাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন। এই অবিশ্বাস্য সামর্থ্যকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাতীয় দলে শেলদারুপ বলেছিলেন, ‘তাকে আপনি স্রেফ চোখ বন্ধ করে ক্রস বা পাস বাড়িয়ে দিন, বাকি কাজটা সে নিজেই করবে। ও মাঠে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক এবং দলের জন্য এক ভরসা।’

মাঠের এই গোল-বন্যা কিন্তু কোনো আকস্মিক বা কাকতালীয় বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন আর নিজেকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার এক আদিম তাড়না। ম্যানচেস্টার সিটিতে তাঁর ক্লাব কোচ পেপ গার্দিওলা একবার তাঁর এই গোলক্ষুধার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘হালান্ডের গোল করার ক্ষুধা সত্যিই অবিশ্বাস্য। সে সব সময় বক্সের মধ্যে সঠিক জায়গায় ও সঠিক সময়ে হাজির থাকে। সে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ফুটবল নিয়েই বাঁচে এবং প্রতিটা মুহূর্তে নিজেকে আরও উন্নত করতে চায়।’

দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি নরওয়ে। বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়েও তারা একসময় ৫০ নম্বরে পিছিয়ে পড়েছিল, যা দলটির ফুটবল ঐতিহ্যের সঙ্গে মোটেও মানানসই ছিল না। কিন্তু হালান্ডের শক্তিশালী কাঁধে ভর করে রাতারাতি বদলে গেছে দলটির পুরো চেহারা। চলমান বিশ্বকাপে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেননি স্বপ্নেও। হালান্ড বলেন, ‘আমি নরওয়েকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিন্তু ব্রাজিলকে হারিয়ে দেব—এমনটা স্বপ্নেও ভাবিনি। এই অবিশ্বাস্য মুহূর্তের কারণে মাঝেমধ্যে নিজেকে চিমটি কেটে দেখতে হয় যে আমি বাস্তবে আছি নাকি স্বপ্নে! দ্বিতীয় গোলটি নিয়ে তো এখন প্রায় মনে হচ্ছে, বলটা জালে যাওয়া ছিল ঈশ্বরের উপহার। যেন এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। এটা অবিশ্বাস্য।’

পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন হালান্ডের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নরওয়ের প্রধান কোচ স্টেল সোলবাকেন বুক ফুলিয়েই বলেন, ‘সে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা গোলস্কোরার। শারীরিকভাবে শক্তিশালী, যা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য প্রতি ম্যাচে কঠিন পরীক্ষা তৈরি করে। যেকোনো বিশ্বমানের রক্ষণভাগ একাই গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ওর আছে।’

বিশ্বকাপে চার ম্যাচে সাত গোল। গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের পাশে এখন তাঁর নাম। সামনে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড। এরপর হয়তো আর্জেন্টিনা, তারপর ফ্রান্স। অন্যভাবে বলতে গেলে, হ্যারি কেইন, লিওনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের বিপক্ষে সরাসরি লড়াই এবং টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুট জয়ের এক রোমাঞ্চকর সম্ভাবনা হালান্ডের সামনে। তবে স্বপ্নটা এখন নিশ্চয় আরও বড় তাঁর কাছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত