Ajker Patrika

স্বাধীনতাসংগ্রামের একজন কিংবদন্তি

মাসুদ উর রহমান, কলেজশিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী
আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০৮: ০০
স্বাধীনতাসংগ্রামের একজন কিংবদন্তি
তোফায়েল আহমেদ (জন্ম ২২ অক্টোবর ১৯৪৩, মৃত্যু ১ জুন ২০২৬)। ছবি: সংগৃহীত

মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু ইতিহাসের কিছু মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হন। তাঁদের জীবন ব্যক্তিগত অর্জনের সীমা ছাড়িয়ে একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের প্রতীকে রূপ নেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ তেমনই এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর প্রয়াণে আমরা শুধু একজন রাজনীতিককে হারাইনি; হারিয়েছি স্বাধীনতা-অভিযাত্রার এক জীবন্ত সাক্ষীকে, হারিয়েছি একটি সংগ্রামী প্রজন্মের অন্যতম প্রতিনিধিকে।

তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর, ভোলা জেলার কোড়ালিয়া গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন এবং অল্প সময়ের মধ্যে ছাত্রসমাজের আস্থার প্রতীকে পরিণত হন। ১৯৬৮-৬৯ সালে ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি হিসেবে তিনি যে নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অগ্রভাগে নিয়ে আসে।

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করলেই তাঁর নাম সামনে আসে অবধারিতভাবে। পাকিস্তানি শাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যখন বাঙালি জাতি উত্তাল, তখন মাত্র ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ নেতা ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এক মহান লক্ষ্য সামনে রেখে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই ঘোষণা শুধু একজন নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ছিল না; বরং বাঙালির জাতীয় চেতনার এক ঐতিহাসিক অভিষেক বলতে হবে।

তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের নেতা, যাঁরা স্বাধীনতাকে হঠাৎ উদ্ভূত কোনো ঘটনা হিসেবে দেখেননি। স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি, সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয় এবং রাজনৈতিক চেতনা নির্মাণের যে প্রক্রিয়া ষাটের দশকজুড়ে চলেছিল, তার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও শেখ ফজলুল হক মনির সঙ্গে তিনি যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন, তা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা, রাজনৈতিক কর্মীদের প্রস্তুত করা এবং স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তিনি শুধু একজন বক্তা বা রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; ছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক নিবেদিত কর্মী।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গণপরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কাজে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির জন্য নতুন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব সেই সময়ের নেতাদের কাঁধে ন্যস্ত হয়েছিল, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তার একজন গর্বিত অংশীদার।

তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হওয়ার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর আদর্শ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকে সারা জীবন ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টে গেলেও তোফায়েল আহমেদ তাঁর বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। কারাবাস, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি। দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েও তিনি সংগ্রামের পথ থেকে বিচ্যুত হননি।

তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ছিল সৌজন্য ও মানবিকতাবোধ। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সম্মান করার যে সংস্কৃতি একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তার অন্যতম ধারক। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রতিপক্ষ নেতাদের প্রতি ব্যক্তিগত সম্মান ও সৌহার্দ্য প্রদর্শন করতেন। আজকের বিভাজিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই গুণ তাঁকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণের পর তাঁকে ঘিরে নানা স্মৃতি, নানা গল্প এবং ইতিহাসের বহু অনুচ্চারিত অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় আসছে। কারণ, তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয় না; দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং আদর্শিক দৃঢ়তার মাধ্যমে একটি জাতির মুক্তি অর্জিত হয়।

তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস রক্ষার প্রতি অঙ্গীকার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা দেখা গেলেও তিনি সব সময় দলিল, তথ্য ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে সত্য ইতিহাস তুলে ধরার পক্ষে ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ইতিহাসকে সাময়িকভাবে আড়াল করা গেলেও চিরতরে মুছে ফেলা যায় না।

যে কথাটি না বললেই নয় যে শেখ হাসিনা তোফায়েল আহমেদসহ আওয়ামী লীগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র নেতাকে কর্নার করে রেখেছিলেন। তাঁদেরকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয়নি। তোফায়েল আহমেদকে দলের উপদেষ্টা করার মাধ্যমে তাঁকে আসলে কোণঠাসা করে রাখার একধরনের ষড়যন্ত্রই বলতে হয়। কারণ, উপদেষ্টা আদতে সম্মানীয় পদ হলেও সংগঠনের মধ্যে সেই পদের কোনো কার্যকারিতা ছিল না।

আজ তোফায়েল আহমেদ আমাদের মাঝে নেই। তাঁর প্রস্থান শুধু একটি রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়; বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের এক জীবন্ত অধ্যায়ের অবসান। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।

একটি জাতি তার বীরদের স্মরণ করে নিজেদের অস্তিত্বকে সমৃদ্ধ করে। যে মানুষটি যৌবনের শক্তি, সাহস এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁকে স্মরণ করা মানে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে স্মরণ করা। তোফায়েল আহমেদের সংগ্রামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত