Ajker Patrika

৫ টাকার অফিসার ও ভোট গ্রহণে টিমওয়ার্ক

বিমল সরকার
৫ টাকার অফিসার ও ভোট গ্রহণে টিমওয়ার্ক
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মাঠপর্যায়ে টিমওয়ার্ক থাকাটা অপরিহার্য। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। ১৯৮৫ সালের ২০ মে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাই। এবারই আমার জীবনে প্রথম ভোট গ্রহণ। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সরারচর বাজারের অদূরে ভান্ডা মজলিসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আমার নির্ধারিত কেন্দ্র। ভোট গ্রহণের কাজে নিয়োজিত আমরা মোট ১০ জন। আমার সঙ্গে ছিলেন তিনজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও ছয়জন পোলিং অফিসার।

সহকর্মীদের মাঝে বলতে গেলে সবাই বয়সে আমার বড়। ইতিমধ্যে ৪০ বছর গত হয়ে গেছে। এত দিনে নিশ্চয়ই তাঁদের কেউ-ই আর চাকরিতে নেই; কে কোথায় আছেন, তা-ও আমার জানা নেই (যাঁরা বেঁচে নেই করুণাময় তাঁদের শান্তিতে রাখুন)।

দীর্ঘ চার দশক আগের বেশ কিছু ঘটনা আমার স্মৃতিপটে আজ হঠাৎ কেন ভেসে উঠল? পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে ওই নির্বাচনে সম্মানী বণ্টনের একটি তালিকা আমার নজরে পড়ে। নাম ও ঠিকানাসহ ১০ জন কর্মীর তালিকাটি আমার নিজ হাতে তৈরি করা। তালিকায় সম্মানী হিসেবে নেওয়া টাকার পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে, প্রিসাইডিং অফিসার ৫০ টাকা আর সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার প্রত্যেকে ৪৫ টাকা করে পান। মোট ১০ জন কর্মীর মধ্যে আমার টাকার পরিমাণটি ৫ টাকা বেশি। অন্য কিছু নয়, বোধ করি বাড়তি সম্মান হিসেবেই প্রিসাইডিং অফিসারের নামমাত্র এই ৫টি টাকা বাড়তি রাখা হয়েছিল। ৫০ টাকারও তখন বেশ দাম। প্রথম শ্রেণির একজন গেজেটেড অফিসারের ৭৫০ টাকা বেতন স্কেলে চাকরিতে যোগদান এবং তাঁর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট ছিল ৫০ টাকা। আর ৩০০ টাকা বেতন স্কেলে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা সরকারি ব্যাংকের একজন কেরানির বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ছিল ১২ টাকা। তা ছাড়া ৫০ টাকায় ওই সময় বাজার থেকে একটি বড় ইলিশ মাছ কেনা গেছে। আরও একটি বিষয়: অন্য সবার চেয়ে প্রিসাইডিং অফিসার ৫ টাকা বেশি পেলেও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারের সম্মানীর টাকার অঙ্কের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই—প্রত্যেকেই পেয়েছেন ৪৫ টাকা করে।

উপজেলা, মানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। স্নায়ুর চাপ তো ছিলই—কীভাবে নির্বাচনটি ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন করা যায়। আগেই বলেছি, কোনো নির্বাচনে ভোট গ্রহণের ব্যাপারে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু আমার সহকর্মীরা এ কাজে আমাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। সরকারি দল হিসেবে জাতীয় পার্টির তখনো আত্মপ্রকাশ ঘটেনি। জাতীয় সংসদ তো ছিলই না, তা ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই দেশের বড় বিরোধী দল; মাঠে বলতে গেলে উভয়ই সমানে সমান। তা ছাড়া ওই এলাকায় বাংলাদেশ লেখক শিবির ছিল বেশ তৎপর। আমার কাছে মনে হয়েছিল নির্বাচনী মাঠে ‘শক্তির ভারসাম্য’ অনেকটাই বিরাজমান। এসবের ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো গোলযোগের তেমন আশঙ্কা ছিল না, হয়ওনি।

আমার জন্য বড় ধরনের স্বস্তির কারণ ছিল ভোট গ্রহণের কাজে নিয়োজিত সহকর্মীদের ঐকান্তিক সহযোগিতার বিষয়টি। একদম শুরু থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত তাঁরা যেভাবে আমার পাশে থেকেছিলেন, মূলত তা ব্যক্ত করতেই এ লেখাটির প্রয়াস। তখন বেলা সাড়ে ৩টা, একপর্যায়ে বেশ হইচই এবং গোলযোগ সৃষ্টির উপক্রম হয়। নিরাপত্তা বাহিনী যেমনই হোক, সহকর্মীদের মধ্যে দুজন শিক্ষক দ্রুতবেগে আমার টেবিলের কাছে এসে আমাকে ঘিরে রাখেন; অন্য তিন-চারজন পুলিশের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন।

ভোট গণনার সময় বাইরে অপেক্ষমাণ কারোরই ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নেই। মুহূর্ত ও পরিবেশটি খুব স্পর্শকাতর হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে দেখেছি, গণনা শেষ হওয়ার আগেই নিজেদের মাঝ থেকে কেউ চুপি চুপি ভেতরের তথ্যাদি বাইরে প্রকাশ করে দিয়েছেন। এতে চরম উত্তেজনার মুহূর্তে অনেক নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেখেছি। দেখেছি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণকারী কর্মীদের কেউ কেউ কাজের ফাঁকে নিয়মভঙ্গকারী বা নির্লজ্জ পোলিং এজেন্টদের মতো কীভাবে প্রার্থীর অনুকূলে প্রচারণা চালিয়ে বিপত্তি সৃষ্টি করেছেন। হাতে হাতে মোবাইল ফোন এসে যাওয়ায় বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজটি আরও সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু না, আমার সেদিনের সহকর্মীরা নিরপেক্ষতা বজায় রেখে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে জটিল পরিস্থিতিতেও আমাকে চাপ ও ভারমুক্ত রাখতে চেষ্টা করেছেন।

ভোট গণনা, ফলাফল তৈরি ও প্রকাশ করতে রাত ৯টা বেজে যায়। নির্বাচন মানেই তো আবেগ, উত্তেজনা; ঝুঁকি তো বটেই। সহকর্মীদের অধিকাংশের বাড়ি উপজেলা সদর থেকে বেশ দূরের বিভিন্ন গ্রামে। সম্মানীর টাকাটা বণ্টন করলাম। দুজন আমাকে না জানিয়েই চলে গেলেন (মনে হলো আরও আগেই যেতেন, কেবল টাকাটা হাতে পাবার অপেক্ষায় ছিলেন)। বাকি কেউ কেউ হয়তো যাওয়ার ফাঁক খুঁজছেন। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে নানা কিছু বলতে বলতে কয়েকজন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘স্যারকে এখানে এভাবে রেখে আমরা যেতে পারি না।’ বাড়ি বেশ দূরে, কাঁচা রাস্তা এবং উল্টোপথে হলেও আমার স্বস্তি কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে তাঁরা উপজেলা কার্যালয় পর্যন্ত আমার সঙ্গী হলেন। সেখানে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে বেশ নিরাপদে আমি ঘরে ফিরি।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। নির্বাচন কিংবা ভোট গ্রহণ ব্যবস্থার আগের ভাবমূর্তিটি আর নেই। শিক্ষকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিরাই ভোট গ্রহণের সময় মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। নিচে ৫-৬ হাজার আর ওপরে ৮-১০ হাজার টাকা করে প্রত্যেকের সম্মানী (টাকার ব্যবধানটি লক্ষণীয়)। অত্যন্ত লজ্জার বিষয়, সম্মানী ছাড়াও বিগত দিনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকেই জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাদের কাছ থেকে ‘বাড়তি পুরস্কার’ হিসেবে মোবাইল ফোনসেট কিংবা হলুদ খাম গ্রহণ করেছেন। গ্রহণ করেছেন তো করেছেন, মূল্যবোধের মাত্রাটি কোন স্তরে নেমেছে যে এসব নিয়ে তাঁরা গলা বাড়িয়ে আলোচনা করতেও কোনো রকম সংকোচ কিংবা দ্বিধা বোধ করেন না! এত সম্মানী ও ‘পুরস্কার’ পাবার পরও আজকাল টিমওয়ার্কের বড় অভাব অনুভূত হয়।

কর্তৃপক্ষের সুমতি থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মাঠপর্যায়ে টিমওয়ার্ক থাকাটা অপরিহার্য মনে করি। সব অতীত মনে রাখতে নেই, তবে আমার জীবনে তা সোনালি অতীত। টাকার অঙ্ক বিবেচনায় বলতে গেলে কোনো ব্যবধান ছিল না; নির্বাচনী কাজে তাঁদের কাছে আমি হয়তো ‘৫ টাকার অফিসার’। কিন্তু টিমওয়ার্কে আমি সন্তুষ্ট। আপাতত অন্য সবকিছুকে ফেলে রেখে যে নিষ্ঠা ও কর্মতৎপরতা সেদিন তাঁরা দেখিয়েছেন, তা আমার মনে আজও গেঁথে রয়েছে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত