
একটা বই পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম, অতিরিক্ত মাছ ধরা কীভাবে বিশ্বকে, পরিবেশকে এবং আমরা যা খাই সেসব খাদ্যকে পরিবর্তন করছে! চার্লস ক্লোভারের লেখা সেই বইটার নাম ‘দ্য এন্ড অব দ্য লাইন’। ক্লোভার একজন পরিবেশ সাংবাদিক, ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার একসময় পরিবেশ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর লেখা এ বইটি নন-ফিকশন বই হিসেবে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ সালে। পরে এ বইয়ের কনটেন্টের ওপর ভিত্তি করে ২০০৯ ও ২০২৭ সালে সিনেমা তৈরি হয়। বইটিতে তিনি আধুনিক মাছ ধরা কীভাবে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করছে, তা বিভিন্ন ঘটনা ও তথ্য উল্লেখ করে বর্ণনা করেছেন। তিনি উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মাছের ব্যবহার অস্থিতিশীল। বইটিতে তিনি বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র আবাসস্থলে, যেমন নিউ ইংল্যান্ডের মাছ ধরার ক্ষেত্র, পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলরেখা, ইউরোপীয় উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে মাছ ধরার ক্ষেত্র ও জাপানের আশপাশের সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরা ইত্যাদি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। বইটির শেষে বিশ্বের মানুষেরা কীভাবে টেকসইভাবে সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিযুক্ত হতে পারে, তিনি তারও পরামর্শ দিয়েছেন।
ক্লোভারের অভিজ্ঞতা হলো, বিশ্বব্যাপী মাছের মজুতের সরকারি পরিসংখ্যানে বেশ কয়েক বছর ধরেই ভুল রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, ১৯৫০ সালে ধরা বন্য বা প্রাকৃতিক মাছের পরিমাণ ৪৪ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ১৯৯০ সালে ৮৮ মিলিয়ন টন, ২০০০ সালে ১০৪ মিলিয়ন টন হয়েছে। এই পরিসংখ্যান ছিল সরকারি তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থাও জানত যে এগুলো সঠিক নয়।
মজার ব্যাপার হলো, এখনো বিপন্ন প্রজাতির মাছ ধরার অনুমতি রয়েছে, এগুলো জেলেরা ধরলেও কেউ নিষেধ করে না। উদাহরণস্বরূপ, ব্লুফিন টুনা মাছের কথা ধরা যাক। বিপন্ন প্রজাতির এই মাছ এখনো অবৈধভাবে ধরা ও বিক্রি করা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যুগে জিপিআরএস ও কম্পিউটারের সাহায্যে একই সময় একসঙ্গে কোনো এলাকার ব্লুফিন টুনার প্রায় পুরো গোষ্ঠীকেই ধরা যায়। এ সুবিধার কারণে যারা মাছ ধরছে তারা দ্রুত সে এলাকায় থাকা ব্লুফিন টুনার মজুত ফুরিয়ে ফেলছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, স্পেনে ব্লুফিন টুনা ধরা পড়ার পরিমাণ দিন দিন দ্রুত কমছে, যা ১৯৯৯ সালে ছিল ৫০০০ মিলিয়ন টন, ২০০০ সালে ২০০০ মিলিয়ন টন, ২০০৫ সালে ৯০০ মিলিয়ন টন।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে সাগর থেকে মাছ ধরা দিন দিন বাড়ছে। একটি পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ১৯৬১ সালে যেখানে পৃথিবীর মানুষেরা প্রত্যেকে গড়ে বছরে ২০ পাউন্ড সামুদ্রিক খাদ্য গ্রহণ করত, সেখানে ২০২১ সালে তার পরিমাণ দাঁড়ায় জনপ্রতি ৪৪ পাউন্ড। সি ফুড বা সামুদ্রিক খাদ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো সামুদ্রিক মাছ। প্রতিবছর সমুদ্র থেকে ১ দশমিক ১ থেকে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন টন সামুদ্রিক মাছ ধরা হয়। সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার প্রবণতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরূপ চাহিদার কারণে সাগর থেকে মাছ ধরা বাড়ছে। চাহিদার চেয়ে এখন বেশি মাছ ধরা হচ্ছে। অতিরিক্ত মাছ ধরা বর্তমানে এক বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে এর ফলে সাগরের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে, প্রাকৃতিক জলজ খাদ্য শৃঙ্খলে নানা রকমের পরিবর্তন ও বিনাশ ঘটছে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাকোয়াটিক অ্যান্ড ফিশারি সায়েন্সেসের অধ্যাপক রে হিলবর্ন বেশ চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, ‘যদি আপনি একেবারেই মাছ না ধরেন, তাহলে স্পষ্টতই আপনি দীর্ঘদিন ধরে কোনো মাছ পাবেন না, আবার আপনি যদি খুব বেশি মাছ ধরেন, তাহলে আপনি খুব বেশি দিন ধরে সেসব মাছ পাবেন না।’ মাছ না ধরা ও বেশি ধরার মাঝের এ জায়গাটা বড্ড রহস্যময়, যা নিয়ে গবেষকদের ভাবার সুযোগ আছে। গবেষকেরা গবেষণা করে মাঝখানের এই তাত্ত্বিক জায়গাটায় সর্বোচ্চ টেকসই ফলনের বিন্দুটি নির্ধারণ করতে পারেন। সরলভাবে হিলবর্ন বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে—যদি বছরের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মৎস্যগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ মাছ প্রাকৃতিক কারণে মারা যায়, তাহলে এর অর্থ হলো জেলেদের একই সময়ের মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি মাছ ধরা উচিত নয়।
সঠিক পরিসংখ্যান, জরিপ, হিসাব ও নজরদারি না থাকায় এ সুযোগে মাছ ধরা লোকেরা বিশ্বব্যাপী সমুদ্র থেকে লুটে নিচ্ছে অতিরিক্ত মাছ। এর ভবিষ্যৎ কী তা তাদের অনেকেরই জানা নেই। কিন্তু অতীতের একটি ঘটনা থেকে সহজেই আমরা সেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করতে পারি। বিংশ শতাব্দীজুড়ে কানাডার উত্তর-পূর্ব উপকূলে যে অতিরিক্ত মাছ ধরা হয়েছিল তার দিকে আমরা নজর দিতে পারি। কানাডিয়ান কড মাছ এতটাই বেশি পরিমাণে ধরা হয়েছিল যে, ১৯৯২ সালের মধ্যে, এই অঞ্চলের কড মাছের সংখ্যা তার ঐতিহাসিক স্বাভাবিক পরিমাণ বা মজুতের ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল। তখন এই কড মাছের প্রজাতিটি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য কানাডিয়ান সরকার সে অঞ্চলে কড মাছ ধরার ওপর স্থগিতাদেশ ঘোষণা করে, যার ফলে ৩০ হাজার মানুষ তাদের কাজ হারায়। তবু সে অঞ্চলে কড মাছের সংখ্যা এখনো আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।
অতিরিক্ত মাছ ধরার প্রভাব যে শুধু সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পড়ছে তা নয়, এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও।
সমুদ্র থেকে মাছ ধরার প্রথম সমস্যা হলো ‘বাই ক্যাচ’। আধুনিক মাছ ধরার সবচেয়ে সাধারণ কৌশল হলো ট্রলিং, যা সাগরে থাকা মাছগুলোর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সমুদ্রে একটি মাছ ধরার জাহাজ এ পদ্ধতিতে সাগরের গভীরে একটি ভারী জাল টানায় সে জালে নির্বিচারে সবকিছু আটকে যায়। এর মধ্যে কিছু থাকে বাণিজ্যিক মাছ, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকে ‘বাই ক্যাচ’। বাই ক্যাচ হলো বাণিজ্যিকভাবে অযোগ্য মাছ বা জলজ জীব, যার বেশির ভাগই মেরে বা আহত করে ফেলে দেওয়া হয়। যার ফলে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হয়, অনেক নিরীহ প্রাণের বিনাশ ঘটে। সাধারণভাবে মাছ ধরার সময় প্রায় ৪০ শতাংশ মাছ বা জীব বাই ক্যাচ হয়, সেসব প্রজাতির ক্ষতি যা হচ্ছে তা তেল বা গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে ১০ লাখ গুণ বেশি। অতিরিক্ত মাছ ধরা সাগরের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলকে নষ্ট করছে। এমনকি অতিরিক্ত মাছ ধরা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে। সমুদ্র বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, যার পরিমাণ প্রতিবছর প্রায় ৩ বিলিয়ন টন, যা বিশ্বব্যাপী সমস্ত নিঃসরণের তিন ভাগের এক ভাগ। অতিরিক্ত মাছ ধরা সাগরের কার্বন পরিশোষণকে কমিয়ে দিচ্ছে। কারণ, শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের প্রাণীরাই এই সব কার্বন শোষণ করে। এসব প্রাণী না থাকলে বা কমে গেলে কার্বন শোষণের পরিমাণও কমে যাবে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনে তার প্রভাব পড়বে।
মানুষ যে সমাধানগুলো করতে পারে তা হলো সাগর থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাছ না ধরা, যাতে আমরা ভবিষ্যতে সেখান থেকে আরও মাছ সংগ্রহ করতে পারি। প্রধানত দুটি প্রধান উৎস থেকে আমরা মাছ পাই—অভ্যন্তরীণ জলাশয়, যেখানে রয়েছে স্বাদুপানির মাছ এবং বিস্তীর্ণ সমুদ্র, যেখানে রয়েছে সামুদ্রিক লোনাপানির মাছ। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে আসে প্রায় ৮৫ শতাংশ মাছ, যার মধ্যে চাষকৃত মাছ প্রায় ২৮ শতাংশ, সাগর থেকে আসে প্রায় ১৫ শতাংশ। বঙ্গোপসাগরে ২০৪ প্রজাতির মাছ আছে। এর কোনো প্রজাতি যেন অতিরিক্ত আহরণ ও বাই ক্যাচের ফলে বিপন্ন হয়ে না পড়ে সে বিষয়েও মৎস্যবিশারদ ও সরকারকে সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণ করা দরকার।
লেখক: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ারের সঙ্গে অসম চুক্তির ব্যাপারটি নতুন ছিল না। সে সময়ও এটা নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা উঠেছিল। তারপরও সে সরকার দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে সে চুক্তি করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আদানির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী বকেয়া টাকা পরিশোধ করেছিল।
৭ ঘণ্টা আগে
পবিত্র রমজান মাস শুরু হয়েছে গতকাল। এ সময় এলেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে একটি বড় পরীক্ষা দিতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সব সময় বলে আসছে, দেশে উৎপাদন ও আমদানি চাহিদার তুলনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বাস্তব ফল উল্টো। ফলমূল, সবজি, মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের মতো এবারেও বেড়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে
আটচল্লিশে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হয়ে এদিন আত্মাহুতি দিয়েছিলেন বাংলার দামাল সন্তানেরা। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং একুশের চেতনার মশাল সমুন্নত রাখার এই সংগ্রাম বায়ান্নতেই...
৭ ঘণ্টা আগে
কেউ যে ঘুষ খায় না—এটাই যে বিস্ময়ের ব্যাপার হতে পারে, সেটা দেখা গেল রংপুরের এক ঘটনায়। কাগজে মোড়ানো এক গিফট বক্স নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটে গেল, তা কাল্পনিক নাটকের ঘটনাকে ছাপিয়ে যায়। শিক্ষা কর্মকর্তার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এক ব্যক্তি গিফট বক্সের ভেতর ৭ লাখ টাকা নিয়ে আসেন।
১ দিন আগে