শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা সামাজিক অধিকার। বাংলাদেশ আশির দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যোগদানের পর রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতায় উচ্চশিক্ষা খাতের সম্প্রসারণ, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের উদ্দেশে বেসরকারি খাতে অলাভজনক, মুনাফাহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (আইন ১৯৯২) প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার তিন দশক পরে এ উচ্চশিক্ষা খাত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধ নেই; ক্রমশ তা পণ্য বা সেবায় রূপান্তরিত হচ্ছে। নিত্য-নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন; অধিক টিউশন ফি, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি এই বাণিজ্যিকীকরণের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত। এই প্রক্রিয়ার নামই ‘উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ’।
বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং শিক্ষার প্রসারে নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধিতে বেসরকারি খাতকে সহযোগিতায় সম্পৃক্ত করা। কারণ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমিত আসনসংখ্যা, বাজেট স্বল্পতার বিপরীতে শিক্ষার চাহিদার দ্রুত বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিক্ষাবিষয়ক আকাঙ্ক্ষা- এই তিনটি প্রধান উপাদান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ মুনাফাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের ‘এ ক্যাটাগরি’র কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা ও বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ১৬০-২০০ ক্রেডিট স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার ব্যয় সর্বোচ্চ ১৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, সর্বনিম্ন ১১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আকাশচুম্বী তফাত।
অর্থাৎ শিক্ষাকে একটি বিনিয়োগযোগ্য পণ্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থী হচ্ছে ‘গ্রাহক’ এবং বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ‘সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান’। এর ফলে শিক্ষা প্রক্রিয়ার মানবিক ও বৌদ্ধিক (মেধাভিত্তিক) দিক অনেকাংশে উপেক্ষিত। গবেষণা আর শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার চেয়ে সেমিস্টার আর ভর্তি সংখ্যা বৃদ্ধি, টিউশন ফি বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত প্রদর্শনমূলক উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার, সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক নানা সমস্যা।
সাম্প্রতিক দশকে পাশ্চাত্যমুখী অভিবাসনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণদের সংখ্যা শতকরা প্রায় ৭৯ ভাগ। পরিসংখ্যান বলছে, ‘১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণেরাই বেশি বেকার, যার সংখ্যা ৩৮ লাখ। তাঁরা কোনো কাজকর্ম না করেই বছরের পর বছর চাকরির পেছনে ছুটছে (বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৩)’।
এ তো গেল একাডেমিক পরিসংখ্যান। কিন্তু যেসব শিক্ষার্থী বা তরুণেরা মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শেষে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়নি এবং অর্থের অভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারার হতাশায় বিদেশি শ্রমিক হিসেবে পাড়ি জমিয়েছে বা প্রতারণার শিকার হয়ে চলে আসল, সেসব বেকার তরুণদের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।
অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ টিউশন ফি সমাজে নতুন শ্রেণিবৈষম্য তৈরি করছে। শুধুমাত্র আর্থিকভাবে সক্ষম পরিবারের শিক্ষার্থীরাই এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে; দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার থেকে সরে গিয়ে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির অধিকার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বৈষম্য দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক অসাম্যকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা অনুষদভুক্ত বিষয় সংকুচিত এবং পিএইচডির অনুমোদন নেই। শিক্ষকদের যথেষ্ট চাকরির নিরাপত্তার অভাব; কার্যকরী গবেষণা, উদ্ভাবনের বিপরীতে সাইটেশন মাফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং প্রবণতায় মুনাফা নির্ভর সাবজেক্টে শিক্ষার মান ও চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্যে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করে বের হলেও অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থানে শ্রমবাজারে সরকারি-বেসরকারিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। বেকারত্বের কারণে এসব শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার হার ক্রমবর্ধমান।
জায়গা-জমি বা সঞ্চয় ভেঙে উচ্চশিক্ষা ক্রয় শেষে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার কারণে অনেকেই আত্মসম্মানবোধ হারাচ্ছে। অন্যত্র অবস্থাপন্ন মানুষের শেকড় দুর্বল হচ্ছে। কেউবা জড়িত হয়ে পড়ছে অপরাধপ্রবণতায়। বাড়ছে মাদকাসক্তি এবং নৈতিকতা বিবর্জিত কার্যক্রম। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষার এ বাণিজ্যিকীকরণ একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে। সাম্প্রতিককালে ২০১৫ সালের ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বতঃস্ফূর্ত সম্পৃক্ততা বিগত তিন দশকে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। যেখানে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৩ জন (সমাজবিজ্ঞান সমীক্ষা জার্নাল, সংখ্যা-৮, পৃ-৫৮, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২৫)।
যদিও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ একটি জটিল ও বহুমাত্রিক ইস্যু, যা একদিকে শিক্ষার প্রসার ঘটালেও অন্যদিকে বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং মানগত অবক্ষয়ের মতো সমস্যার সৃষ্টি করছে। তাই শিক্ষাকে একটি মানবিক অধিকার হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য মানবিক গুণাবলি অর্জনে কলার বিষয়গুলো পঠন-পাঠনে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এটিকে জীবনযাত্রা, আয়ের ওপর সামঞ্জস্য রেখে টিউশনির ফি নির্ধারণ করা, প্রান্তিক অঞ্চলের সুযোগ বৃদ্ধি করে শুধুমাত্র মুনাফার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কমানোই হতে পারে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
এই প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ও অভিন্ন সেমিস্টারে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু, নির্ধারিত শিক্ষার্থী ভর্তি, মাননিয়ন্ত্রণ, কারিকুলাম উন্নয়ন, একাডেমিক সামঞ্জস্য এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়া অনস্বীকার্য।
লেখক: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর
ইমেইল: [email protected]

সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার আমলের যে চটকদার গল্পগুলো মানুষকে প্রচণ্ডভাবে বিরক্ত করে তুলেছিল, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কণ্ঠোত্থিত ‘আগামী ঈদ রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমিতে করবে’ এবং ‘বাংলাদেশ হবে বিশ্ববাসীর জন্য আশার বাতিঘর’।
১৩ ঘণ্টা আগে
অনেক সময় অন্যায্যভাবে যদি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র অন্যের ওপর জোরজবরদস্তি করতেই থাকে, একসময় সেই ব্যবস্থার পতন হবে। একসময় না একসময় এর জবাব দিতে হবেই। তাই তো কথায় আছে, ‘দিনে দিনে যত বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ’।
১৩ ঘণ্টা আগে
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে মব সৃষ্টি করে মেদিনী সাগর বিএম মহাবিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়া পদের নিয়োগ পরীক্ষার খাতা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
১৩ ঘণ্টা আগে
আজ পবিত্র শবে কদর। পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য এক বিশেষ উপহার এই রজনী। যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আজ সারা দেশে পালিত হবে এই মহিমান্বিত রাত।
২ দিন আগে