Ajker Patrika

ভাষা, ব্যাকরণ ও ছাগল

গরু থেকে আমরা শুধু হাম্বা-হাম্বাজাতীয় গান ছাড়া আর কিছু পাই না। যদিও রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন, আজকাল ফিগার-সচেতন মায়েরা ফর্মুলা মিল্ককেই বেশি গুরুত্ব দেন। মাতৃদুগ্ধ না পেলে শিশুর মাতৃভাষাও ঠিকমতো শেখা হয় না। যাঁরা ফর্মুলা মিল্ক জোগাড় করতে পারেন না, তাঁরা গরুর দুধ খাওয়ান, ফলে শিশুটি বড় হয়ে গরুতে পরিণত হয়। হয় ষাঁড় হয়ে অন্য গরুর পেছনে ছোটে, নয়তো গরু হয়ে ষাঁড়ের হাতে নির্যাতিত হয়। গরুর দুধের চেয়ে ছাগলের দুধ বেশি উপকারী, এটা মহাত্মা গান্ধীও বলেছেন।

চিররঞ্জন সরকার
ভাষা, ব্যাকরণ ও ছাগল
প্রতীকী ছবি

ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস—আবেগ, আত্মত্যাগ আর গৌরবের মাস। এই মাস এলেই আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ভাষাশহীদদের, যাঁদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি মাতৃভাষার অধিকার। প্রতিবছর মাসজুড়ে অমর একুশে বইমেলার আয়োজন সেই স্মৃতিকে আরও জীবন্ত করে তোলে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করায় বইমেলার আয়োজন পিছিয়ে গেছে। নির্বাচনী ব্যস্ততা এবং কোলাহলের ভিড়ে সংবাদমাধ্যমের পাতায়ও ভাষার মাস ঘিরে তেমন কোনো আয়োজন চোখে পড়ে না। তবু বুকের রক্ত দিয়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা কি সম্ভব? কখনোই নয়।

কবি বলেছেন, ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’। যদিও বাংলা ভাষা আজ চরম অবজ্ঞা আর অবহেলার শিকার। যাদের টাকাপয়সা আছে, তাদের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করে। তাদের বাংলাটা ঠিক আসে না। আজকের যুগে সম্পন্ন বাঙালিরা মাতৃভাষা ভুলতে বসেছে, কিন্তু বিদেশি ভাষাও ঠিকমতো শেখা হচ্ছে না। পথেঘাটে এখন প্রতিবাদের ছড়াছড়ি। অথচ শব্দটাই অনেকে ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। বেশির ভাগ মানুষ প্রতিবাদ শব্দকে ‘পতিবাদ’ বলে। মার্ক্সবাদ, জায়নবাদ, পালনবাদ, বহুবাদের কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু ‘পতিবাদ’ আমাদের কাছে নতুন।

তবে এ কথাও ঠিক, বাংলায় অনেক বড় বড় প্যাঁচ আছে। উচ্চারণে আছে, বানানে আছে। তবে সবচেয়ে বড় প্যাঁচ হচ্ছে ব্যাকরণ। আমরা অবশ্য বড়জোর ছাগলের মতো ব্যা ব্যা করি; কিন্তু ব্যাকরণ পর্যন্ত যেতে পারি কয়জন?

যাহোক, কবি বলেছেন, ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর’। এখানে ‘ধরম’ মানে ধর্ম, আর ‘করম’ মানে কর্ম। বাংলা ব্যাকরণের বইয়েও এটা লেখা আছে। কিন্তু ‘চরম’ মানে ‘চর্ম’ নয়। চর্ম মানে চামড়া। কিন্তু ‘দামড়া’ ছেলেটিকে ‘দর্ম’ বলে ডাকা যায় না। দেশে কর্মসংস্থান কম, সবাই চাকরি নিয়ে মারামারি করছে, কিন্তু ‘কর্ম’ আর ‘কামড়া’

এক জিনিস নয়। চর্মকে অনেকে ‘চাম’ বলে, যেমন ঘামকে ‘ঘর্ম’ বলে। কিন্তু আমকে ‘অর্ম’ বললে লোকে রেগে যাবে। আম মানে আম্র। তাহলে কি তামরস মানে তামার রস? না, তাম্র মানে হলো তামা। তাই মামাকে ‘মাম্র’ বা জামাকে ‘জাম্র’ বললে লোকে বলবে, তোমার তাল নেই। সংস্কৃতে ‘তমালতালিবনরাজিনীলা’র ‘তালি’ বাংলায় ‘তাল’ হয়ে গেছে। আজকাল লোকে ‘জালি’ করছে, যেমন জাল, গালি দিলে যেমন গাল দেওয়া হয়। কিন্তু মুখের গাল যদি গণ্ড হয়, তাহলে গৃহিণী চণ্ডমূর্তি ধারণ করলে তাকে ‘চাল’ বলা যায় না। ভণ্ডকে ‘ভাল্’ বললেও ঠিক হবে না। ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে!

ছোটবেলায় বাংলা শেখার সময় পরীক্ষায় একই উচ্চারণের দুটি শব্দের অর্থের পার্থক্য বোঝানো হতো। একবার পরীক্ষায় ‘আপন’ আর ‘আপণ’ শব্দের পার্থক্য বোঝাতে বলা হলো। আমার এক বন্ধু আমাকে ইশারা করছিল উত্তরটা বলার জন্য। আমি ভাবলাম, ‘আপন’ শব্দের অর্থ সে জানে, তাই ‘আপণ’ শব্দের অর্থ দোকান, সেটা নিচু স্বরে বললাম। কিন্তু সে বুঝল না। এবার বাধ্য হয়ে দুটি আঙুল ও কান দেখিয়ে ফিসফিস করে বললাম—দো কান। কিন্তু সে কী বুঝল, খাতায় লিখল, ‘আপণ মানে দুই কান’!

যা কিছু লেখা হয়, সেগুলো সব সময় ‘মিন’ না করার তালিকায় বাংলা আপ্তবাক্যের সংখ্যা কম নয়। এ নিয়ে অনেক গল্প আছে। নিজের একটি অভিজ্ঞতা আর একটি শোনা গল্প বলছি। আমার সেই বন্ধু, যে বলার পরও ‘আপণ’ শব্দের অর্থ বুঝতে পারেনি, সে পরে কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিল। নবম শ্রেণির পরীক্ষায় প্রশ্ন ছিল ‘খয়ের খাঁ’ শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি করতে। সে লিখেছিল, ‘পান খেয়ে তোর মুখটা ঠিকমতো লাল হয়নি, তুই আর একটু খয়ের খাঁ’!

আরেকটি গল্প শুনেছিলাম ‘সাবধানের মার নেই’ এই আপ্তবাক্য নিয়ে। এক ছাত্র লিখেছিল, ‘সাবধানের বাবার মুখভর্তি গোঁফদাড়ি, কিন্তু সাবধানের মার নেই’!

ছাত্রছাত্রীরা ভবিষ্যতের নাগরিক। তাদের ভুল নিয়ে হাসাহাসি করা ঠিক না। হাসতে হলে তাদের শিক্ষকদের কাজকর্ম নিয়ে হাসাই ভালো। তাদের কাজ দেখলে প্রথমেই মনে পড়ে, ‘পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়’।

দুর্ভাগ্যক্রমে, বাঙালিরা এটাকেও সত্য বলে মেনে নিয়েছে। পাগল অনেক কথা বলে, কিন্তু আমি এখনো কোনো পাগলের মুখে মেঘনাদবধ কাব্য, নাইজেরিয়ার পর্যটন ব্যবস্থা, মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ, ডারউইনের তত্ত্ব, গ্লোবাল ওয়ার্মিং থিওরি—এসব কিছু শুনিনি। মনে হয়, এসব বিষয় পাগলামির মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। হয়তো তাই স্কুলে এসব বিষয় পড়ানো হয়, যাতে ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হোক বা না হোক, অন্তত পাগল না হয়।

পাগলের পাগলামি থেকে ছাগলের ছাগলামির দিকে নজর দেওয়া যাক। ছাগল সর্বভুক বা ছাগলে কী না খায়—বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় প্রবাদ। যদিও এটা পুরোপুরি মিথ্যা। ছাগল তৃণভোজী, সে মাংস, মাছ, ডিম—এসব খায় না। তবে বিপাকে পড়ে প্লাস্টিকের প্যাকেট, শাড়ির আঁচল, শিশুর ডায়াপার—এসব গিলে ফেলে। কিন্তু সাধারণভাবে ছাগল তৃণ আর পাতাই বেশি পছন্দ করে। ছাগল মানুষের মতো খুঁতখুঁতে নয়। যারা কাঁঠাল খায়, তারা হয় খাজা নতুবা রসাল কাঁঠাল পছন্দ করে। কিন্তু ছাগল কাঁঠালের পাতা পেলেই খায়, সেটা খাজা না রসাল, তা দেখে না।

ছাগলকে গালি দেওয়া অন্যায়। হিন্দুরা গরুকে পূজা করে কিন্তু ছাগলকে গালি দেয়। অথচ ছাগল গরুর চেয়ে বেশি সংস্কৃত প্রাণী। ছাগল যা-ই খাক, তার পেছন দিকে বের হয় একই মাপের ট্যাবলেট। গরু কখনোই এমন গোবর ক্যাপসুল বানাতে পারে না। পারলে বাড়ির বড় বউ আর মেজ বউ মিলে ঘরের দেয়ালে গোবর লেপার দরকার পড়ত না।

ছাগলকে অবজ্ঞা করার শুরুটা হয় বাংলা শেখার প্রথম থেকে। প্রথম পাতাতেই শিশুদের শেখানো হয়, ‘অ-এ অজগরটি আসছে তেড়ে’। কিন্তু কয়জন শিশু অজগর দেখার সুযোগ পায়? যাদের অজগর সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই, তাদের এই রকম কুশিক্ষা দেওয়ার ফলেই ভবিষ্যতে তারা রাজনৈতিক নেতা হয়ে অজগরের মতো আচরণ করে। অজগরের অর্ধেক হলো অজ, মানে ছাগল, যা অনেক শিশুর কাছে পরিচিত। অজগরের চেয়ে অজ বলা সহজ। অজকে উপেক্ষা করে অজগরকে প্রাধান্য দেওয়া বাংলা শেখার একটা বড় ভুল। তবে এটা মানতে না চাইলে বলতে হবে, বাঙালির চামড়া মোটা।

ইংরেজিতে আসা যাক। ইংরেজরা গরুর চেয়ে ছাগলের সঙ্গে নিজেদের বেশি মেলাতে পছন্দ করে। তাই তারা নিজের এবং অন্যের সন্তানদের ‘কিড’ বলে ডাকে। অভিধানে স্পষ্ট লেখা আছে, কিড মানে ছাগলের বাচ্চা। এখানে মানুষ ও ছাগল মিলেমিশে একাকার। বাচ্চাদের ‘কাফ’জাতীয় সম্বোধন এখন শোনা যায় না। তাই ইংরেজ মতে গরু আউট, ছাগল ইন। এই অতিরিক্ত জ্ঞানের জোরেই তারা এই উপমহাদেশ দখল করে ২০০ বছর শাসন করেছিল।

গরু থেকে আমরা শুধু হাম্বা-হাম্বাজাতীয় গান ছাড়া আর কিছু পাই না। যদিও রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন, আজকাল ফিগার-সচেতন মায়েরা ফর্মুলা মিল্ককেই বেশি গুরুত্ব দেন। মাতৃদুগ্ধ না পেলে শিশুর মাতৃভাষাও ঠিকমতো শেখা হয় না। যারা ফর্মুলা মিল্ক জোগাড় করতে পারেন না, তারা গরুর দুধ খাওয়ান, ফলে শিশুটি বড় হয়ে গরুতে পরিণত হয়। হয় ষাঁড় হয়ে অন্য গরুর পেছনে ছোটে, নয় তো গরু হয়ে ষাঁড়ের হাতে নির্যাতিত হয়। গরুর দুধের চেয়ে ছাগলের দুধ বেশি উপকারী, এটা মহাত্মা গান্ধীও বলেছেন। তিনি রোজ সকালে এক গ্লাস ছাগলের দুধ পান না করলে সত্যাগ্রহ করতে পারতেন না। ছাগলের প্রতি বিরূপতার কারণেই আজ সত্যের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। ক্ষমতাবানেরা ভুল তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকছে।

কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ছাগলের আওয়াজ। ছাগল ব্যা-অ্যা-অ্যা-অ্যা করে যে শব্দ করে, তাতে ভারতবর্ষের ধ্রুপদি সংগীতের রাগ- রাগিণীর মিশ্রণ আছে। গরুর হাম্বার মধ্যে এত বৈচিত্র্য নেই। ছাগলের ব্যা-ধ্বনি শুদ্ধ না হলে, ছাগমাতা তার বাচ্চাকে বারবার শুদ্ধ করে শেখায়। এটাই ব্যা-করণ। মানুষও ছাগলের মতো ব্যাকরণ চর্চা করেই ভাষা শুদ্ধভাবে শেখার চেষ্টা করে।

বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে এত হাসি-ঠাট্টা করলাম; আসলে বাংলা ভাষার মর্যাদা আমাদের কাছে অনেক। এই ভাষায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল লিখেছেন। এই ভাষায় আমরা গান গাই, কবিতা পড়ি। তাই বাংলা ভাষাকে ভালোবাসুন, শুদ্ধভাবে বলুন, লিখুন।

আর হ্যাঁ, ছাগলকে কোনোভাবেই অবজ্ঞা করবেন না। ছাগলও আমাদের ভাষা শেখাতে পারে!

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত