Ajker Patrika

জ্যামিতি, বিজ্ঞান ও সমাজ

আসিফ
জ্যামিতি, বিজ্ঞান ও সমাজ

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ইউক্লিডের কাছে জ্যামিতি শিখতে আসা এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলেন: ‘এগুলো শিখে আমার কী লাভ হবে?’ ইউক্লিডের উত্তর ছিল: ‘ওকে একটি মুদ্রা দাও, কারণ সে যা শেখে তার বিনিময়ে লাভ চায়।’ এই উত্তর কেবল একটি রসিকতা নয়, বরং জ্ঞানের প্রকৃত স্বরূপের ঘোষণা। জ্যামিতি, কিংবা যেকোনো জ্ঞান, লাভের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়; এটি অর্জনের ব্যাপকতা ও গভীরতার প্রতীক।

খরা, বন্যা, যুদ্ধ—মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিপর্যয়ের দীর্ঘ ছায়া বারবার নেমে এসেছে। তবু এই অন্ধকারের ভেতরেও ইউক্লিডীয় জ্যামিতি টিকে থেকেছে, মানবচিন্তার অগ্রগতিকে আলোকিত করেছে। ২২ শতকের ধারাবাহিকতায় এর অবদান এত গভীর যে কেউ কেউ এর প্রতি আবেগে আপ্লুত হন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাছে এর গুরুত্ব আজও অজানা, যেন অদৃশ্য কোনো সুর যা কেবল কিছু সংবেদনশীল হৃদয়েই প্রতিধ্বনিত হয়। গণিত তাই কেবল একটি বিদ্যা নয়; এটি মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রা। লাভের হিসাবের বাইরে গিয়ে অর্জনের মহিমা উপলব্ধি করা—এটাই ইউক্লিডের উত্তর, এটাই মানবতার উত্তরাধিকার।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞানচর্চা কখনোই বিচ্ছিন্ন ছিল না। ইউক্লিড, হাইপেশিয়া, নিউটন, আইনস্টাইন, ডারউইন, মার্ক্স ও মরগান—এরা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের পথিকৃৎ হলেও তাঁদের চিন্তাধারা একে অপরকে প্রতিফলিত করেছে। জ্যামিতি, পদার্থবিদ্যা, জীববিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান—সবই শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্ব ও তার কাঠামোকে বোঝার প্রচেষ্টা। নৃতাত্ত্বিক লুইস হেনরি মরগান দেখিয়েছিলেন, মানবসমাজ স্থবির নয়। ‘বন্য দশা’ থেকে ‘বর্বর দশা’ পার হয়ে মানুষ যখন ‘সভ্যতার’ সোপানে পা রেখেছে, তার প্রতিটি স্তরের মূলে ছিল উদ্ভাবন আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তন। মরগানের মতে, শিকারিজীবনের যাযাবরবৃত্তি থেকে কৃষিনির্ভর সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ হওয়ার যে প্রক্রিয়া, তা কেবল উদরপূর্তির জন্য ছিল না; বরং তা ছিল প্রকৃতির বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় আনার এক প্রচেষ্টা। জ্যামিতি এই শৃঙ্খলারই গাণিতিক রূপ। ভূমি পরিমাপের প্রয়োজন থেকে যে বিদ্যার শুরু, তা-ই ক্রমে মহাবিশ্বের নকশা বোঝার হাতিয়ার হয়ে উঠল।

সপ্তদশ শতাব্দীতে নিউটন বললেন, বস্তুজগতের গতি ও বলের নিয়ম আছে, যা জ্যামিতির কাঠামোকে প্রভাবিত করে না। বিশ্ব যেন একটি স্থির মঞ্চ, আর বস্তুগুলো সেই মঞ্চে নৃত্যরত। আইনস্টাইন দেখালেন, মঞ্চ ও নৃত্য আলাদা নয়। স্থান ও সময় নিজেই বস্তু ও শক্তির প্রভাবে বাঁক নেয়। ইউক্লিডের স্থির কাঠামো এখানে গতিশীল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কাঠামো ও গতি-প্রকৃতি পরস্পরকে প্রভাবিত করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইন প্রাণিজগতের বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করলেন প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের মাধ্যমে। মানুষকে তিনি প্রকৃতির ধারাবাহিকতায় স্থাপন করলেন—মানুষ কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়, বরং জীববৈচিত্র্যের অংশ। ফলে মানবসমাজকে বোঝার জন্য জীববৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট জরুরি হয়ে উঠল; অনেকটা ইউক্লিড যেমন জ্যামিতিকে নিয়মের কাঠামোয় বন্দী করেছিলেন।

মার্ক্স বলেছিলেন, মানুষ শুধু জীববৈজ্ঞানিক প্রাণী নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রাণী। সমাজের কাঠামো নির্ভর করে অর্থসঞ্চালন ও উৎপাদন সম্পর্কের ওপর। অর্থনৈতিক ভিত্তি বদলালে সামাজিক কাঠামো বদলায়। ইউক্লিড যেমন দেখায়, একটি প্রমাণের ভিত্তি বদলালে পুরো কাঠামো বদলে যায়, তেমনি অর্থনৈতিক ভিত্তি বদলালে সমাজের রূপান্তর ঘটে, স্তর বদলে যায়। যেমন: কৃষিনির্ভর সমাজে ধর্ম ও রাজতন্ত্র প্রভাবশালী, শিল্পবিপ্লবের পর শ্রমিক আন্দোলন ও গণতন্ত্রের উত্থান। সবই দেখায়, মানুষ ও বিশ্ব আলাদা নয়, বরং একে অপরকে গড়ে তোলে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে আমরা এক অবিচ্ছেদ্য আন্তসম্পর্ক লক্ষ্য করি—যেখানে কাঠামো ও গতি-প্রকৃতি, প্রকৃতি ও সমাজ এবং অর্থনীতি ও সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত পরস্পরকে প্রভাবিত করে চলেছে। এই জটিল সম্পর্কের বুনন অনেকটা ইউক্লিডীয় জ্যামিতির মতোই সুসংগত। ইউক্লিড তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘এলিমেন্টস’-এ বিন্দু, রেখা ও তলের মতো মৌলিক ধারণার মাধ্যমে যে জ্যামিতিক জগতের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা কেবল গণিত নয়, বরং মহাবিশ্বের কাঠামোগত ভারসাম্য বোঝার একটি দর্শন। একটি বিন্দু বা রেখার সামান্য বিচ্যুতি যেমন পুরো তলের জ্যামিতিক ভারসাম্য বদলে দেয়, তেমনি সমাজের অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কাঠামোর একটি ক্ষুদ্র পরিবর্তনও সমগ্র সভ্যতার গতিপথকে নতুন রূপ দিতে পারে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুলজীবন থেকেই জ্যামিতির সূত্রগুলো পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত থাকে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা সেগুলো শিখি অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন ও যান্ত্রিকভাবে। এর ফলে ইউক্লিডীয় জ্যামিতির যে একেকটি স্বতঃসিদ্ধ বা উপপাদ্য কেবল গাণিতিক সমাধান নয়, বরং গভীর জীবনদর্শন ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলার অংশ—তা অনুধাবনের সুযোগ আমাদের খুব কমই ঘটে। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের অবহেলা আর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা অনেক সময় উপলব্ধি করতে পারি না যে আধুনিক স্থাপত্য, প্রকৌশল এবং এমনকি মহাকাশবিজ্ঞানের ভিত্তিও এই প্রাচীন জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গণিত ও বিজ্ঞানের সার্থকতা সেখানেই, যেখানে সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে গবেষক—সবাই অনুধাবন করতে পারবেন যে, কয়েক হাজার বছর আগের সেই অকাট্য যুক্তিগুলো কীভাবে আজও আমাদের দৃশ্যমান বস্তুগত জগৎ এবং অদৃশ্য গাণিতিক কাঠামোকে নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

লেখক: বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক মহাবৃত্ত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত