Ajker Patrika

আণবিক প্রতিবিম্ব ধাঁধা মিলিয়ে রসায়নে নোবেল পেলেন অঁরি কাগান ও কেনসো সোয়াই

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬: ২৭
আণবিক প্রতিবিম্ব ধাঁধা মিলিয়ে রসায়নে নোবেল পেলেন অঁরি কাগান ও কেনসো সোয়াই
অঁরি কাগান ও কেনসো সোয়াই। ছবি: নোবেল কমিটি

অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অণুর ‘দর্পণ রূপ’ বা বিপরীত প্রতিবিম্বসংক্রান্ত এক প্রাচীন বিজ্ঞান ধাঁধার সমাধান করে ২০২৬ সালের রসায়নে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার জিতে নিয়েছেন অঁরি বি কাগান এবং কেনসো সোয়াই।

অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিসে যুগান্তকারী উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তাঁরা।

রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নন-লিনিয়ার ইফেক্টস ও অটো ক্যাটালিসিস আবিষ্কারের মাধ্যমে ওষুধ, সুগন্ধি ও নতুন সামগ্রী তৈরির শিল্পে অভূতপূর্ব দুয়ার খুলে দেওয়ার সম্মানার্থে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁদের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে মনোনীত করে।

আজ বুধবার বাংলাদেশ সময় ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে তাঁদের নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস। নোবলে পুরষ্কারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিসে নন-লিনিয়ার ইফেক্টস এবং অটো ক্যাটালিসিস আবিষ্কারের জন্য’ অঁরি বি. কাগান এবং কেনসো সোয়াইকে ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

অঁরি বি কাগান ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদে কর্মরত এবং কেনসো সোয়াই টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সাইন্সে কর্মরত।

আণবিক ‘দর্পণ রূপ’ কী ও কেন এটি রহস্যময়?

রসায়নবিজ্ঞানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—কিছু অণু প্রকৃতির নিয়মে দুটি ভিন্ন রূপে বিদ্যমান থাকে, যা দেখতে একে অপরের আয়নায় দেখা প্রতিবিম্ব বা ‘মিরর ইমেজ’-এর মতো। ঠিক যেমন মানুষের ডান হাত ও বাম হাত দেখতে এক রকম হলেও একটির ওপর আরেকটি পুরোপুরি বসানো যায় না, বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘কাইরালিটি’ (Chirality)।

মানবদেহসহ পৃথিবীর সব সজীব উপাদানে যে অ্যামিনো অ্যাসিড বা শর্করা পাওয়া যায়, তা মূলত কেবল একটিমাত্র প্রতিবিম্ব রূপ ধারণ করে। যেমন—প্রকৃতির সব প্রোটিনে কেবল ‘বামহাতি’ বা নির্দিষ্ট এক ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের উপস্থিতি দেখা যায়।

কিন্তু কৃত্রিমভাবে বা গবেষণাগারে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে যখন কোনো যৌগ তৈরি করা হয়, তখন দুটি দর্পণ রূপই সমান পরিমাণে উৎপাদিত হয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—জীব সৃষ্টির শুরুতে কীভাবে রাসায়নিক এই অসামঞ্জস্যতা বা ‘কেমিক্যাল অ্যাসিমেট্রি’ তৈরি হলো? অর্থাৎ, প্রকৃতি কেন দুটি রূপের বদলে কেবল একটি প্রতিবিম্ব রূপকেই বেছে নিল?

বিজ্ঞানীদের কাছে এই বিষয়টি বহু বছর ধরে একটি রহস্য হয়ে ছিল।

যে আবিষ্কারের জন্য এই পুরস্কার

ফরাসি রসায়নবিদ অঁরি বি কাগান এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই এই রহস্যের একটি বৈজ্ঞানিক ও কার্যকরী সমাধান আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের গবেষণা দেখিয়েছে, অতি সামান্য কোনো রাসায়নিক অসামঞ্জস্যতা কীভাবে নিজেকে উত্তরোত্তর বাড়িয়ে (Self-amplification) পুরো ব্যবস্থায় কেবল একটি প্রতিবিম্ব রূপ আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।

অঁরি বি কাগান: তিনি কাইরাল ক্যাটালিসিস বা অসামঞ্জস্য অনুঘটন ক্ষেত্রে মৌলিক কাঠামো গড়ে তোলেন। তাঁর গবেষণা দেখায় কীভাবে কৃত্রিম বিক্রিয়াতেও একটি নির্দিষ্ট দর্পণ রূপ তৈরি করা সম্ভব।

কেনসো সোয়াই: তিনি বিখ্যাত ‘সোয়াই বিক্রিয়া’ উদ্ভাবন করেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, বিক্রিয়ার শুরুতে থাকা একটি অণুর অতি সামান্য আধিপত্য নিজেরই প্রতিলিপি তৈরি করে পুরো মিশ্রণকে একক প্রতিবিম্ব রূপে রূপান্তর করতে পারে।

অঁরি কাগান রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন উপায় আবিষ্কার করেছিলেন, যা পূর্বের ধারণার চেয়েও একটি নির্দিষ্ট মিরর ইমেজের (আণবিক প্রতিচ্ছবি) বৃহত্তর আধিক্য তৈরির সুযোগ করে দেয়। রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে যারা ওষুধ, সুবাস, সুগন্ধি এবং নতুন সামগ্রী তৈরি করেন, সেই রসায়নবিদদের জন্য তাঁর এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে।

কেনসো সোয়াই এমন প্রথম রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা করেছিলেন, যেখানে সম্ভাব্য অনুমিত মিরর ইমেজগুলোর মধ্যে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিচ্ছবি তৈরি হতো। জীবনপ্রক্রিয়া বা প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম ব্যতিরেকে এর আগে কেউ এই কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেনি। সোয়াই বিক্রিয়াটি এযাবৎকাল পরিচালিত সবচেয়ে চোখধাঁধানো রাসায়নিক পরীক্ষাগুলোর একটি।

নোবেল পুরষ্কারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, কিছু অণু, যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড, দুটি ভিন্ন রূপে অবস্থান করে যা একে অপরের আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিরূপ (মিরর ইমেজ)। তবে জীবদেহে এই প্রতিরূপগুলোর মধ্যে কেবল একটিমাত্র রূপই বিদ্যমান থাকে। রাসায়নিক ব্যবস্থার এই ধরনের অসমতা কীভাবে উদ্ভূত হতে পারে, তা রসায়নবিদদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে এক বড় রহস্য ছিল। এই ধাঁধার সমাধানই আবিষ্কার করেছে অঁরি বি. কাগান এবং কেনসো সোয়াইকে ২০২৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিস বিষয়টি খুব সহজ করে বোঝার জন্য আমাদের ডান হাত আর বাম হাতের উদাহরণ দেওয়া যায়। আপনার ডান হাত আর বাম হাত দেখতে প্রায় একই রকম, আঙুলগুলোর সাজানো রূপও এক। কিন্তু আপনি যদি ডান হাতের ওপর বাম হাত এনে রাখার চেষ্টা করেন, দেখবেন একটার ওপর অন্যটা একদম নিখুঁতভাবে মিলবে না। তবে আয়নায় যদি ডান হাতটি ধরেন, তবে আয়নার প্রতিচ্ছবিটিকে দেখতে ঠিক বাম হাতের মতোই লাগবে।

রসায়নের ভাষায় কিছু অণুর গঠনও ঠিক এমনই। এরা দেখতে একই রকম হলেও এদের ‘ডানহাতি’ (ডি–ফর্ম) ও ‘বামহাতি’ (এল–ফর্ম) দুটি রূপ থাকে, যেগুলোকে বলা হয় এনানশিওমার। সাধারণত গবেষণাগারে যখন কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়, তখন আপনা-আপনি ৫০ শতাংশ ডানহাতি এবং ৫০ শতাংশ বামহাতি অণু তৈরি হয়ে যায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত