Ajker Patrika

মঙ্গলের দুই চাঁদে যাচ্ছে জাপান, চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মঙ্গলের দুই চাঁদে যাচ্ছে জাপান, চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
মঙ্গল গ্রহের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহের অভিযানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাপানি বিজ্ঞানীরা। উদ্ঘাটিত হতে পারে সৌরজগৎ ও পৃথিবীর প্রাণের রহস্য। ছবি: সংগৃহীত

মঙ্গলের দুই চাঁদ তথা উপগ্রহ ফোবোস ও ডিমোসে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাপানের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের আশা, এসব নমুনা সৌরজগতের উৎপত্তি এবং পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাবের রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। তবে একই সময়ে চীনের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী মিশনও নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফেরার লক্ষ্য নিয়েছে, যা সম্ভাব্যভাবে জাপানের আগেই কাজটি সম্পন্ন করতে পারে।

বিজ্ঞান সাময়িকী ফিজিক্স ডট অর্গের খবরে বলা হয়েছে, জাপানের মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন (এমএমএক্স) নামের এই মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তানেগাশিমা স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। মিশনটি ভবিষ্যতে মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর পথও প্রস্তুত করতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের সামনে মহাকাশযানটির পরিচয় প্রকাশ করা হয়। এটি প্রায় তিন বছর মঙ্গলের কক্ষপথে অবস্থান করবে এবং মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোসে অবতরণের চেষ্টা করবে। যানটি ফোবোসের পৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১০ গ্রাম (০.৩৫ আউন্স) উপাদান সংগ্রহ করবে। একই সময়ে আইডিইএফআইএক্স নামের একটি রোভার ফোবোসের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করবে। রোভারটির নাম নেওয়া হয়েছে কমিক চরিত্র অ্যাস্টেরিক্সের কুকুরের ফরাসি নাম থেকে।

মহাকাশযানটি মঙ্গলের অপর উপগ্রহ ডিমোসও পর্যবেক্ষণ করবে, তবে সেখানে অবতরণ করবে না। এরপর একটি রিটার্ন ক্যাপসুল পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা করবে এবং ২০৩১ সালের দিকে এটি অস্ট্রেলিয়ায় অবতরণ করতে পারে বলে জানা গেছে।

জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জেএএক্সএ) আশা করছে, এই মিশন মঙ্গল ও তার দুই উপগ্রহ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, সেই রহস্যের সমাধানে সহায়তা করবে। আর সেটি জানা গেলে সৌরজগত কীভাবে জন্ম নিয়েছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলতে পারে।

মঙ্গলের উপগ্রহগুলোর উৎপত্তি নিয়ে একটি তত্ত্ব হলো ‘জায়ান্ট ইমপ্যাক্ট’ বা বিশাল সংঘর্ষ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার পর সেই সংঘর্ষের ফলেই ফোবোস ও ডিমোসের সৃষ্টি হয়েছিল।

অন্যদিকে ‘ক্যাপচার’ বা মহাকর্ষীয় বন্দিত্ব তত্ত্ব বলছে, এই দুই উপগ্রহ আসলে বাইরের সৌরজগতের গ্রহাণু, যেগুলো মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আটকা পড়েছিল। এই দুই তত্ত্বের মধ্যে কোনটি সঠিক, তা নির্ধারণ করা গেলে জানা যাবে, কীভাবে পৃথিবীসহ পাথুরে গ্রহগুলোতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এই মিশন চারটি পাথুরে গ্রহ—সূর্যের সবচেয়ে কাছের বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গলের—সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

ফরাসি জ্যোতির্পদার্থবিদ এবং আইডিইএফআইএক্স প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্যাট্রিক মিশেল বলেন, ‘এমএমএক্স এমন পরিবহন-প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোকপাত করবে, যার মাধ্যমে বাইরের সৌরজগত থেকে পানি, উদ্বায়ী পদার্থ এবং জৈব যৌগগুলো ভেতরের পাথুরে গ্রহগুলোর অঞ্চলে পৌঁছেছিল। এই প্রক্রিয়াগুলো এই গ্রহগুলোকে বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।’

তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘ফোবোস ও ডিমোস যদি সত্যিই সেই প্রাথমিক সরবরাহ-ব্যবস্থার অবশেষ হয়ে থাকে, তাহলে এগুলোর মধ্যে প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে, কিংবা আরও সঠিকভাবে বললে, পাথুরে গ্রহগুলোতে প্রাণের উদ্ভবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো কীভাবে সেখানে পৌঁছেছিল, সে সম্পর্কে সূত্র থাকতে পারে।’

জেএএক্সএ আরও বলেছে, মিশনটি ফোবোসকে একটি ‘প্রাকৃতিক মহাকাশ স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করবে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গল পর্যন্ত গিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তৈরি করা হবে, যা মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

এমএমএক্স প্রকল্পটি ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পেস স্টাডিজ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার, নাসা, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং আরও প্রায় এক ডজন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে। মহাকাশযানটির অবতরণ পা বা ল্যান্ডিং লেগ তৈরি করা ছিল প্রকল্পটির অন্যতম কঠিন কাজ। কারণ ফোবোসের মহাকর্ষ অত্যন্ত দুর্বল।

মিতসুবিশি ইলেকট্রিকের প্রকৌশলী আকিনারি উয়েহারা বলেন, ‘অবতরণের সময় ধাক্কা প্রশমিত করার জন্য পাগুলোকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে (প্রোবটি) পড়ে না যায়।’

চাঁদে অবতরণের অভিজ্ঞতাও জাপানের জন্য খুব সুখকর ছিল না। জাপানের মনুষ্যবিহীন স্মার্ট ল্যান্ডার ফর ইনভেস্টিগেটিং মুন—যেটিকে ‘মুন স্নাইপার’ বলা হয়—২০২৪ সালে পৃথিবীর চাঁদে অবতরণের পর কাত হয়ে পড়েছিল। তবে এরপরও সেটি তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয় এবং চাঁদের পরপর কয়েকটি পৃথিবীর দুই-সপ্তাহ সমান দীর্ঘ রাতও টিকে ছিল।

তবে মহাকাশ থেকে নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে জাপানের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। জাপানের মনুষ্যবিহীন হায়াবুসা-২ মহাকাশযান ২০২০ সালে একটি গ্রহাণু থেকে সংগ্রহ করা ৫ দশমিক ৪ গ্রাম পাথর ও ধুলা পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছিল। গ্রহাণুটি পৃথিবী থেকে কয়েকশ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে ছিল।

তবে মহাকাশ থেকে মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা একমাত্র মিশন এমএমএক্স নয়। নাসার পারসিভিয়ারেন্স (Perseverance) রোভার ২০২১ সাল থেকে মঙ্গলের পৃষ্ঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং ইতোমধ্যে এমন কিছু নমুনা সংগ্রহ করেছে, যেগুলো ভবিষ্যতে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার কথা। তবে জানুয়ারিতে মার্কিন কংগ্রেসের একটি ভোটের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কার্যত এই মিশন বাতিল করেছে।

অন্যদিকে চীন ঘোষণা করেছে, তাদের তিয়ানওয়েন–৩ মহাকাশযান আনুমানিক ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণ করা হবে এবং মঙ্গল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফেরার লক্ষ্য রয়েছে ২০৩১ সালের দিকে। অর্থাৎ, নমুনা পৃথিবীতে ফেরানোর ক্ষেত্রে চীনের মিশন সম্ভাব্যভাবে জাপানের এমএমএক্সের আগেই কাজটি সম্পন্ন করতে পারে। চীনের তিয়ানওয়েন–১ মিশন ইতোমধ্যেই ২০২১ সালে মঙ্গলের পৃষ্ঠে ঝুরং নামে একটি রোভার অবতরণ করিয়েছিল। এটি চীনের মহাকাশ কর্মসূচির অন্যতম সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত