Ajker Patrika

টিএসসির পরিচালক

সম্পাদকীয়
টিএসসির পরিচালক

বাংলাদেশের কোনো কোনো সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিজেদের জমিদারের নাতি মনে করেন। যদিও অনেক আগেই সেই প্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে। কিন্তু সামন্তপ্রথার রেশ যে এখনো রয়ে গেছে, সেটা বোঝা গেল টিএসসির ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের কার্যক্রমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ফারজানা বাসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের নিজ বাসায় ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন এবং নিজেও অফিস ফাঁকি দেন।

জানা যায়, গত ৩৫ কর্মদিবসের মধ্যে ৩২ দিন তাঁর গড় উপস্থিতি ছিল দৈনিক ৩ ঘণ্টা ৭ মিনিট এবং তিনি কোনো ছুটি ছাড়াই তিন দিন অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন। তার চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, অফিসের বাইরের এক ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে বিনা মূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে নিজ বাসায় কাজ করান। এমন কর্মকাণ্ড শুধু নৈতিক স্খলনই নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহারের নামান্তর।

স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা নতুন নয়। আমলাতান্ত্রিক ও সামন্তবাদী মানসিকতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মনে এই ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দেয় যে অধস্তন কর্মচারীরা তাঁদের ব্যক্তিগত অনুগত ভৃত্য। এ ধরনের ব্যক্তিরা নিজ পদকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তাঁরা এ অপকর্ম করতে পারেন শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশকারা পেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে যদি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপস্থিতির মূল্যায়ন করা না হয়, তাহলে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়। কারণ তিনি ঊর্ধ্বতনের কাছ থেকে ছুটি না নিয়ে তিন দিন অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন। আবার অনিয়ম ধরা পড়ার পরও তদন্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাহলে কি তাঁর সিনিয়র এ দায় এড়াতে পারেন?

স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন করতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। টিএসসির এ ঘটনার দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দোষী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ পদমর্যাদার অপব্যবহারের সাহস করতে না পারে।

ডিজিটাল যুগের এ সময়ে স্বয়ংক্রিয় বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে উপস্থিতি নিশ্চিত করা অসম্ভব ব্যাপার নয়। একই সঙ্গে সার্বক্ষণিক ডিজিটাল নজরদারির ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিম্নপদস্থ কর্মচারী—সবার কর্মঘণ্টা স্বচ্ছতার সঙ্গে নথিভুক্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে অন্যান্য সভার সময়সূচি সমন্বয় করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, যেন সভার অজুহাতে কেউ নিজ দপ্তরের দায়িত্ব অবহেলা করতে না পারেন।

সর্বোপরি নিম্নপদের কর্মচারীদের কাজের পরিধি নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। কারণ কোনো কর্মকর্তা যেন কোনো অধস্তন কর্মচারীকে প্রাতিষ্ঠানিক কাজের বাইরে ব্যক্তিগত কাজ করাতে বাধ্য করতে না পারেন। পাশাপাশি গোপন অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তার চেয়েও জরুরি, ব্যক্তির নৈতিক বোধের জাগরণ। বড় কর্মকর্তা মানে নিম্নপদের সহকর্মীকে ব্যবহার করা নয়, বরং নিজের দায়িত্ব পালনে আরও বেশি দায়বদ্ধ থাকা। এ ধরনের অপকর্ম প্রতিরোধের জন্য জরুরি হলো, সর্বস্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত