বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচনটি হয়ে গেল। ছোটখাটো কিছু অনিয়মকে ঊহ্য রাখলে নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। বড় ধরনের কোনো সংঘাত ঘটেনি। বেসরকারি হিসাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। জামায়াতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জোটটি বিএনপির তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে থেকে সংসদে বসতে যাচ্ছে। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার আগে নির্বাচন নিয়ে নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা নানা সংবাদে মনে হয়েছিল নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু জামায়াতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জোট অনেকটা পিছিয়ে থেকেই নির্বাচনী দৌড় শেষ করেছে।
আমাদের দেশে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, ক্ষমতায় আসার পর সে প্রতিশ্রুতি পালনের ক্ষেত্রে তাদের গড়িমসি লক্ষ করা যায়। বিএনপি যদি এই ধারা থেকে দেশকে বের করে আনতে পারে, তাহলে দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার পথে অগ্রসর হতে পারবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কাজটি খুব সহজ নয়, সে কথা বিএনপি নেতাদের মনে রাখতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে যেসব বিষয়ে শঙ্কা এসে বাসা বেঁধেছিল মানুষের মনে, তার মধ্যে একটি ছিল আদৌ নির্বাচন হবে তো? অন্তর্বর্তী সরকার আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকুক—এ রকম প্রচারণাও চালাতে দেখা গেছে। বিভিন্ন সময় শাহবাগে কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের বাসভবন যমুনা ঘেরাও করে এমন সব উপলক্ষ তৈরি করা হয়েছে, যাতে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। সময়মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না বলে অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। কিন্তু সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে নির্বাচনটি হয়ে গেল। নির্বাচনের মাধ্যমে জাতি একটি বড় অস্থিরতা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে বলে মনে করা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে পুলিশ বাহিনী ঠিকভাবে কাজ করতে পারেনি। একধরনের ভীতি তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। সেনাবাহিনীকে নিয়েও কেউ কেউ এমন সব কথা উচ্চারণ করেছে, যা শিষ্টাচারবহির্ভূত। কারও কারও ভাষা দেখে মনে হয়েছে, অশ্লীলতা হয়ে উঠেছে রাজনীতির অঙ্গ। কেউ কেউ বলেছে, একটি দলকে বিদায় করা হয়েছে, অন্য আরেকটি বড় দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য নয়। একসময় এমনও মনে হয়েছিল, মাইনাস টু ফর্মুলার মাধ্যমেই হয়তো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতির মাঠ থেকে হটিয়ে দেওয়া হবে। দেশের জনগণ সে রকম কোনো বন্দোবস্তের ওপর যে আস্থা রাখেনি, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল তারই প্রমাণ। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেল, পুরোনো দলগুলোর প্রতি মানুষ আস্থা হারায়নি। তারা বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে।
এই নির্বাচনের পর নতুন সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করবে, তখন তাদের মনে রাখতে হবে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপদ অনেক। ‘অ্যাবসোলিউট পাওয়ার করাপ্ট অ্যাবসোলিউটলি’—কথাটা সব দেশের সব রাজনৈতিক ক্ষমতাবান দলের জন্যই প্রযোজ্য। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেলে দুর্নীতি ও অনৈতিক আচরণ যে বেড়ে যায়, তার উদাহরণ কি দিতে হবে? যে কেউ যেকোনো স্বৈরাচারী সরকারের দিকে চোখ রাখলেই তা বুঝতে পারবেন। তাই ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেক বেশি সচেতন থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। রাজনীতির মূলমন্ত্র যদি হয় দেশ ও দশের সেবা, তাহলে কীভাবে সে কাজটি করা যায়, সেটাকেই মূল ভাবনা হিসেবে রাখতে হবে। দলের স্থানীয় নেতারা যেন মাস্তান হয়ে না যান, দুর্নীতি দমনের বদলে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি যেন মাথা চাড়া দিয়ে না ওঠে, সেদিকেও রাখতে হবে তীক্ষ্ণ নজর। কাজটি খুব সহজ নয়।
এবারের নির্বাচনের একটি ইতিবাচক দিক হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিজয়ী প্রার্থীকে পরাজিত প্রার্থী অভিনন্দন জানিয়েছেন। রাজনীতিতে পারস্পরিক সম্মানবোধ থাকা জরুরি। রাজনীতি কখনোই প্রতিহিংসার হাতিয়ার হতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনীতি বারবার সেদিকেই ধাবিত হয়। তখন দমনপীড়ন-নিষিদ্ধকরণের রাজনীতি চলতে থাকে। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার চিন্তায় মশগুল ক্ষমতাবানেরা তখন দেশ ও দশের কথা বেমালুম ভুলে যান।
২. দফাওয়ারি যে ইশতেহার দিয়েছে বিএনপি, তার পুরোটা নিয়ে কথা না বলে আজ শুধু তাদের ইশতেহারে বর্ণিত ৯টি প্রতিশ্রুতির কয়েকটি নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা যাক। জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক সংস্কারকে প্রাধান্য দিয়ে এই প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত সরকার এই প্রতিশ্রুতিগুলো পালন করে কি না, সেদিকে নজর রাখবে জনগণ।
ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলা হয়েছে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সুরক্ষার জন্য। বলা হয়েছে কৃষক কার্ডের কথা। কৃষক কার্ডের ব্যাপারে এমন সব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা সহজ না কঠিন, সেটা সময়ই বলে দেবে। মূলত দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কৃষক যে অবদান রাখেন, কখনোই তাঁরা তার প্রতিদান পান না। সুতরাং কৃষকদের আশার আলো দেখানোর জন্য প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করা খুবই দরকার। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করার আগে স্বাস্থ্য খাতে হতে থাকা দুর্নীতি ও অনিয়মগুলো কীভাবে ঘটে এবং কারা তা ঘটায়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। এই খাতটি যে দুর্নীতির ডিপো, সে কথা সংবাদমাধ্যমের দিকে নজর রাখলেই বোঝা যাবে। শিক্ষা খাতে যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে, তাতে শিক্ষানীতি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষানীতি নিয়ে আমাদের ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়, সুতরাং সেটা প্রণয়নের সময় দেশ ও দশের কথা ভাবতে হবে।
এ ছাড়া আর যে প্রতিশ্রুতিগুলো আছে, সেগুলো নিয়েও পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হবে। কিন্তু এই কয়েকটি বিষয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে এতটাই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা না হলে আশাভঙ্গ হবে সাধারণ জনগণ। এ কথা যেন নির্বাচনে সদ্য বিজয়ী দল মনে রাখে। তবে আরেকটি ব্যাপার আলাদাভাবে উল্লেখ করতে চাই। তরুণদের জন্য অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর দিকে তরুণেরা নজর রাখবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি আরও অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সরকার গঠনের পর থেকেই যেন সে প্রতিশ্রুতি পালনের পরিকল্পনা করা হয়।
৩. নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি পালনের কথা ভুলে যাওয়ার যে ঐতিহ্য চালু আছে আমাদের দেশে, তা থেকে যেন বেরিয়ে আসার একটা উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়। আমাদের দেশের মানুষ বারবার রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশ্বাস করে ক্ষমতায় এনেছে, কিন্তু বারবার তারা প্রতারিত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে বের হওয়া দরকার।
সরকারিভাবে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবে। যেসব বিশৃঙ্খলাকে চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অবসান ঘটাতে হবে। সামাজিক চুক্তির জায়গা থেকে বিবেচনা করলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্পর্কগুলো যেন সম্মানজনক হয়ে ওঠে, সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। রবিন হুড-মার্কা রাজনীতি যে জাতীয় রাজনীতিতে অচল, সে বোধোদয় হতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যকে স্থবিরতামুক্ত করতে হবে। গণতান্ত্রিক সহনশীলতা রক্ষা করা, বহুত্ববাদকে সমভাবে বাড়তে দেওয়া, সব ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হলে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে জাতি। এ জাতি সম্ভাবনাময় জাতি। কাজের সুযোগ থাকলে নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করার নজির আছে আমাদের। আর কাজ না থাকলে এই লোকেরাই কতটা ভয়ংকর রকম খারাপ হয়ে উঠতে পারে, তার নজিরও কম নয়। দেশে-বিদেশে মেধাবী এবং সুচতুর ধূর্ত বাঙালির সহাবস্থান দেখা যায়। মুশকিল হয়, যখন সুচতুর ধূর্তরা মেধাবীদের মাথায় চড়ে বসে।
৪. জাতির সামনে আজ বড় পরীক্ষা। নির্বাচন হয়েছে বলে সে পরীক্ষায় পাস করে গেছি, এ রকম মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং সে পরীক্ষার সম্মুখীন হলো জাতি। পাস করা না-করা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের রাজনীতির গতিধারা কোন দিকে ধাবমান হয়, তার ওপর। আপাতত একটি বিষয়েই জনগণ তাদের স্পষ্ট মতামত দিয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়—মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে কোনো আপস নয়। জাতি মুক্তিযুদ্ধের পথরেখা ধরেই এগিয়ে যাবে।

একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রশাসনসহ দেশের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের আমরা অভিনন্দন জানাচ্ছি। কিছু ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ ভোটার নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন। ছোটখাটো কিছু দুর্ঘটনা ছাড়া বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভালোভাবে...
১৩ ঘণ্টা আগে
গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনপদ্ধতি নয়, এটি একটি জীবনবোধ ও সহনশীলতা চর্চারও জায়গা। আগে যেভাবে কারচুপির অভিযোগ তুলে রাজপথে আন্দোলনের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, এবারের অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী তা ভেঙে পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
অনেকের অনেক আশঙ্কা, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন ও গণভোট। যদিও সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক অনেক অভিযোগ ছিল বা রয়েছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
২০২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে গঠিত হয় ‘আপৎকালীন’ ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট। ফলে জনগণ প্রত্যাশা করেছিল এই সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে। কিন্তু বহুল আলোচিত ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনে সরকার প্রথমে ব্যর্থ হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল অন্ততপক্ষে ন্যায়সংগত সময়ের
২ দিন আগে