Ajker Patrika

চাই সুপরিকল্পিত শিক্ষানীতি, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব

মাসুদ-উর রহমান
চাই সুপরিকল্পিত শিক্ষানীতি, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব
পরীক্ষায় নকলের দৃশ্যমান রূপ কমেছে, কিন্তু গভীর অনিয়ম শিক্ষাব্যবস্থায় শিকড় গেড়েছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

আজ থেকে ২৬ বছর আগে আমার শিক্ষকতাজীবনের সূচনা। সেই দীর্ঘ পথচলার নানা বাঁক, অভিজ্ঞতা আর পরিবর্তনের সাক্ষী আমি। শিক্ষকজীবনের বর্ষপূর্তিতে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলাম আ ন ম এহছানুল হক মিলন—তৎকালীন এক তরুণ, উদ্যমী শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীকে। নকলের বিরুদ্ধে তাঁর ঘোষিত যুদ্ধ সে সময় শিক্ষাঙ্গনে সত্যিই আলোড়ন তুলেছিল। শিক্ষক হিসেবে পরীক্ষা কেন্দ্রে সে বছরই আমি প্রথম দায়িত্ব পালন করি। পরীক্ষাকেন্দ্রের গেটে শিক্ষার্থীদের তল্লাশি করা হতো। নকল পাওয়া গেলে বহিষ্কার করা হতো সেখানেই। এ ছাড়া কোনো কক্ষে নকল পাওয়া গেলে বহিষ্কার হতেন সেই কক্ষের দায়িত্বরত শিক্ষক। বুঝতেই পারছেন কেমন শুরুটা ছিল বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর! তাঁর পরীক্ষাকেন্দ্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, কঠোর মনিটরিং, প্রশাসনিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছিল: শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্তত প্রকাশ্য নকলের কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে হবে।

সে সময় পরীক্ষার ধরন ছিল কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নভিত্তিক। অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রায় আন্দাজ করতে পারতেন, কোন প্রশ্নটি কোন বছর আসতে পারে। তাই বাজারে সাজেশন বইয়ের ব্যবসাও ছিল রমরমা। প্রতিটি প্রশ্নের পাশে এক থেকে পাঁচটি ‘স্টার’—ফাইভ স্টার মানেই প্রায় নিশ্চিত ‘কমন’। অনেক শিক্ষার্থী পুরো পাঠ্যবই না পড়ে শুধু ফাইভ স্টার মার্কা প্রশ্নগুলো মুখস্থ করে পরীক্ষায় অংশ নিত। কেউ কেউ বই কেটে ছোট আকারে বানিয়ে হলে নিয়ে যেত, আবার এমন সাইজের বইও ছাপা হতো, যা সহজে লুকিয়ে রাখা যায়। নকল সরবরাহের অভিনব সব কৌশল ছিল—কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে যেন একধরনের উৎসব!

সেই প্রেক্ষাপটে নকলবিরোধী অভিযান চালানো ছিল প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী। কিন্তু দুই যুগ পর দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, নকলের দৃশ্যমান রূপ হয়তো অনেকটাই কমেছে অথচ তার চেয়েও ভয়ংকর, আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও গভীর অনিয়ম শিক্ষাব্যবস্থায় শিকড় গেড়েছে। এখন আর শুধু পরীক্ষার হলে চিরকুট নয়; প্রশ্নপত্র ফাঁস, দেখাদেখি করে লেখা, শিক্ষক কর্তৃক উত্তর বলে দেওয়া, মেধাবী ছাত্র দিয়ে অন্যদের সহায়তা করানো, সুবিধাজনক কেন্দ্র বেছে নেওয়া, মূল্যায়নে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া এমনকি ভুল-শুদ্ধ যা-ই হোক, কিছু লিখলেই নম্বর—এসব যেন অলিখিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে প্রকাশিত রেজাল্টের দিকে দৃষ্টি দিলে মনে হবে পাসের হার শুধু শিক্ষার্থীদের মেধার ওপর নির্ভর করত না, নির্ভর করত সরকারের পলিসির ওপর। এমনও সময় গেছে, প্রধান পরীক্ষকের কাছে উত্তরপত্র জমা দেওয়ার সময় পাসের হার কম হয়ে গেলে রীতিমতো জবাবদিহিতে পড়তে হয়েছে। কোথাও কোথাও ন্যূনতম পাসের হার বেঁধে দেওয়ারও রেওয়াজ ছিল। ছিল ফলাফল ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখার অসৎ চেষ্টা। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তন করা হয়েছিল; তাতেই বহু প্রতিষ্ঠানের ফলে ধস নেমেছিল। এ ঘটনাই প্রমাণ করে, কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখা সাফল্য কতটা ভঙ্গুর।

প্রশ্ন হচ্ছে, সব অনিয়ম একযোগে বন্ধ করে দিলে কী হবে? বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার নেমে আসতে পারে এক অঙ্কে। শত শত প্রতিষ্ঠানে শূন্য শতাংশ পাসের হারও দেখা দিতে পারে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে কলেজে ভর্তির ওপর; কলেজে ছাত্র না এলে শিক্ষক বেতন পাবেন না; বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কমে গেলে উচ্চশিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষানির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যেও ধস নামবে। স্বাভাবিকভাবে শুরু হবে তীব্র দাবিদাওয়া, আন্দোলন, চাপ। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়বে মাধ্যমিক থেকে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত।

অতএব, সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি না করে হঠাৎ কঠোরতা আরোপ করলে কাঙ্ক্ষিত ফলের বদলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষাব্যবস্থা একটি আন্তসংযুক্ত কাঠামো। প্রাথমিক স্তরের দুর্বলতা মাধ্যমিকে প্রভাব ফেলে; মাধ্যমিকের ভঙ্গুরতা উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। মূল্যায়ন পদ্ধতির দুর্বলতা শিক্ষক প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত; আবার রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

এ কারণে প্রয়োজন একটি সামষ্টিক, সুসংহত ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। প্রথমত, জরুরি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন প্রণয়ন, মুদ্রণ ও পরিবহনে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা জোরদার করা, কেন্দ্র বাছাইয়ে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং মূল্যায়নে দ্বৈত কিংবা ত্রৈমাসিক যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মধ্য মেয়াদে পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার জরুরি। মুখস্থনির্ভর প্রশ্নের পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশ্ন বাড়াতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক ও ফলপ্রসূ করতে হবে, যাতে তাঁরা নম্বর প্রদানে ন্যায়সংগত ও পেশাদার আচরণ করেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অস্বাভাবিক ফলের কারণ অনুসন্ধান বাধ্যতামূলক হবে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষাকে শুধু সনদপ্রাপ্তির মাধ্যম না ভেবে দক্ষতা ও মানবিক বিকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে তিনি নৈতিক অবস্থানে দৃঢ় থাকতে পারবেন না। শিক্ষা প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মূল্যায়ন কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা পরীক্ষার মান ও ফলাফল পর্যবেক্ষণ করবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় ঐকমত্য। শিক্ষা কোনো একক সরকারের প্রকল্প নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। তাই স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দল, শিক্ষাবিদ, প্রশাসন, শিক্ষক এবং অভিভাবক—সবার অংশগ্রহণে একটি ন্যূনতম জাতীয় সমঝোতা গড়ে তোলা জরুরি। ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।

নকলের বিরুদ্ধে একদা ঘোষিত যুদ্ধ ছিল একটি প্রয়োজনীয় সূচনা। এখন সময় এসেছে আরও গভীর, কাঠামোগত ও নৈতিক সংস্কারের। শুধু পরীক্ষার হলে চিরকুট বন্ধ করলেই চলবে না; বন্ধ করতে হবে ফল বিকৃতির সংস্কৃতি, কৃত্রিম সাফল্যের মোহ এবং দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা।

শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে আমাদের সাহসী হতে হবে, কিন্তু সে সাহস হতে হবে প্রজ্ঞাবান ও সুপরিকল্পিত। কারণ, শিক্ষা ধ্বংস হলে রাষ্ট্র টেকে না; আর শিক্ষা যদি সত্যিকার অর্থে পুনরুজ্জীবিত হয়, তাহলে তার ইতিবাচক প্রভাব রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হবে।

লেখক: কলেজশিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত