Ajker Patrika

কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ এনসিপির সাবেক নেতা সালাউদ্দিনের

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ০৬
কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ এনসিপির সাবেক নেতা সালাউদ্দিনের
ডিআরইউয়ে নিজের শারীরিক অবস্থা ও কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যে রাখন এনসিপি সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। ছবি: আজকের পত্রিকা

কারাগারে চিকিৎসার নামে অজ্ঞাত ওষুধ ও ইনজেকশন দেওয়া, স্ট্রোকের পরও চিকিৎসা না করানো এবং কারাগারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর।

গাজী সালাউদ্দিন তানভীর অভিযোগ করেছেন, গত ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগার ও রিমান্ডে থাকাকালে তাঁর ওপর চরম নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের কথা প্রকাশ করলে পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

আজ শুক্রবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে নিজের শারীরিক অবস্থা ও কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এ সব কথা জানান তানভীর।

এনসিপি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত এই নেতা বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ‘কালো ছায়া’ এখনো রয়ে গেছে। তিনি কারাগারে গিয়ে এর প্রমাণ পেয়েছেন। জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও বিষয়গুলো জাতির সামনে তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন।

গাজী সালাউদ্দিন জানান, গত ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলার বাদী বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান। মামলার পর ৫ আগস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর বগুড়া কারাগারে তাঁকে একটি ‘চরম অপরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাসহীন’ সেলে রাখা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ ও কোনো ফ্যান ছিল না।

তাঁর অভিযোগ, কারারক্ষীদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের এবং তাঁদের অধিকাংশের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। তাঁরা তাঁকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে গালিগালাজ করতেন। আশপাশের কয়েদিদের মধ্যেও আওয়ামী লীগের মামলার আসামিরা ছিলেন এবং তাঁরাও তাঁকে বিভিন্নভাবে অপমান করতেন।

গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে কারাগারে অন্যদের ভালো খাবার দেওয়া হলেও তাঁকে দুই দিনের পচা খাবার দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ও তাঁকে পচা-বাসি খাবার দেওয়া হতো। একপর্যায়ে তাঁর ডায়রিয়া হয়। চিকিৎসার জন্য তাঁকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক যে ওষুধ লিখেছিলেন, সেটি তাঁকে দেওয়া হয়নি। বরং প্যাকেট খুলে অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে।

নিজের শরীরে অন্তত ৭০-৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করে গাজী সালাউদ্দিন বলেন, ‘সারাক্ষণ জ্বর থাকত আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত। এসব কীসের ইনজেকশন তা আমি জানি না।’

একদিন হাত-পা কাঁপতে শুরু করলে একজন চিকিৎসক তাঁকে ইনজেকশন দেন। এরপর তাঁর ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায় বলে জানান গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। পরে তাঁকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে স্ট্রোক হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্ট্রোক হয়নি এবং কোনো সমস্যা নেই বলে জানায়।

গাজী সালাউদ্দিনের ভাষ্য, হাসপাতালে তাঁর সিটি স্ক্যান করা হয়। তবে সেই রিপোর্ট তাঁকে জানানো হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানায়, রিপোর্টে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। পরে এমআরআই করানোর কথা বলা হয়। কিন্তু হাসপাতালের এমআরআই মেশিন নষ্ট থাকার পরও তাঁকে মেশিনের ভেতরে ঢোকানো হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি ওটার ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট আওয়াজ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেল। আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্যারালাইজড (অবশ) হয়ে গেল। আমি ১০-১২ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম।’

পরে জ্ঞান ফিরলে গাজী সালাউদ্দিন নিজেকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে দেখতে পান বলে জানান। তখন তাঁর শরীরে প্রস্রাব-পায়খানা লেগে ছিল এবং একজন কোনোভাবে তাঁকে পরিষ্কার করে দেন। এরপর উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, কেরানীগঞ্জে তাঁকে যে সেলে রাখা হয়েছিল, সেটিও ‘খুবই খারাপ’ ছিল। পরে চিকিৎসার জন্য পিজি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে তাঁকে এদিক-সেদিক ঘোরানো হয়েছে।

গাজী সালাউদ্দিনের অভিযোগ, পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) চিকিৎসক দেখিয়ে কারাগারে ফেরার পথে গাড়িতে সাদা পোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি ওঠেন। তাঁদের মধ্যে একজন বসুন্ধরার কথা বলেন এবং তাঁকে নির্যাতন করা হয়। তাঁর দাবি, ওই ব্যক্তিরা বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক আহমেদ আকবর সোবহান ও তাঁর ছেলে আনভীরের নাম উল্লেখ করে তাঁকে বলেন, ‘বসুন্ধরার মালিককে তুইতুকারি করেছিলি, এত বড় সাহস তোর। মাফিয়া গোষ্ঠীটির হাত এতটাই লম্বা যে কারাবন্দী একজনকে এভাবে নির্যাতন করতে পারে।’ এ ঘটনার বিচার হবে কি না, সেই প্রশ্নও তিনি জাতির কাছে রাখেন।

কারাগারে ফেরার পরও তাঁকে সেল থেকে বের করে একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করেন গাজী সালাউদ্দিনের। তিনি বলেন, নির্যাতনের সময় এনসিপির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করে তাঁকে বলা হতো, জুলাইয়ের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে এভাবে নির্যাতন করা হবে।

কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন গাজী সালাউদ্দিন। তাঁর দাবি, তিনি যে কক্ষে ছিলেন সেখান থেকে আওয়ামী লীগের মামলার আসামিদের অবস্থা দেখা যেত। তাঁরা কারাগারে ‘রাজার হালে’ ছিলেন, ফোনে কথা বলতেন, ভালো খাবার খেতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতেন।

গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, ‘রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়—এটা আমি দেখেছি। এই দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।’

নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে গাজী সালাউদ্দিন বলেন, তাঁর ওপর এতটাই নির্যাতন করা হয়েছে যে বর্তমানে তাঁকে প্রস্রাব-পায়খানা ব্যাগ ও প্যাডে করতে হচ্ছে। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও দলটির মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার, মিডিয়া উপকমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাতসহ দলের স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও আইন সেলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত