Ajker Patrika

প্রতি মাসে ৬ নেতা-কর্মী খুন

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা
প্রতি মাসে ৬ নেতা-কর্মী খুন

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৩৮ নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে অন্তত ছয় নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্যে এই হিসাব পাওয়া গেছে। এই হিসাব গত ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল ২৮ জুলাই পর্যন্ত। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৯১ জন খুন হয়েছে।

পুলিশ বলেছে, এসব হত্যার নেপথ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পদ-পদবি ও নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ও দুর্বৃত্তদের হামলা। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্তত ১৯টি ঘটনার সঙ্গে বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ।

কয়েকটি ঘটনায় সংগঠনের কয়েক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তারও হয়েছেন।

বিএনপি এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনকে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা ওত পেতে বসে আছে। এদেরই হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন দলের নেতা-কর্মীরা।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সরকার ও প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। পুলিশ প্রশাসন আরও বেশি কর্মতৎপর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়ে বিএনপি ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। আসকের তথ্য মতে, ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি জুলাই পর্যন্ত সময়ে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নিহত ৩৮ নেতা-কর্মীর মধ্যে বিএনপির রয়েছেন ২১ জন, জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৮ জন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং তাঁতী দলের ১ জন।

সর্বশেষ ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন যুবদলের কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ। তিনি কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর অনুসারী ছিলেন। ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন যুবদলের আরেক কর্মী ও এক সবজি বিক্রেতা। কাফরুল থানার পুলিশ ও ডিবি এ ঘটনায় গত সোমবার পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁরা হলেন শ্যুটার চঞ্চল মোল্লা, জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা, মাসুম বিল্লাহ, নাহিদ হাসান, আবির হাওলাদার, আলী হোসেন ও শাফিন আহমেদ। তাঁদের মধ্যে চঞ্চলকে ঘটনাস্থল থেকে পালানোর সময় অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশে তুলে দেয় স্থানীয় জনতা।

পুলিশ বলেছে, এই ব্যক্তিরা ভাড়াটে খুনি। তাঁরা যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যা করতে এসেছিলেন। ঘটনাস্থলে তাঁদের অবস্থান লোকজনের মনে সন্দেহ জাগালে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা এলোপাতাড়ি গুলি করে পালানোর সময় ইউসুফ গুলিতে নিহত এবং দুজন আহত হন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম সোমবার বলেন, গ্রেপ্তার শুটারদের বাড়ি ঝিনাইদহ ও মাগুরায়। হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যা করতে তাঁদের ২৫ লাখ টাকায় ভাড়া করেছিলেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজ। এই দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। স্থানীয় ময়লার দরপত্র, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা, একটি টিনশেড বাড়ির দখলকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর জেরে বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

জানা গেছে, হাফিজুর রহমান ও হাফিজুল ইসলাম একসময় বন্ধু ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কাফরুল, ভাষানটেক ও মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার ময়লার দরপত্র, ডিশের ব্যবসা, পানির ব্যবসা, ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ ও আওয়ামী লীগ নেতার টিনশেড বাড়ি দখল নিয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়।

অবশ্য হাফিজুল ইসলাম বাবু সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, হাফিজুর রহমানের সঙ্গে তাঁর কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। তিনি কেন তাঁকে হত্যা করতে চান, তা তিনি ভালো জানবেন।

কেউ কেউ বলেছেন, হাফিজুল ইসলাম বাবু আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হতে চান। কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনিও প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়ে বাবু ও জনির মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। জনির পক্ষ হয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হাফিজুর এই ষড়যন্ত্র করেছেন বলে বাবুর ধারণা। তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমাকে টার্গেট করা হয়েছে। ইতিমধ্যে হাফিজের নাম এসেছে, বাকিদেরও নাম বের হবে।’

জনি অভিযোগ অস্বীকার করে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাবু ছাড়াও আরও কয়েকজন কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের সবাইকে কী আমি মেরে কাউন্সিলর হবো? তাঁকে কেন টার্গেট করব? দল যাঁকে সমর্থন দেবে তিনি নির্বাচন করবেন।’

ইউসুফ হত্যাকাণ্ডের পর থেকে হাফিজুর পলাতক থাকায় অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বলেছে, হাফিজুরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এর আগে ৮ জুন রাতে রাজধানীর মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় যুবদলের ২১ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না বলেন, ‘রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। কিন্তু সেটি খুনোখুনিতে পৌঁছাতে পারে না। আমরা অনেক নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করেছি, সতর্ক করেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলব, যারা অপরাধী তাদের কোনো দল নেই। তাদের অপরাধের শাস্তি পেতেই হবে। সব নেতা-কর্মীকে সাংগঠনিক বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।’

এদিকে গত রোববার রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের শম্ভূপুরা ইউনিয়নের চরহোগলার বালুরঘাট এলাকায় বিএনপির কর্মী রাজু আহম্মেদকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি খামারি ছিলেন। স্বজনদের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও প্রায় তিন মাস নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এরপর থেকে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার সঙ্গে তাঁর শত্রুতা তৈরি হয়।

চট্টগ্রামের রাউজানে ১৩ জুন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে, ১২ জুন খুলনার লবণচরার মাথাভাঙ্গায় বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলামকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২ জুন ময়মনসিংহে খুন হন বিএনপির কর্মী রানা মিয়া। ৯ জুন বাগেরহাটের ফকিরহাটে বারুইপাড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এদিকে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১০ মার্চ বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষের পরদিন খেত থেকে যুবদলের কর্মী সজিব চৌধুরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, মূলত আর্থিক এবং রাজনৈতিক পদ-পদবি এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। দেশে বেআইনি কিছু আর্থিক খাত রয়েছে, যেমন ফুটপাত, ময়লা-বাণিজ্য, পরিবহন খাত। এসব দখল বা নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আরেকটি বিষয় হলো পদ-পদবির জন্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে খুন করার প্রবণতা দেশে রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত