Ajker Patrika

মিত্রদের মান ভাঙালেন তারেক রহমান, সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯: ০৮
মিত্রদের মান ভাঙালেন তারেক রহমান, সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস
প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি টেবিল ঘুরে যুগপৎ আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। ছবি: পিএমও

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পর মিত্রদের অনেকের সঙ্গেই সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিল না বিএনপির। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিলে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক অনেক দল এবং জোটের সঙ্গে দলটির দূরত্ব ও টানাপোড়েন দেখা দেয়। অবশেষে সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর শরিকদের সঙ্গে টানাপোড়েন দূর করতে নিজেই উদ্যোগ নিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তাঁদের মান ভাঙালেন তিনি।

আজ সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। এ সময় তাঁদের সঙ্গে কুশল ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের নেতাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে নির্দিষ্ট স্থানে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি প্রতিটি টেবিল ঘুরে যুগপৎ আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। শরিক নেতাদের নিয়ে নৈশভোজেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে সন্ধ্যায় কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান শুরু হয়। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের আন্দোলনে শরিক ৪১টি দলের নেতাদের এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

বৈঠক সূত্র বলছে, বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ ও সরকারের পাঁচ মাসে নেওয়া নানা পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিগত সময়ের মতো আগামী দিনেও মিত্রদের পাশে চেয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। মিত্র নেতারা সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে আগামী দিনে বিএনপির সরকারকে উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দলের একাধিক নেতা বলেন, সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ইতিবাচক মনোভাবের পর মিত্র নেতাদের জমে থাকা মান-অভিমান দূর হয়েছে। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

যমুনার অনুষ্ঠান শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাইয়ে রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকার উৎখাত করে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা বীর শহীদ, আহত ও দৃষ্টিহারা যোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে যাঁরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সঙ্গে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন করেছেন, তাঁদের ত্যাগ ও অবদানও স্মরণীয়। অনেকেই কারাগারে গেছেন, মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, গুম ও খুনের শিকার হয়েছেন। আজকের এ সাক্ষাৎ এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেছে।’

সরকারের কার্যক্রম প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব জানান, গত পাঁচ মাসে ব্যস্ততার মধ্যেও বেশ কিছু জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদমুক্ত করা, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, ধর্মীয় উপাসনালয়ের গুরুদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা, খেলোয়াড়দের ভাতা, খাল খনন এবং নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।

ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও যৌথভাবে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদের’ প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব বলেন, বর্তমান আইনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ নেই। তাই আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন হয়নি, তবে মিত্র দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং বিএনপি নেতা বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ শীর্ষ নেতারা।

অনুষ্ঠান শেষে বেরিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা একটা শুভেচ্ছা বিনিময়ের অনুষ্ঠান ছিল। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে—প্রধানমন্ত্রী এখন ক্ষমতায় আছেন; যারা ক্ষমতায় নাই, এমন কাছের লোকগুলো...তারা যাতে দূরে সরে না যায়, তাদের কাছে আনার একটা আয়োজন করেছেন।’ অনুষ্ঠানে শরিক দলের কয়েকজন নেতা বক্তব্য দিয়েছেন জানিয়ে মান্না বলেন, তাঁদের মনে যা আছে, তাঁরা তা-ই বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, তাঁরা ক্ষমতার অংশীদার হতে চান।

মান্না আরও বলেন, ‘একটা ভালো কিছুর জন্যই প্রধানমন্ত্রী আমাদের ডেকেছেন। আমরাও চাই ভালো কিছু হোক। আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, রক্ত দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশ আমরা গড়তে চেয়েছিলাম। আপনারা যেমন প্রশংসার ভাগীদার হবেন, তেমনি ভুলের দায়ও আপনাদের নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী পাঁচ মাসের সরকারকে নিয়ে মূল্যায়ন জানতে চেয়েছেন। এই সময়ে কী কী সমস্যা হয়েছে, জানতে চেয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক হবে বলা হয়েছে। আমরা আশা করি, এটা যেন কথার কথা না থাকে।’

এদিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এই নৈশভোজে অংশ নেয়নি। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন জানান, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে তাঁরা যমুনার নৈশভোজে যাননি। একইভাবে দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর নেতৃত্বাধীন অংশটি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত