একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদানে এবং তাঁর লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটল এই দেশে। হ্যাঁ, সেই দেশের কথাই বলা হচ্ছে, যে দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য এই মুক্তিযোদ্ধা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছে, তাদের দল মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে ঘৃণিত ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে মদদ দিয়ে গেছে এবং এখন পর্যন্ত তাদের সেই ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি।
কথাগুলো বলতে হলো এই কারণে যে এই দেশে দেশপ্রেমকেই যখন সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তখন বুঝতে হয় দেশে সেই ভূতের আসর হয়েছে, যাদের পায়ের পাতা উল্টো দিকে মুখ করে আছে। মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এই আচরণ গোটা জাতির শরীরে চপেটাঘাত করার মতোই ঘটনা। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।
এ ঘটনাটি যে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ইন্ধনে ঘটার অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেই দলটি ১৯৭১ সালে কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তার বর্ণনা পাওয়া যাবে সে সময়ের তাদেরই মুখপত্রের প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়তে। ১৯৭১ সালের সেই পত্রিকাগুলোতেই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের কার্যক্রম স্পষ্টভাবে লেখা আছে। সুতরাং কোনো ভনিতা না করেই বলা যায়, স্বাধীন দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃতদেহের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনাটিকে নির্বিকারভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এর আগেও দেখা গেছে মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়ে, মুক্তিযোদ্ধার কবর ভাঙচুর করে একশ্রেণির উন্মাদ উল্লাস করেছে। সে সময়কার অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতায় এই ধরনের অন্যায় ঘটতে পেরেছে। সরকারের কাছ থেকে তখন এমন কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি, যাতে এই উন্মত্ত স্বাধীনতাবিরোধী মবতন্ত্র দমে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আশকারায় এই নেতিবাচক শক্তি ফুলেফেঁপে উঠেছে। এখনো তাদের দাপট দেখা যাচ্ছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই শক্তি নানাভাবে গোটা মুক্তিযুদ্ধটাকেই অগ্রাহ্য করার ষড়যন্ত্র করেছিল বটে, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে তারা একটু হলেও পিছু হটেছে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার যদি এই শক্তির ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ না করে, তাহলে এই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্যকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধার লাশ নিয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটল, তা একটি জাতির জন্য খুবই লজ্জার। আরও লজ্জার ব্যাপার হলো, এই মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে গার্ড অব অনার দিতে হয়েছে। কেন এই নাজুক অবস্থা, তার জবাব কে দেবে? দাফনে বাধা দিতে পারে যারা, তাদের মানসিকতাকে ফ্যাসিস্ট মানসিকতা বললে কি খুব একটা ভুল হবে?
সরকারকে বুঝতে হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের হয়রানি করা, তাদের অসম্মান করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে পরিহাস করার শামিল। পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে গোটা জাতি যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিল, সে ইতিহাস স্মরণে এনে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকে কটাক্ষ করা হলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সঙ্গে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান, বাংলাদেশের সম্মান ভূলুণ্ঠিত করার যেকোনো অপপ্রয়াসকে সামাজিকভাবে রুখে দিন।






