Ajker Patrika

মানসিক স্বাস্থ্য: যাদের কথা শোনা জরুরি

রোকেয়া রহমান বর্ণা
আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৭: ৫৫
মানসিক স্বাস্থ্য: যাদের কথা শোনা জরুরি
ছবি: পেক্সেলস

১.

কুশল বিনিময়ে ‘কেমন আছো?’ বাক্যটি বহুল ব্যবহৃত হলেও আসলেই কি অন্যজনের মনের খবর সঠিকভাবে জানা যায়? কেউ মানসিক কষ্টে থাকলে তিনি কি মনের কথা বলার মতো নির্ভরযোগ্য কাউকে পান? তাঁদের মধ্যে কতজন প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে যান? আর যাঁরা যান, তাঁদের কতজন চিকিৎসা বা কাউন্সেলিংয়ের নির্ধারিত সেশনগুলো শেষ করতে পারেন এবং কাঙ্ক্ষিত উন্নতি লাভ করেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা যেমন জরুরি, তেমনি খুঁজে বের করা প্রয়োজন—কেন অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক সেবা নিতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত তা নিতে পারেন না। আবার যাঁরা সেবা গ্রহণ শুরু করেন, তাঁরা কেন মাঝপথে তা বন্ধ করে দেন কিংবা নির্ধারিত সেশনগুলো শেষ করেও প্রত্যাশিত উন্নতি লাভ করতে পারেন না, সেটিও জানা জরুরি।

এ কারণেই বলা হয়, যাঁরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে কথা না বলে তাঁদের কথা শুনুন, তাঁদের বোঝার চেষ্টা করুন। সবচেয়ে ভালো হয়, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁদের যুক্ত করা গেলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) আহ্বানও কিন্তু তাই। ডাব্লিউএইচও বলছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যাঁদের রয়েছে, এমন মানুষের কথা শুধু শুনলেই হবে না, নীতি নির্ধারণ ও সেবার পরিকল্পনায় তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ পরিবর্তন আনতে হবে তাঁদের জন্য নয়, তাঁদের সঙ্গে নিয়েই। তাই এবার ২০২৬ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য—‘লিভড এক্সপেরিয়েন্সেস হার্ড: রিয়েল ভয়েসেস, রিয়েল চেঞ্জ’। প্রতিপাদ্যটির বাংলায় ভাবার্থ হলো—অভিজ্ঞতার কথা শুনুন: বাস্তব কণ্ঠস্বর ও মতামতকে গুরুত্ব দিন, বাস্তব পরিবর্তন আনুন।

২.

১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিবস পালনের লক্ষ্য হলো মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো, এ-সংক্রান্ত সামাজিক কুসংস্কার বা নেতিবাচক ধারণা দূর করা এবং মানসম্মত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলা। প্রতিবছর দিবসটি উপলক্ষে সভা-সেমিনারসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়। কিন্তু দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে ধীরে। কারণ জীবনমান উন্নয়নে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব যতই স্বীকৃত হোক, বাজেটে তার প্রতিফলন সামান্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০ দশমিক ৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করা হয়। এই ব্যয়ের ৬৭ শতাংশই যায় মানসিক হাসপাতালগুলোয়।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হলো—কোনো ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে তাঁর সঙ্গে কথা না বলে তাঁকে নিয়েই কথা বলতে শুরু করেন কেউ কেউ। আবার মানুষটিকে মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হলেও যে পরিবেশ তাঁর মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে উঠছে, সেটি পরিবর্তনের কথা বলা হয় কতটা? মানসিক কষ্ট কি সব সময় ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সমস্যার ফল, নাকি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের ওপর আরোপিত সামাজিক বিধিনিষেধও মানসিক চাপ তৈরি করে? এভাবে কি ভেবে দেখি?

পাকিস্তানের এক মেয়ের গল্প এখানে খুব প্রাসঙ্গিক। পাকিস্তানে বেড়ে ওঠা সানিয়া ১৭ বছর বয়সে বিষণ্নতায় ভুগলে মানসিক স্বাস্থ্যকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছে, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের মানসিক কষ্টের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক বাধা, স্বাধীনতার অভাব ও জীবনের নানা সীমাবদ্ধতা। পরবর্তী সময়ে ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনায় সফল কর্মজীবন গড়েও তাই তিনি মনোযোগী হয়েছেন দেশটির মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারে। সানিয়ার গল্পটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে ফিচার স্টোরিজ সেকশনে প্রকাশিত হয় গত ৭ অক্টোবর, যেটির শিরোনাম—‘লুকিং বিয়ন্ড দ্য ইন্ডিভিজুয়াল ইন পাকিস্তান, হোয়েন ডিস্ট্রেস ইজ অলসো স্ট্রাকচারাল’।

একইভাবে মানসিক সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে একজন মানুষ এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং এমন কিছু প্রশ্ন সামনে আনতে পারেন, যা শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ধরা যায় না। ঠিক যেমন বদলে দেওয়া যায় না কারও কষ্টময় শৈশব, মুছে ফেলা যায় না অতীতের দুঃসহ ঘটনা। কিন্তু অতীতের কারণে একজন মানুষকে সারাজীবন একই ভয় নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে, এমনটাও নয়। আর সে জন্য প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলাপের। আলাপের সুযোগটা থাকতে হবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব ক্ষেত্রে।

৩.

একটু পরিসংখ্যান না দিলেই নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে চলতি বছরের আগস্টে প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক এক ফিচারে উল্লেখ করা হয়, দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন এবং শিশুদের ১০ জনের মধ্যে একজনের বেশি মানসিক ব্যাধিতে ভুগছে।

বাংলাদেশে ২০১৯ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের প্রাথমিক ফল প্রকাশ করে তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এ জরিপে কারিগরি সহায়তা দেয় ডাব্লিউএইচও। ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ১৮ থেকে ৯৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যজনিত ব্যাধিতে ভুগছিলেন। অথচ আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশই চিকিৎসা পায় না। কাজেই জরিপে শনাক্ত মানসিক স্বাস্থ্যজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের বেশি যখন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি, তখন তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কতটা শিখেছি কিংবা আদৌ শিখতে চাই কি না, সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, বিশ্বব্যাপী চিত্রেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ অ্যাটলাস ২০২৪ অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মাত্র ৪৫ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন বা তদারকিতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবার বা পরিচর্যাকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সহযোগিতার কথা জানিয়েছে। অথচ তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সেবার ঘাটতি চিহ্নিত করে মানুষের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী নীতি ও কর্মসূচি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। এ ছাড়া হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তরের অগ্রগতিও ধীর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, মাত্র ৯ শতাংশ দেশ প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিবর্তে পুরোপুরি সমাজভিত্তিক সেবাব্যবস্থা চালু করতে পেরেছে। অন্যদিকে ৫৩ শতাংশ দেশ এখনো এ ধরনের সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

শেষ করতে চাই ইতিবাচক একটি গল্প দিয়ে। ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স: বাংলাদেশ স্কুলস অ্যাক্ট অন মেন্টাল হেলথ থ্রু ডাব্লিউএইচওর লিভ লাইফ ইনিশিয়েটিভ’ শিরোনামে গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিনার (ছদ্মনাম) গল্প। আগে সে ভাবত, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মানে পাগলামি। তাই নিজের কষ্টের কথা চেপে রাখত। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক ‘লিভ লাইফ’ উদ্যোগের আওতায় আমিনার বিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার পর পরিবর্তন এসেছে তার এ ভাবনায়। সে শিখেছে, মনের কথা বলা জরুরি। এখন সে বন্ধুদের পাশে দাঁড়ায়, প্রয়োজনে শিক্ষকের কাছেও যায়। তার স্কুলের অভিজ্ঞতা দেখায়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা কেবল ধারণা বদলায় না, সাহায্য চাইবার সাহসও জোগায়।

কাজেই বড় উদ্যোগ না হোক, ছোট পরিসরে—প্রতিটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের মতো জায়গাগুলোয় হোক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে কথা বলার সুযোগ। এ সুযোগ থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হোক, যাঁরা নিজেরাই এ সমস্যার ভেতর দিয়ে গেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে আসুক পরিবর্তনের নতুন পথ।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত