Ajker Patrika

শিক্ষকতাই যদি হয় প্রথম পছন্দের পেশা...

স্বপ্না রেজা
শিক্ষকতাই যদি হয় প্রথম পছন্দের পেশা...
প্রতীকী ছবি

৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদ্‌যাপিত হলো। এ উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শিক্ষকতা হবে মেধাবীদের প্রথম পছন্দের পেশা। শিক্ষাদীক্ষায় মেধাবীরা যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সে লক্ষ্যে সরকার শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে। খুবই ভালো কথা। জনগণকে আশ্বস্ত করার মতোই কথা। কিন্তু এই ধরনের বক্তব্য নতুন নয়, প্রায় সব সরকারের আমলেই দিবস উদ্‌যাপনে এ ধরনের বক্তব্য বলা হয় কিন্তু কার্যকর হতে দেখা যায় কি? জবাব খুঁজে পাওয়া কঠিন। অনেকে মনে করেন, শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সেই অর্থে ঘটেই না এবং শিক্ষক নিয়োগেও সরকার দলীয়করণের ঊর্ধ্বে যেতে পারেনি, পারেও না। বরং শিক্ষা ও স্বাস্থ‍্যব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের অবহেলা ও বেহাল অবস্থাটা রয়েই যাচ্ছে যুগ যুগ ধরে।

পরিবর্তন বলতে যা দেখা যায় তা হলো, যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন তাদের চেতনাগত বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু ও কারিকুলামও পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশের কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অবিকল ধারাবাহিকতা আর থাকে না। ফলে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পারে না। কিংবা জানলেও সেই জানার মধ্যে ভয়ংকর বিভাজন থেকে যায়। এটা এই জাতির জন্য সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় যে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও দেশটার ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি এবং সেটা দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের কারণেই। এমন নির্লজ্জ সত্য সবাই বোঝে। রাজনৈতিক বিভক্তি, বিভাজন, দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধপরায়ণতা ইত্যাদি কারণে জাতিগত ঐক্যের অভাবটাও থেকেই গেছে। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। শিক্ষার বিষয়বস্তু আধুনিক ও উন্নত জীবনমান উপযোগী করে তোলার বিষয়েও সর্বজনীন সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর উদ্যোগ গুরুত্ব পায়নি। উপযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় না বলে অনেকের ধারণা।

যে জাতি যত শিক্ষিত, সেই জাতি তত শক্তিশালী ও উন্নত এবং সমৃদ্ধ তো বটেই। আর যিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত, তিনি হলেন রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর দ্বারাই রাষ্ট্রে শিক্ষিত, মেধাবী সুনাগরিক গড়ে ওঠে। তিনি বা তাঁরা রাষ্ট্রকে সুনাগরিক উপহার দেন। একটা সময় ছিল, যখন শিক্ষকদের জীবনযাপন ছিল অতিসাধারণ। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রদের জ্ঞান দান, শিক্ষিত করে তোলার ব্রত নিয়েই তাঁরা জীবন অতিবাহিত করেছেন। বিনিময়ে অর্থ, প্রাচুর্য নয়, উপরন্তু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে পেয়েছেন অসীম শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা। পাঠশালা, মাস্টারমশাই, গুরুদক্ষিণা শব্দগুলোর প্রচলন ছিল তখন বেশ। কিন্তু ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আসে, বাণিজ্যিক বিষয়টি জ্বলে ওঠে। যার নেপথ্যে কাজ করে পুঁজিবাদের আগ্রাসন ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক স্বার্থ। শিক্ষাব্যবস্থা চলে যায় দলীয় রাজনীতির দখলে, নিয়ন্ত্রণে ও তার চেতনার কারাগারে। এই সুযোগে শিক্ষার্থীদের সঠিক ও গুণগত শিক্ষাদানের আদর্শ থেকে বেরিয়ে শিক্ষকদের একটা অংশকে দেখা গেছে বিত্তবান হওয়ার দৌড়ে যুক্ত হয়েছে। প্রক্রিয়া হিসেবে তারা অলিতে, গলিতে, পাড়া-মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মতো কোচিং সেন্টার খুলে বসে। এভাবে শিক্ষকদের কেউ কেউ তাঁদের শিক্ষাদানের মূল জায়গা তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে সরে আসেন। পাশাপাশি, মূল বই পড়ার চেয়ে নোট সংস্কৃতির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলা হয়। শিক্ষাদান বিষয়টি একরকম বাণিজ্যে পরিণত হয়; যা মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে থেকে যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে মূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কে পড়াচ্ছেন, কী পড়াচ্ছেন, গুণগত ফলাফলইবা কী, সেটা মনিটরিং করার প্রয়োজন বোধ কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না। যা হয়েছে তা সবই লোকদেখানো ও অনুষ্ঠাননির্ভর। তার ওপর আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও যেন প্রতিষ্ঠানগুলোর অবয়বে দলের আধিক্যই দৃশ্যমান করে তোলে, যেখানে শিক্ষার গুণগত চেহারা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।

আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উপযুক্ত ও যোগ্য মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের পরিবর্তে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা কিন্তু নতুন বা কম নয় এবং সেটা সব সরকারের আমলেই পরিলক্ষিত হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক সরকার দলীয়করণ সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে অবস্থান নিতে পেরেছে বলে মনে করে না সাধারণ মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষক সংগঠন তাদের দলের প্রতিনিধিত্ব করে, দলের আধিপত্য কায়েম করে। সোজা কথা, রাজনৈতিক দল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক দলের সম্মুখযুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আবার যেসব শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অরাজনৈতিক থাকেন, তাঁদের ক্ষতি ও ভোগান্তি হয় সীমাহীন।

না বললেই নয় যে গত আড়াই বছরে রাজনৈতিক অজুহাতে শিক্ষকদের যেভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে তাঁদেরই শিক্ষার্থীদের দ্বারা, সেসব ঘটনা ছিল অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং অসভ্যতার চরম দৃষ্টান্ত। স্থানীয় ও শিক্ষার্থীদের দ্বারা অপমানিত হওয়ায় শিক্ষকের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। প্রধান শিক্ষককে জুতার মালা পরানোর, পদত্যাগে বাধ্য করার সংবাদ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। শিক্ষকতার পেশা যেন পরিণত হয়েছে অবাঞ্ছিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত এক পেশায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, এ দেশে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা যেন শেষ হয়ে গেছে। পড়াশোনা করে কেউ যেন আর শিক্ষিত হতে চাইছেন না, বরং রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে দেশ উদ্ধার করাকেই শ্রেয় মনে করছেন তাঁরা এবং এভাবে সহজেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করছে। পড়াশোনা না করেই জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার এই জাদুকরি রাজনৈতিক চেতনা যেন অনেক তরুণের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে। শিক্ষাবিমুখতা নিয়ে যদি কোনো গবেষণা করা হয়, তাহলে এই সত্যের সন্ধান মিলতে পারে বলে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন।

শিক্ষকতাকে মেধাবীর প্রথম পছন্দের পেশা হিসেবে বিবেচনায় আনার জন্য সরকারকে কিছু কাজ করতে হবে। প্রথমত, এই বিষয়ে তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ হতে হবে অরাজনৈতিকভাবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের অর্থনৈতিক-সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান এবং সুযোগ-সুবিধা হতে হবে রাষ্ট্রে কর্মরত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমতুল্য। চতুর্থত, শিক্ষকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সেটা সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে। পঞ্চমত, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ হবে দলীয় রাজনীতিমুক্ত। প্রতিটি ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার সাংবিধানিক হলেও শিক্ষাঙ্গনে ও শিক্ষাব্যবস্থায় তা দৃশ্যমান করা যাবে না। এই ধরনের আচরণ শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে হবে।

আর শিক্ষার কারিকুলাম, বিষয়বস্তু হতে হবে বাংলা ও বাঙালির জীবন, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির উপযোগী এবং বিজ্ঞানসম্মত; যেন জাতিগত অস্তিত্ব সম্মুন্নত রেখে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা যায়। দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব যেন সুরক্ষিত থাকে। জনগণের ভেতর বিভাজন, বিভক্তি তৈরি হয়, ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়—এমন কোনো কিছু পাঠ্যপুস্তকে দেওয়া যাবে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার যদি উল্লিখিত বিষয়গুলো সুনিশ্চিত করতে পারেন তাহলে পরিবর্তন আসবে, নতুবা নয়। একজন ব্যক্তি যখন একটি রাজনৈতিক দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি শুধু দলের অভিভাবক থাকেন, দলের ভালো-মন্দ তাঁকে বুঝতে হয়। কিন্তু যখন সরকারপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন, তখন কিন্তু তিনি দেশের অভিভাবক হন, তাঁর দলের পরিচয় জনগণের কাছে আর মুখ্য থাকে না। আশা করি তারেক রহমান দলের স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দেশের স্বার্থে নিজেকে সমর্পণ করবেন। জনগণই তাঁকে ভোটে নির্বাচিত করেছে, তাই তাদের কাছে তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন।

স্বপ্না রেজা, কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত