
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দেশের আগামী সরকারের প্রধানমন্ত্রীও হচ্ছেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই গঠিত হবে নতুন মন্ত্রিসভা। এই মন্ত্রিসভায় চমক থাকবে বলে আভাস দিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক সূত্র বলেছে, তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভায় দলের অভিজ্ঞ ও বর্ষীয়ান নেতাদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণদের সমন্বয় ঘটাবেন। তাঁর সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অর্থনীতি সচল করা। গুরুত্ব পাবে ‘মব ভায়োলেন্স’।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের যাত্রা শুরু হবে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে সর্বত্র আলোচনা চলছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার কবে গঠিত হবে, সেই মন্ত্রিসভায় কারা থাকবেন—এসব নিয়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ইতিপূর্বে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলেছেন। নির্বাচনের ছয় দিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর আভাসও দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ করাতে হবে। তবে জাতীয় সংসদের স্পিকার না থাকায় এ নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও সংবিধানেই এর সমাধান আছে। সে অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাতে পারবেন।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন। ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব এক ব্রিফিংয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘সবচেয়ে দ্রুত সময়ে (ক্ষমতা) হস্তান্তর হবে।...এটা তিন দিনের মধ্যে হয়ে যেতে পারে। ১৫, ১৬ ফেব্রুয়ারিতে হতে পারে। আমার মনে হয় না এটি ১৭, ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে।’ এটা স্পষ্ট, সব ঠিক থাকলে নির্বাচনের পর ছয় দিনের মধ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
বিএনপির সূত্র বলেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত বাস্তবতায় এবার সরকার গঠন ও অগ্রাধিকার নিয়ে নতুন চিন্তা করছে দল। নির্বাচনে বিজয়কে ফলপ্রসূ করতে সবার আগে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিচ্ছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। বিরাজমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটাতে ‘মব সন্ত্রাসের’ বিষয়টি অগ্রাধিকারে রাখা হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সরকার কেমন হবে, সেখানে জোটের শরিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি। নির্বাচনে বিজয়ের পর গতকাল শুক্রবার স্থায়ী কমিটির সভা হয়েছে। ওই সভাতেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়।
বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করা শরিক তিন দলের প্রধানও নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁরা হলেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর।
বিএনপির পক্ষ থেকে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং দেশ পরিচালনার কথা বলা হয়েছিল। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৃহস্পতিবার এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বলেছি, যে সকল রাজনৈতিক দলকে একসাথে নিয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম করেছি, আমরা চাই কম-বেশি সকলকে নিয়ে একসাথে দেশ পরিচালনা করতে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত নুরুল হক নুর আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান সব সময় আমাদের বলেছেন, জাতীয় সরকার করতে চান। আমরাও বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামসহ যেকোনো সংকটে ছিলাম। নির্বাচনে আমরা তারেক রহমানের ওপর আস্থা রেখেছিলাম। আগামীতেও আমরা তাঁর ওপর আস্থা রেখে এগোতে চাই।’
সূত্র বলেছে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে কাউকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা আপাতত নেই। তবে জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে বিরোধী দলের বিষয়েও উদারতার দরজা খোলা রাখতে চান বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের ইতিবাচক মতামত ও পরামর্শকেও আমলে নেওয়ার চিন্তা আছে তাঁদের।
বিএনপির সূত্র বলেছে, মন্ত্রিসভা গঠনে নতুন বাস্তবতাকে বিবেচনা করছে দল। দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় ছিলেন বিএনপির এমন একাধিক নেতা বলেন, অতীতে মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভারসাম্য, অঞ্চলভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব ও জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ বিষয়গুলো সব সময়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন বাস্তবতায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী করার ক্ষেত্রে দক্ষতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে; বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র, আইন, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে কঠোর কিন্তু গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দেখা যেতে পারে।
দলের আরেকটি সূত্র বলেছে, দলের চেয়ারম্যান দেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন। নিজের নেতৃত্ব এবং চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মিল আছে এবং যাঁদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন—এমন ব্যক্তিদেরই মন্ত্রিসভায় বেছে নেবেন তারেক রহমান। এই বিবেচনায় মন্ত্রিসভায় অপেক্ষাকৃত তরুণদের প্রাধান্য দেখা যেতে পারে। তবে পরীক্ষিত প্রবীণেরাও মন্ত্রিসভায় থাকবেন, এটিও নিশ্চিত।
দলীয় সূত্র বলছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী ‘মব ভায়োলেন্স’ ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে বিএনপি। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংসতার ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং নতুন সরকারের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন দলের চেয়ারম্যান। এই বাস্তবতায় তিনি এ বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে কঠোর অবস্থানে আছেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ চান।
বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, সরকার গঠনের পর ইশতেহারভিত্তিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির পাশাপাশি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের মনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে এর কোনো বিকল্প নেই।
সরকার গঠন করলে বিএনপির সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে—গতকাল সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনীতিকে সচল করা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা।
নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও দলীয় নেতা-কর্মীদের বিজয় মিছিল বা আনন্দমিছিল না করার নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর আক্ষরিক অর্থ হলো, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে কোনো প্রকার শক্তি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা। এতে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ বা উসকানির ঝুঁকি কমবে এবং সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলার বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
বিএনপির সরকার কেমন হবে জানতে চাইলে দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘যে সরকার হবে, সেই সরকার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক পথযাত্রার পর অনেক গুম, খুন, হামলা-মামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অনেক শহীদের সংগ্রামের ওপর দাঁড়িয়ে। সুতরাং আমাদের নেতা ইনশা আল্লাহ শহীদদের মায়েদের যে প্রত্যাশা, সেটি পূরণ করবেন। আগামীর বাংলাদেশে প্রত্যেক মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করবে, সমস্যার সমাধান করবে। এই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র অটুট রাখবে। এটি আমাদের নেতা সুনিশ্চিত করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

এবারের সংসদ নির্বাচনে খুলনা ও রংপুর বিভাগের অধিকাংশ আসন দখলে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের মাঠে না থাকা এবং জাতীয় পার্টির ভঙ্গুর অবস্থার কারণে তাদের জন্য এটি সহজ হয়েছে।
৬ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭ আসনের বেসরকারি ফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২ আসন। জামায়াত জোট পেয়েছে ৭৭ আসন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিজয়ী হয়েছে একটি আসনে।
১২ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পাওয়ার জন্য বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু।
১২ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাঁরা বিজয়ী হয়েছেন তাঁদের ফলাফলের গেজেট দ্রুত প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে তাঁদের শপথ পড়াবেন কে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
১৩ ঘণ্টা আগে