Ajker Patrika

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দ্বিমুখী পরীক্ষা বিএনপির

রেজা করিম, ঢাকা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দ্বিমুখী পরীক্ষা বিএনপির

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিজেদের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। একদিকে সরকার হিসেবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা, অন্যদিকে দল হিসেবে নির্বাচনে সফল হতে স্থানীয় পর্যায়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিযোগিতা, নেতাদের প্রভাব বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দিতে হবে।

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ফলে ইউপি নির্বাচনেই বড় পরীক্ষায় পড়তে যাচ্ছে বিএনপি। ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক দলের নেতারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত সোমবার ইউপি নির্বাচনের পাঁচ ধাপের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। সে অনুযায়ী, আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে সারা দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউপিতে ভোট হবে।

নির্বাচনে সরকারের অবস্থানের বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকার ও প্রশাসন বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করবে না। সব প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সরকার কোনো কলঙ্ক নিতে রাজি নয়।

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, প্রার্থী জয়ী হওয়ার চেয়ে ভাবমূর্তি তৈরিতে সরকারের কাছে মুখ্য হলো নিরপেক্ষ নির্বাচন। কোনো প্রার্থী বা গোষ্ঠী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করলে তার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তাবে। আবার নির্বাচনে ভালো ফলও প্রয়োজন। এ জন্য প্রার্থী বাছাই গুরুত্বপূর্ণ।

বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চ্যালেঞ্জ হলো, নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করা। এদিকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ—স্থানীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপ এবং প্রভাব বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা।

বিএনপির সূত্র বলছে, আসন্ন ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। প্রার্থী হতে আগ্রহীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁরা জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন কাজ করছেন, জনগণের কাছে যাচ্ছেন। স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থী বাছাইয়ে কেন্দ্রের নির্দেশনা ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির লক্ষ্য, যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিকে সামনে রেখে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং নির্বাচনের আগে থেকেই দলীয় বিভক্তি কমিয়ে আনা। শুরু থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার কথা বলছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকেও ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

বিএনপির সংসদীয় দলের গত রোববার রাতের বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনা হয়। ওই বৈঠকের পর সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি একক প্রার্থী দেবে। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং স্থানীয় নির্বাচনে সঠিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

অবশ্য মাঠের চিত্র ভিন্ন। একেকটি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদের পাশাপাশি সাধারণ সদস্য পদেও বিএনপির একাধিক নেতার প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ রয়েছে। কোনো কোনো ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ১০ থেকে ১২ জন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় আসার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এই অবস্থায় দলের একক প্রার্থী নিশ্চিত করা যে সহজ হবে না, তা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারাও মনে করছেন।

ইউপি নির্বাচনে একক প্রার্থী ঠিক করা একটু কঠিন বলেই জানালেন বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, দলীয় অবস্থানের পাশাপাশি এই নির্বাচনে স্থানীয়, পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান কাজ করে। এরপরও তাঁরা একক প্রার্থী রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য কিংবা প্রভাবশালী নেতারা একক প্রার্থী ঠিক করতে গিয়ে নিজেদের অনুগত ও পছন্দের ব্যক্তিকে বেছে নিতে পারেন। এতে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীদের বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে তা নির্বাচনের আগেই দলীয় বিরোধ বাড়িয়ে দিতে পারে।

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭৮টি আসনে বিএনপির নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁদের অনেকে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের সঙ্গে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বিরোধও বিভিন্ন এলাকায় দলীয় বিভক্তি বাড়িয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সতর্ক রয়েছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান বিভিন্ন বিভাগ ও বড় জেলার নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে একক প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। ত্যাগী, যোগ্য, জনপ্রিয় এবং অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতাদের গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কেউ যাতে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেন, সে বিষয়ে দায়িত্বশীল নেতাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্বও স্তরভিত্তিকভাবে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির সূত্র অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বাছাইয়ে উপজেলা পর্যায়ের নেতারা এবং উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বাছাইয়ে জেলা পর্যায়ের নেতারা দায়িত্ব পালন করবেন। বিভাগীয় সাংগঠনিক নেতারা সমন্বয় করবেন। প্রয়োজন হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হস্তক্ষেপ করবে।

তৃণমূলের নেতারা জানান, দলের চেয়ারম্যান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিয়েছেন। সাংগঠনিক অবস্থান ভালো, গ্রহণযোগ্য এবং বিগত আন্দোলনে সক্রিয় অবদান ছিল—এমন নেতাদের চেয়ারম্যান পদে দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত