
পারমাণবিক শক্তি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান কার্বন-মুক্ত শক্তির উৎস। যখন বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) পারমাণবিক শক্তিকে একটি অনন্য ও টেকসই সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এখানে পারমাণবিক শক্তির পেছনের বিজ্ঞান, এর উৎপাদনের প্রক্রিয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে এর গুরুত্ব নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করো হলো:
পারমাণবিক শক্তি কী?
পারমাণবিক শক্তি হলো পরমাণুর কেন্দ্র বা ‘নিউক্লিয়াস’ থেকে নির্গত শক্তি। পরমাণুর কেন্দ্রে প্রোটন এবং নিউট্রন থাকে, যা ‘নিউক্লিয়ার বাইন্ডিং এনার্জি’ নামক প্রচণ্ড এক শক্তির মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই আবদ্ধ শক্তি মূলত দুটি পদ্ধতিতে নির্গত বা মুক্ত করা যায়:
ফিশন: একটি ভারী পরমাণুর কেন্দ্র যখন ভেঙে একাধিক ছোট অংশে বিভক্ত হয়।
ফিউশন: যখন একাধিক হালকা পরমাণুর কেন্দ্র প্রচণ্ড চাপে ও তাপে মিশে গিয়ে একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত হয় (সূর্য এই পদ্ধতিতে শক্তি উৎপন্ন করে)।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে তা হলো পারমাণবিক ফিশন। ফিউশন প্রযুক্তি এখনো গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।
পারমাণবিক ফিশন কীভাবে কাজ করে?
নিউক্লিয়ার ফিশন মূলত একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ভৌত-রাসায়নিক বিক্রিয়া। যখন একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়, তখন তা বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত করে।
ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া:
আঘাত: যখন একটি ধীরগতির নিউট্রন ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর কেন্দ্রে আঘাত করে, তখন কেন্দ্রটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
বিভাজন: এই অস্থিতিশীলতার ফলে কেন্দ্রটি ভেঙে দুটি ছোট নিউক্লিয়াসে (যেমন: বেরিয়াম এবং ক্রিপ্টন) পরিণত হয়।
নিউট্রন নিঃসরণ: বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে দুই বা তিনটি অতিরিক্ত নিউট্রন তীব্র গতিতে বের হয়ে আসে।
শৃঙ্খল বিক্রিয়া: এই নতুন নিউট্রনগুলো আশপাশে থাকা অন্যান্য ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুকে পুনরায় আঘাত করে। এভাবে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে একটি গুণিতক হারে বিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রচুর তাপ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণ উৎপন্ন করে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে কাজ করে?
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো এর রিঅ্যাক্টর। একে একটি উচ্চ-প্রযুক্তির ‘চুল্লি’ হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে যেখানে ফিশন বিক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটানো হয়।
ফুয়েল অ্যাসেম্বলি: ইউরেনিয়ামকে ছোট সিরামিক দানায় রূপান্তরিত করে ধাতব টিউব বা রডের ভেতর রাখা হয়। শত শত রড মিলে তৈরি হয় একটি ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’।
মডারেটর ও কন্ট্রোল রড: রিঅ্যাক্টরের ভেতরে নিউট্রনের গতিনিয়ন্ত্রণ করতে ‘মডারেটর’ (সাধারণত পানি) এবং বিক্রিয়ার হার কমাতে বা বাড়াতে বোরন বা ক্যাডমিয়ামের তৈরি ‘কন্ট্রোল রড’ (দণ্ড) ব্যবহার করা হয়।
বাষ্প উৎপাদন: ফিশন থেকে প্রাপ্ত তাপ রিঅ্যাক্টরের কুল্যান্টকে (পানি) উত্তপ্ত করে। এই উত্তপ্ত পানি বাষ্প তৈরি করে যা পাইপের মাধ্যমে টারবাইনে পাঠানো হয়।
বিদ্যুৎ জেনারেশন: বাষ্পের প্রচণ্ড চাপে বিশাল আকৃতির টারবাইন ঘুরতে শুরু করে, যা একটি ইলেকট্রিক জেনারেটরকে সক্রিয় করে এবং লো-কার্বন বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে।
ইউরেনিয়াম চক্র: খনি থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় ধাতু। এটি পাওয়া যায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের শিলাস্তরে। এর দুটি প্রধান আইসোটোপ রয়েছে: ইউরেনিয়াম-২৩৮ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫।
সমৃদ্ধকরণ: প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে ফিশনযোগ্য ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর পরিমাণ ১ শতাংশের কম থাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় এর ঘনত্ব ৩-৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়, যাকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বলে।
জ্বালানি চক্র: একবার লোড করার পর ইউরেনিয়াম জ্বালানি ৩ থেকে ৫ বছর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারে।
বর্জ্য ও রিসাইক্লিং: ব্যবহৃত জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তিতে এই ব্যবহৃত জ্বালানিকে রিসাইকেল করে বিশেষ ধরনের রিঅ্যাক্টরে পুনরায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
রিঅ্যাক্টরের প্রকারভেদ
বর্তমানে বিশ্বে ৪৫০টিরও বেশি বাণিজ্যিক রিঅ্যাক্টর কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো লাইট-ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (এলডব্লিউআর)। এর দুটি ধরন রয়েছে:

প্রেসারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (পিডব্লিউআর): এখানে রিঅ্যাক্টর কোরের ভেতর পানিকে অত্যন্ত উচ্চ চাপে রাখা হয় যাতে তা ফুটতে না পারে। এই অতি-তপ্ত পানি একটি হিট এক্সচেঞ্জারের ভেতর দিয়ে গিয়ে অন্য একটি পৃথক পানির উৎসকে বাষ্পীভূত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ শতাংশ রিঅ্যাক্টর এই প্রযুক্তির।

বয়েলিং ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (বিডব্লিউআর): এই ব্যবস্থায় রিঅ্যাক্টর ভেসেলের ভেতরেই সরাসরি পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয় এবং সেই বাষ্প সরাসরি টারবাইন ঘোরাতে ব্যবহৃত হয়।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পিডব্লিউআর (প্রেসারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষত, এতে রাশিয়ার রোসাটম কর্তৃক সরবরাহকৃত দুটি তৃতীয়+ প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর (এএস-২০০৬/ভি-৩৯২এম নকশা) রয়েছে। এই লাইট-ওয়াটার রিঅ্যাক্টরগুলো উচ্চ চাপের পানিকে কুল্যান্ট এবং নিউট্রন মডারেটর উভয় হিসেবেই ব্যবহার করে, যা সম্মিলিতভাবে ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা দিতে পারে।
পারমাণবিক শক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন
পারমাণবিক শক্তিকে ‘সবুজ জ্বালানি’ হিসেবে বিবেচনা করার অন্যতম কারণ হলো এর কার্বন নিঃসরণহীনতা। কয়লা বা গ্যাসচালিত কেন্দ্রের তুলনায় পারমাণবিক কেন্দ্র পরিচালনা কালে কোনো কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় না।
সৌর বা বায়ু শক্তি আবহাওয়া নির্ভর হলেও পারমাণবিক শক্তি বছরের ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা সমান হারে বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম।
পারমাণবিক শক্তি আজ কেবল একটি জ্বালানি বিকল্প নয়, বরং এটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং ধরিত্রীকে বাঁচাতে এক অপরিহার্য বৈজ্ঞানিক সমাধান। সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড বজায় রেখে এটি হতে পারে ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ জ্বালানি।

পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো প্রাণের অস্তিত্বের এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছেন এবং মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই একা নই, এমন কোনো ইঙ্গিতের জন্য সংকেতও শুনে চলেছেন। এবার হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এবং ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের...
৫ দিন আগে
পৃথিবীর আলো, উষ্ণতা ও প্রাণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই সূর্যকে আমাদের কাছে চিরস্থায়ী মনে হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। একসময় সূর্যও তার বর্তমান রূপ হারিয়ে ফেলবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তন ঘটতে এখনো বিপুল সময় বাকি।
৮ দিন আগে
আফ্রিকা মহাদেশ ধারণার চেয়েও দ্রুত দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পথে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভূতত্ত্ববিদেরা। মহাদেশটির একটি সক্রিয় রিফট বা ভূত্বক বিচ্ছিন্ন হওয়া অঞ্চল ইতিমধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ সীমা’ বা ক্রিটিক্যাল থ্রেশহোল্ডে পৌঁছে গেছে। ফলে আগামী কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যে এই অঞ্চল ভেঙে গিয়ে সেখানে...
৯ দিন আগে
মানব মস্তিষ্ক বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো, মস্তিষ্কের ভেতরেই একজন ‘মানুষের’ টিকে থাকা। কারণ মানুষ জীবিত থাকা অবস্থায় তার মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বা ধূসর পদার্থ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন না। ফলে মস্তিষ্ক কীভাবে বিকশিত হয়, কীভাবে এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়...
৯ দিন আগে