Ajker Patrika

শ্রমিক অসন্তোষ

সম্পাদকীয়
শ্রমিক অসন্তোষ

কয়েক দিন ধরেই গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকার মিরপুরসহ কয়েকটি জায়গায় পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা বেতন বাড়ানোর দাবিতে রাজপথ অবরোধ করে আন্দোলন করছেন। দ্রব্যমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। তাই তাঁরা ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা দাবি করছেন। তাঁদের আন্দোলনের কারণে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টিসহ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।

পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা প্রতিবছর কেন আন্দোলন করেন? এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে আছে তাঁদের বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস! শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি এবং তাঁদের জীবনসংগ্রামের প্রতি রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের দীর্ঘদিনের উদাসীনতাই এই সংকটের মূল কারণ। কেন বারবার আন্দোলন করেও তাঁরা ন্যূনতম মজুরির ন্যায়সংগত দাবিটি আদায় করতে পারছেন না? মালিকদের একটি বড় অংশের মধ্যে এখনো শ্রমিকের জীবনযাত্রার মানকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা বিদ্যমান। আবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে মালিকদের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর সব সময়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না।

শ্রমিক আন্দোলন থামাতে ১ নভেম্বর সরকার একটি ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সদ্য ঘোষিত মজুরি বোর্ডের কাঠামোর দিকে তাকালে এই সংকটের আসল রূপটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই এই বোর্ডে সরকারদলীয় শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে, যা শ্রমিক স্বার্থরক্ষার মৌলিক শর্তকে শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত আরও একটি শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। সে সংগঠনটি নামে ট্রেড ইউনিয়ন হলেও তারা বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত বলে অভিযোগ আছে। ফলে সংগঠনটি শ্রমিকের স্বার্থ দেখবে না। যখন অধিকার আদায়ের বোর্ডে শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধি থাকে না, তখন শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষিত থাকবে বলে ধরে নেওয়া যায়।

ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে সাধারণ শ্রমিকদের আস্থাভাজন, প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধি কেন রাখা হলো না? তাহলে শ্রমিকেরা এবারও বঞ্চনার শিকার হবেন?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রমিক বিক্ষোভের জন্য নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এবং কতিপয় শিল্পমালিকের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন। আরেকজনের বিরুদ্ধে দোষ চাপানোর আগে শ্রমিকদের প্রাপ্য দাবি-দাওয়া নিশ্চিত করা গেলে কি তাঁরা বিক্ষোভ করতেন? যত দিন রাষ্ট্রীয় কর্তাদের বোধে এই বিবেচনা আসবে না, তত দিন নিপীড়িত শ্রমিকদের চাওয়াকে এড়িয়ে যাওয়া হবে, কোনো সঠিক সমাধানের পথ পাওয়া যাবে না।

পোশাকশিল্প লাখ লাখ মানুষের রুটি-রুজি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত। এ খাতের শ্রমিকদের বঞ্চিত রেখে পোশাকশিল্পের উন্নতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। খাতটিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার জন্য শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবি অবশ্যই মেনে নিতে হবে। তা না হলে পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ কমবে না।

শ্রমিকের পেটে ক্ষুধা রেখে কিংবা তাঁদের দমন-পীড়ন করে গার্মেন্টসশিল্পের উৎপাদনশীলতা ও বিকাশ কোনোভাবেই সম্ভব না। এই সত্যটি মালিকপক্ষ ও সরকার যত দ্রুত অনুধাবন করতে পারবে, তত তাড়াতাড়ি এ খাতে উন্নয়ন ঘটবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত