অনেকের অনেক আশঙ্কা, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন ও গণভোট। যদিও সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক অনেক অভিযোগ ছিল বা রয়েছে। তবু এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে নির্বাচনে এমন বড় ধরনের কোনো সহিংসতা বা অনিয়মের ঘটনা ঘটেনি, যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। কোথাও কোথাও কিছু জাল ভোট দেওয়া, ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, ভোটকেন্দ্র থেকে প্রতিপক্ষের এজেন্টদের বের করে দেওয়া, কোথাও কোথাও কিছু সংঘর্ষের ঘটনা—এসবই আমাদের দেশের যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের অতি সাধারণ ঘটনা। অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবার খুব কম ঘটনার মধ্য দিয়ে তা সম্পন্ন হয়েছে এবং সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হওয়া সর্বসাধারণের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে খুলনায় দুই পক্ষের হাতাহাতির মধ্যে একজন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। হয়তো ভবিষ্যতে আমরা তেমন একটি আদর্শস্থানীয় নির্বাচনের পর্যায়েও পৌঁছাতে পারব বলে আশা করা যায়।
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই সঙ্গে যে গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, সেটি কিন্তু অনেক বেশি প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। কারণ, প্রথমত অন্তর্বর্তী সরকার একটি পক্ষ হিসেবে গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা বাদ দিলেও, গণভোটের ব্যালট পেপারে ‘হ্যাঁ’র সামনে টিক চিহ্ন এবং ‘না’র সামনে ক্রশ চিহ্ন দিয়ে দেওয়া কতটা আইনসম্মত হয়েছে, সে প্রশ্ন উঠেছে। দ্বিতীয়ত, গণভোটের পোস্টাল ব্যালটে কোনো ক্রমিক নম্বর না দেওয়া কারচুপির কৌশল বলে মনে করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তৃতীয়ত, সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ যখন প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে, তখনো গণভোটের কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
আমরা আশা করতে পারি যে এইসব প্রশ্ন এবং নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো যেসব অভিযোগ তুলেছে, আইন ও বিধিসম্মতভাবেই সেগুলোর নিষ্পত্তি হবে এবং আমরা জনস্বার্থের বিষয়গুলোতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে পারব। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ, তাদের কাজকর্ম—সংস্কার, বিচার, জুলাই সনদ প্রণয়ন, সর্বোপরি ত্রয়োদশ সংসদের নির্বাচন ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠান—এ সবকিছুই হয়েছে জাতীয়ভাবে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে। কিন্তু সেই এগিয়ে যাওয়ার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর কিছু কিছু আগে থেকেই ছিল। আর কিছু নতুন করে গত দেড় বছরে সৃষ্টি হয়েছে। এর সবই মোকাবিলা করতে হবে নতুন সরকারকে এবং মোকাবিলা না করে এগিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে বিএনপি। আশা করা যায় দু-এক দিনের মধ্যেই নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করবে। এরপর শুরুতেই নতুন সরকারকে যে প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হবে তা হলো, রমজান এবং বোরো মৌসুমে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। দেশে বিদ্যুতের উৎপাদনসক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কিছু বেশি থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকায় উৎপাদন কম করতে হয়। আবার গ্যাসের ঘাটতি থাকায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রাপ্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিল বাকি রাখায় ওই কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে ওই কেন্দ্রগুলোর বেশ কিছু বকেয়া পাওনা পরিশোধ করলেও পরে যখন নির্বাচনের পথযাত্রা শুরু হয়ে যায়, তখন থেকে বিল পরিশোধও বন্ধ করে দেয়। ফলে কেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানি তেল আমদানি অসম্ভব হয়ে পড়ে। রমজান এবং বোরো মৌসুমে এই কেন্দ্রগুলোই হবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার প্রধান ভরসাকেন্দ্র। এর পাশাপাশি এলএনজি আমদানিও অব্যাহত রাখতে হবে সর্বোচ্চ সক্ষমতায়। আর্থিক দিক দিয়ে সেটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় যে প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হবে তা হলো, গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন খাতের কয়েক হাজার শিল্প-কারখানা চালু করা। এগুলো বন্ধ হওয়ায় বেকার হয়ে পড়া কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের আর কোনো সহজ পথ নেই। তৃতীয় প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায়ভার। অর্থনৈতিক দায়ভারের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এবং পর্যায়ক্রমে বিমান প্রভৃতি কেনা। আর যে বিষয়টি এই চুক্তিতে রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য আমদানি এবং সেগুলোকে বিশেষ শুল্কসুবিধা দেওয়া, এর যেমন আর্থিক দায়ভার রয়েছে, তেমনি রয়েছে সামাজিক দায়ভারও। কারণ এর ফলে দেশের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাড়তি প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হবে। দীর্ঘ মেয়াদের তাদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটবে। দেশে কৃষিজাত পণ্যের দাম বাড়বে। সেই বাড়তি দামের বোঝা বহন করতে হবে সর্বসাধারণকে, যাদের মধ্যে নিম্ন-মধ্য ও সীমিত আয়ের মানুষের সংখ্যা অনেক। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি অংশ ডিপি ওয়ার্ল্ড নামক একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে এনেছিল, সে বিষয়েও নতুন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এ ছাড়া দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনা, সর্বোপরি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মতো জরুরি কাজেও শুরু থেকেই গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। এগুলোর মধ্যে কোনো কাজই যেমন সহজ নয়, তেমনি তা না করেও সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সামনে এগোতেই হবে। নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সরকারের ওপর জাতি এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে। যদিও পথ বন্ধুর। কিন্তু সময় এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রশাসনসহ দেশের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের আমরা অভিনন্দন জানাচ্ছি। কিছু ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ ভোটার নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন। ছোটখাটো কিছু দুর্ঘটনা ছাড়া বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভালোভাবে...
১৩ ঘণ্টা আগে
বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচনটি হয়ে গেল। ছোটখাটো কিছু অনিয়মকে ঊহ্য রাখলে নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। বড় ধরনের কোনো সংঘাত ঘটেনি। বেসরকারি হিসাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। জামায়াতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জোটটি বিএনপির তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে থেকে সংসদে বসতে যাচ্ছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনপদ্ধতি নয়, এটি একটি জীবনবোধ ও সহনশীলতা চর্চারও জায়গা। আগে যেভাবে কারচুপির অভিযোগ তুলে রাজপথে আন্দোলনের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, এবারের অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী তা ভেঙে পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
২০২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে গঠিত হয় ‘আপৎকালীন’ ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট। ফলে জনগণ প্রত্যাশা করেছিল এই সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে। কিন্তু বহুল আলোচিত ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনে সরকার প্রথমে ব্যর্থ হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল অন্ততপক্ষে ন্যায়সংগত সময়ের
২ দিন আগে