
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের ঘোষণা দেখে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছি। দেশের ও বিশ্বের জলবায়ু সংকটের কালে এ ধরনের একটি মহতী উদ্যোগ দেশবাসীর জন্য স্বস্তিদায়ক। বিএনপির সেই ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সবুজ বেষ্টনী তৈরি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে অর্থাৎ ২০৩১ সালের মধ্যে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণের এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’ কর্মসূচির আওতায় এ উদ্যোগের মাধ্যমে সড়ক, উপকূলীয় চর, বনভূমি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণের খালি জায়গায় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হবে। গড়ে প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগানো হবে। এ বছরের বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু হবে জুন থেকে। প্রত্যাশা রয়েছে, রোপিত গাছের অন্তত ৮০ শতাংশ গাছ বেঁচে থাকবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে আসছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প। ধারাবাহিকভাবে কমছে দেশের সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা। তাই এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
সেই সঙ্গে মনে প্রশ্নও জাগে, এই মহতী উদ্যোগও কি আগের মতো ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাবে? যদি স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে যেসব বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে সে পরিসংখ্যান দেখি, তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে তার কত শতাংশ গাছ টিকে আছে। টিকে যে নেই তার বড় প্রমাণ হলো, দেশে বনভূমি বাড়েনি, গ্রামীণ বনও কমছে, রাস্তার ধারে কিছু গাছপালা লাগানো হয়েছে, তবে তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এমনকি সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় লাগানো গাছগুলোর অনেক গাছই স্থানীয় অংশগ্রহণকারী উপকারভোগীদের উপযুক্ত পরিচর্যা ও সুরক্ষা না পেয়ে মরে গেছে অথবা লোভের কারণে ধ্বংস হয়েছে। বনভূমি দখল, বনের গাছ কাটা, নগর সম্প্রসারণ, ব্যাপক হারে বসতবাড়ি ও কলকারখানা এবং রাস্তাঘাট নির্মাণ, নদীভাঙন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে প্রতিবছর দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে গাছ উজাড় হচ্ছে।
একদিকে রোপিত গাছ টিকে না থাকা, অন্যদিকে বড় হয়ে ওঠা গাছগুলো কেটে ফেলা—এ দুটি প্রধান বাস্তবতায় দিন দিন দেশের সবুজ কমছে। ২০১৫ সালে জাতীয় বন জরিপে সে তথ্য উঠে এসেছে। সে সময় দেশে বন আচ্ছাদিত জমির পরিমাণ ছিল যেখানে ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে তা কমে হয়েছে ১২ দশমিক ১১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বনভূমি কমেছে দেশের পার্বত্যাঞ্চলে। রাঙামাটিতেই কমেছে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর বনভূমি। শুধু বনভূমির হিসাব কষলেই হবে না, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের গাছপালার বর্তমান অবস্থাও জানতে হবে। এরপর ঠিক করতে হবে সেসব জায়গার কোথায় কোন গাছ, কতটা গাছ লাগাতে হবে। এ জন্য সার্বিক অবস্থা, সুযোগ ও সক্ষমতা বিবেচনা করে পরিকল্পনা করতে হবে। বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভালো হবে। পদক্ষেপগুলোকে সাজাতে হবে পাঁচটি প্রধান কার্যক্রমে—বাস্তব সমীক্ষা, পরিকল্পনা গ্রহণ, সক্ষমতা উন্নয়ন, কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং বা পরিবীক্ষণ। এ জন্য নিচের কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।
১. দেশের কোন অঞ্চলের কোথায় বর্তমানে কতটুকু বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা এবং কী কী গাছপালা রয়েছে, তার একটি সমীক্ষা দরকার। বৃক্ষরোপণের আগে সেসব অঞ্চলের ভৌগোলিক ও মৃত্তিকা বৈচিত্র্য, পরিবেশগত চাহিদা ইত্যাদি বিষয় মাথায় রেখে সমীক্ষায় দেখা উচিত যে কোন কোন গাছ সে স্থানের জন্য বেশি উপযুক্ত। স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য যেসব গাছ ভালো, সেগুলোকে তালিকায় রাখতে হবে। বৃক্ষরোপণে সংখ্যার চেয়ে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো এলাকায় গাছ লাগানোর আগে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি কার্যকর সমীক্ষার কাজ মাঠে নামার আগে করতে হবে। স্পষ্টভাবে বৃক্ষরোপণের জন্য এলাকা বা অঞ্চলভিত্তিক ম্যাপিং করতে হবে। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় গাছ লাগানোর আগে চিহ্নিত করতে হবে বসতবাড়ি, রাস্তা, রেলপথের ধার, চর, বনভূমি, শিক্ষা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আঙিনা, উপকূল, নদী ও খালের তীরবর্তী ভূমি, খাস পতিত জমি, পাহাড়, পার্ক ইত্যাদি।
২. কোন বছরে কোথায় কতগুলো গাছ লাগাতে হবে, তার পরিষ্কার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। যেমন, পাঁচ বছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশ লাগাতে হবে প্রথম বছরে (২ দশমিক ৫ কোটি), দ্বিতীয় বছরে ২০ শতাংশ (৫ কোটি), তৃতীয় বছরে ৪০ শতাংশ (১০ কোটি), চতুর্থ বছরে ২০ শতাংশ (৫ কোটি) এবং পঞ্চম বছরে ১০ শতাংশ (২ দশমিক ৫ শতাংশ) গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া যায়।
৩. বৃক্ষরোপণে দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগাতে উৎসাহিত ও বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানোকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
৪. এ দেশে চার শতাধিক প্রজাতির বিপন্ন ও দুর্লভ উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। বৃক্ষরোপণে এসব প্রজাতি রোপণে গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো লাগিয়ে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি একটি করে বোটানিক্যাল গার্ডেন তৈরি করা যায় ও সেসব গার্ডেনে যদি সে অঞ্চলের উপযোগী বিপন্ন উদ্ভিদগুলো লাগানোর ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে বিপন্নতার হাত থেকে গাছগুলো রেহাই পাবে। ইতিমধ্যে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং আইইউসিএন বাংলাদেশ ১ হাজার প্রজাতির গাছের একটি রেড ডেটা বই প্রকাশ করেছে। এ বইয়ে ৩৭৫ প্রজাতির গাছকে বিপন্ন উদ্ভিদ হিসেবে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে, ৫৪ প্রজাতির আছে সংরক্ষিত উদ্ভিদ। এ ব্যাপারে সেটির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তাহলে অন্তত এসব প্রজাতির গাছ রক্ষা পাবে।
৫. জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানসহ দেশের ৫৪টি সংরক্ষিত বনে কয়েক লাখ গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এসব স্থানে গাছ লাগানোর বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। সেভাবে বিভিন্ন পার্কেও সুযোগ অনুযায়ী খালি জায়গায় গাছ লাগানো যায়।
৬. বৃক্ষরোপণের একটি বড় সুযোগ বা স্থান হলো উপকূলীয় অঞ্চল। টেকনাফ থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত ১৯টা জেলায় উপকূলের একটি নির্দিষ্ট বেল্ট ধরে ব্যাপকভাবে গাছ লাগিয়ে গ্রিন বেল্ট বা সবুজ বেষ্টনী করতে হবে। এটিই হবে এ দেশের জন্য জলবায়ুর অভিঘাত থেকে রক্ষার উত্তম ব্যবস্থা। সরকার পরিকল্পনায় অবক্ষয়িত উপকূলীয় বন (যেমন চকরিয়া সুন্দরবন) ও উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার জন্য ১০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও সম্পৃক্ত করে এর পরিমাণ বাড়াতে হবে।
৭. বৃক্ষরোপণের আরেকটি বড় সুযোগ রয়েছে পাহাড়ি ভূমি। পাহাড়ের বন উজাড়ের ফলে নদী, ঝিরি ও খালের উৎসমুখে নাব্যতা কমে গেছে। বন উজাড়ে বেড়ে গেছে ভূমিধসের পরিমাণ। সে কারণ সরকার পাহাড়ে পাঁচ বছরে মোট ৫ কোটি চারা রোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রে সেগুন, আকাশমণি, মেহগনি ইত্যাদি গাছ না লাগিয়ে লাগানো উচিত গর্জন, তেলি গর্জন, বৈলাম, সিভিট, আম, কাঁঠাল, জাম, চম্পা, নিম, বট ইত্যাদি গাছ।
৮. স্থান নির্বাচন ও গাছের প্রজাতি তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে গাছ লাগানোর আগেই। সে অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে সেসব গাছের মানসম্মত চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার দেশের প্রায় ১০ হাজার নার্সারিতে ২৫ কোটি চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সেসব নার্সারির সক্ষমতা কী, কারা চারা উৎপাদন করবেন, বীজের উৎস কী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। শুধু বন বিভাগ না, অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি নার্সারিতেও চারা উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। সব সুযোগ কাজে লাগাতে হবে; লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ চারা বেশি উৎপাদন করতে হবে।
৯. বনকর্মী, নার্সারি কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, রোপণকারী ও বৃক্ষ পালনকারীদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তাঁরা হাতেকলমে কাজগুলো ভালোভাবে করতে পারেন। তাঁদের একটু ভুল বা অজ্ঞতার কারণেই ভালো চারা পাওয়া যাবে না ও রোপিত চারাগুলো বাঁচবে না।
১০. শুধু চারা লাগালেই হবে না, সেগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। সেটি ঠিকভাবে করা হচ্ছে কি না বা রোপিত চারার অবস্থা কেমন আছে তা নিশ্চিত করতে আধুনিক ডিজিটালাইজড মনিটরিং সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক জরিপ পুরোনো সত্য নতুন সংখ্যায় প্রমাণ করেছে। দেশে মোট খাদ্য উৎপাদকদের ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক। অথচ তাঁদের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। বড় কৃষকের আয় প্রায় চার গুণ বেশি—১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। শ্রম-দিন হিসাবে দেখলেও একই চিত্র মেলে। ক্ষুদ্র কৃষ
১৫ ঘণ্টা আগে
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিল্পবিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। প্রথাগত ডেটা প্রসেসিং কিংবা চ্যাটবটের সীমানা ছাড়িয়ে প্রযুক্তিবিশ্ব বর্তমানে প্রবেশ করেছে স্বায়ত্তশাসিত (অটোনোমাস) এআই এজেন্টের যুগে, যা প্রত্যক্ষ মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধানে সক্ষম
১৫ ঘণ্টা আগে
এত মানুষ হঠাৎ রোমিও হয়ে যাচ্ছে কেন, তা নিয়ে জরিপ হওয়া উচিত। আশঙ্কার বিষয় হলো, ওই সব রোমিওর জীবনে জুলিয়েট নেই। তারা নিজেদের প্রেমিক পরিচয়ে তৃপ্ত হয়ে কোনো মেয়েকে প্রস্তাব দিয়ে বসে। তার কাছ থেকে নেতিবাচক উত্তর পেলে, তাদের ভালোবাসা যেন উথলে ওঠে। সেই ভালোবাসা প্রকাশ করার জায়গা যখন খুঁজে না পায়, তখন বন্ধু
১৫ ঘণ্টা আগে
জাতীয় দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া সমন্বয় কেন্দ্র (এনডিআরসিসি) দেশের ১০টি জেলায় বন্যার পূর্বাভাস দিয়ে ৭ আগস্ট একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। জেলাগুলো হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল...
২ দিন আগে