Ajker Patrika

টাক সমস্যার সমাধান হাজার বছরের প্রাচীন চীনা ভেষজে: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ১৩: ০১
টাক সমস্যার সমাধান হাজার বছরের প্রাচীন চীনা ভেষজে: গবেষণা
ভেষজেই রয়েছে টাক সমস্যার সমাধান। ছবি: সংগৃহীত

পুরুষদের চুল পড়া বা টাক পড়া (অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া) সমস্যার চিকিৎসায় ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি উদ্ভিদের শিকড় অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই আবিষ্কারটি প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যা ও আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পুরুষ ‘অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া’ বা পুরুষালি টাক সমস্যায় ভুগে থাকেন। এই সমস্যায় সাধারণত মাথার হেয়ার ফলিকল বা চুলের গোড়াগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে চুল ক্রমান্বয়ে পাতলা ও ছোট হতে থাকে এবং একপর্যায়ে চুল গজানোর প্রক্রিয়াটি ধীর বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমানে এই সমস্যার চিকিৎসায় ‘ফিনাস্টেরাইড’ এবং ‘মিনোক্সিডিল’-এর মতো ওষুধ ব্যবহার করা হলেও, সবার ক্ষেত্রে এগুলো উপযুক্ত নয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলো ব্যবহারের ফলে যৌন অক্ষমতা কিংবা মাথার ত্বকে অ্যালার্জির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

এই পরিস্থিতিতে ‘জার্নাল অব হোলিস্টিক ইন্টিগ্রেটিভ ফার্মেসি’তে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘পলিগোনাম মাল্টিফ্লোরাম’ উদ্ভিদের শিকড় এই চুল পড়া রোধের নিরাপদ বিকল্প থেরাপি হতে পারে।

এই গবেষণার অন্যতম লেখক হান বিক্সিয়ান বলেন, ‘আমাদের এই বিশ্লেষণ প্রাচীন জ্ঞান এবং আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে একটি নিখুঁত সেতু বন্ধন তৈরি করেছে।’

হাজার বছরের প্রাচীন ভেষজ

চীনে এই ঔষধি উদ্ভিদটি মূলত ‘হে শৌ উ’ নামে পরিচিত। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন চীনা গ্রন্থে এই ভেষজটিকে ‘চুল কালো করা এবং জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করার’ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে, এই ভেষজটি ঠিক কোন জৈবিক প্রক্রিয়ায় বা কীভাবে চুল গজাতে সাহায্য করে, তা এত দিন বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট ছিল না।

সাম্প্রতিক গবেষণায় গবেষকেরা জানতে পেরেছেন, এই ভেষজটি কেবল একটি নির্দিষ্ট উপায়ে কাজ করে না, বরং চুল পড়া রোধ এবং নতুন চুল গজানোর সঙ্গে জড়িত একাধিক জৈবিক প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে প্রভাবিত করে।

চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘পলিগোনাম মাল্টিফ্লোরাম’ উদ্ভিদের শিকড়। ছবি: সংগৃহীত
চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘পলিগোনাম মাল্টিফ্লোরাম’ উদ্ভিদের শিকড়। ছবি: সংগৃহীত

যেভাবে কাজ করে এই ভেষজ

গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষের টাক পড়ার জন্য মূলত ‘ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন’ (ডিএইচটি) নামের একটি হরমোন দায়ী। এই হরমোনটি চুলের গোড়া বা ফলিকলগুলোকে সংকুচিত করে ফেলে, যার ফলে চুল দুর্বল হয়ে যায়।

‘পলিগোনাম মাল্টিফ্লোরাম’ এই ডিএইচটি হরমোনের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে চুলের গোড়াকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

এটি চুলের ফলিকল কোষগুলোর অকাল মৃত্যু রোধ করে মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। সুস্থ চুল গজানোর চক্র বজায় রাখতে এটি অত্যন্ত জরুরি।

এই ভেষজটি চুলের কোষগুলোর বৃদ্ধি, যোগাযোগ এবং টিস্যু মেরামতের সংকেতগুলোকে সক্রিয় করে। এই সংকেতগুলো শক্তিশালী হলে চুলের ফলিকলগুলো পুনরায় সচল হয় এবং নতুন চুল গজাতে শুরু করে।

গবেষক ড. বিক্সিয়ান বলেন, ‘আমরা অবাক হয়েছি যে সপ্তম শতকের তাং রাজবংশ থেকে শুরু করে প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে চুলের যত্নে এই উদ্ভিদের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক চুল বিজ্ঞানের ধারণার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। আধুনিক গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে এটি কেবল কোনো লোকগাথা নয়, এটি প্রকৃত ঔষধবিজ্ঞান।'

গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা এই উদ্ভিদের ওপর করা পূর্ববর্তী গবেষণাগারের পরীক্ষা, ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট এবং প্রাচীন ভেষজ নথিপত্র বিশ্লেষণ ও তুলনা করেছেন।

তাঁদের এই পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাজারে প্রচলিত বেশির ভাগ চিকিৎসা যেখানে কেবল বিদ্যমান চুলকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে, সেখানে এই চীনা ভেষজটি চুল পড়া কমানোর পাশাপাশি নতুন চুল গজানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে।

গবেষকেরা তাঁদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, ঐতিহ্যবাহী নিয়ম মেনে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হলে এই ভেষজটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। ফলে যেসব রোগী প্রচলিত আধুনিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (যেমন—যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া বা মাথার ত্বকে চুলকানি) নিয়ে শঙ্কিত, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য একটি চিকিৎসা হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই গবেষণাটি আগামী প্রজন্মের চুল গজানোর উন্নত ও নিরাপদ থেরাপি বা ওষুধ তৈরিতে নতুন পথ দেখাবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত