Ajker Patrika

সূর্যটা আর কত দিন আলো দেবে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সূর্যটা আর কত দিন আলো দেবে
ছবি: সায়েন্টিফিক আমেরিকা

পৃথিবীর আলো, উষ্ণতা ও প্রাণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই সূর্যকে আমাদের কাছে চিরস্থায়ী মনে হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। একসময় সূর্যও তার বর্তমান রূপ হারিয়ে ফেলবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তন ঘটতে এখনো বিপুল সময় বাকি। তবে সেই ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের বীজ ইতিমধ্যেই সূর্যের কেন্দ্রে তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে ‘সায়েন্টিফিক-আমেরিকা’ জানায়, সূর্যের শক্তির মূল উৎস হলো তাপ-নিউক্লীয় সংযোজন বা নিউক্লিয়ার ফিউশন। এর মাধ্যমে সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হিলিয়ামে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬০ কোটি মেট্রিক টন হাইড্রোজেন ফিউশন হয়ে প্রায় ৫৯ কোটি ৬০ লাখ টন হিলিয়াম তৈরি হয়। বাকি প্রায় ৪০ লাখ টন ভর আইনস্টাইনের বিখ্যাত E=mc ² সূত্র অনুযায়ী বিপুল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সূর্য প্রতি সেকেন্ডে যে শক্তি বিকিরণ করে, তা মানবসভ্যতার এক বছরে ব্যবহৃত শক্তির তুলনায় ছয় লাখ গুণেরও বেশি।

তবে ফিউশনের ফলে সূর্যের কেন্দ্রে হিলিয়াম জমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সেখানে হাইড্রোজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় কেন্দ্র সংকুচিত ও আরও উত্তপ্ত হয়। এর ফলে সূর্যের উজ্জ্বলতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত প্রায় ৪৬০ কোটি বছরে সূর্যের উজ্জ্বলতা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

প্রায় ১০০ কোটি বছর পর সূর্য এতটাই উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে যে পৃথিবীতে ভয়াবহ গ্রিনহাউস প্রভাব শুরু হবে। মহাসাগরের পানি ফুটে বাষ্প হয়ে মহাকাশে হারিয়ে যেতে পারে। ফলে পৃথিবী প্রাণধারণের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সূর্যের জীবন তখনো শেষ হবে না। সূর্যের প্রায় ১০.৯ বিলিয়ন বছর বয়সে, অর্থাৎ আজ থেকে ছয় বিলিয়নেরও বেশি বছর পর, সূর্যের কেন্দ্রে ফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় হাইড্রোজেন প্রায় শেষ হয়ে যাবে। তখন কেন্দ্রের চারপাশে থাকা হাইড্রোজেনের একটি স্তরে ফিউশন শুরু হবে। এতে সূর্যের বাইরের স্তরগুলো ফুলে উঠতে থাকবে। সূর্য প্রথমে সাবজায়ান্ট এবং পরে বিশাল লাল দানব বা রেড জায়ান্টে পরিণত হবে।

এই পর্যায়ে সূর্যের ব্যাস বর্তমানের প্রায় ১৭০ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং এর উজ্জ্বলতা বর্তমানের ২ হাজার গুণেরও বেশি হতে পারে। এতটাই প্রসারিত হবে যে বুধ গ্রহকে সূর্য গ্রাস করতে পারে। প্রবল নাক্ষত্রিক বাতাসে সূর্য নিজের মোট ভরের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি হারাতে পারে।

এরপর কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে হিলিয়াম ফিউশন শুরু হয়ে কার্বন ও অক্সিজেন তৈরি করবে। প্রায় ১০ কোটি বছর এই প্রক্রিয়া চলার পর হিলিয়ামও শেষ হয়ে যাবে। সূর্য আবার ফুলে উঠবে এবং অ্যাসিম্পটোটিক জায়ান্ট ব্রাঞ্চ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। তখন এর ব্যাস বর্তমানের প্রায় ২০০ গুণ এবং উজ্জ্বলতা প্রায় ২ হাজার গুণ হতে পারে।

শেষপর্যায়ে শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বাতাস সূর্যের বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে দেবে। পৃথিবী সূর্যের গ্রাস থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁচবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের হিসাব পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে বেঁচে গেলেও তখন পৃথিবী ভয়াবহভাবে উত্তপ্ত ও প্রাণহীন হয়ে পড়বে।

শেষে সূর্যের অবশিষ্ট কেন্দ্রটি পৃথিবীর আকারের কাছাকাছি একটি অতি ঘন, অত্যন্ত উত্তপ্ত কার্বন-অক্সিজেনের গোলকে পরিণত হবে। এর নাম হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা শ্বেত বামন। তখন সূর্যের বয়স হবে ১২ বিলিয়ন বছরেরও বেশি এবং এটি আর নতুন শক্তি উৎপন্ন করতে পারবে না।

এরপর আরও কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে ধীরে ধীরে ঠান্ডা ও অন্ধকার হয়ে সূর্য শেষ পর্যন্ত একটি ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ বা কৃষ্ণ বামনে পরিণত হবে—যদিও মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স বিবেচনায় এমন কোনো কৃষ্ণ বামন এখনো তৈরি হওয়ার মতো সময়ই পায়নি।

সূর্যের এই পরিণতি মানবসভ্যতার বর্তমান সময়ের তুলনায় অকল্পনীয় দূরের ভবিষ্যৎ। তত দিনে মানুষ আদৌ থাকবে কি না, কিংবা অন্য কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে নতুন আবাস গড়ে তুলবে কি না—তার উত্তর আজ কারও জানা নেই। জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান সূর্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি সম্ভাব্য সময়রেখা দেখাতে পারে; কিন্তু মানুষের ভবিষ্যৎ তার চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত