রুশা চৌধুরী

‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে কী জানি পরান কী যে চায়!’
আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুদিন পরেই বৃষ্টিতে নাজেহাল হয়ে ওঠা মানুষদের এমনটাই মনে হবে। বাইরে হয়তো রোদ তখন তেমন কড়া নয়, আবার কড়াও হতে পারে, শেফালির শাখে বিহগ-বিহগী কে জানে কী গেয়ে যাবে!
শ্রাবণ বাতাসে একলা মানুষটা যার আভাস পেয়েছিল সে বাক্সপেটরা গুছিয়ে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে হাজির। সেই জন হয়তো কোনো নারী অথবা শুধুই একজন মানুষ!
কাঠখোট্টা শহরে দাঁড়িয়েও যারা আকাশের দিকে তাকানোর সময় পায় তাদের বেশ আপন মনে করি। এই যে একটু আগে মলিন জামা গায়ে কিশোরটা ভীষণ অবহেলায় বৃষ্টিভেজা আকাশ তাক করে একটা পাথর ছুড়ে মারল। কী একটা একরোখা রাগ তার চোখে-মুখে। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেরে যাওয়া তার দিনলিপিই যেন এর কারণ! পাশে বসে থাকা ওর খিটখিটে মা ওকে খুব বকে দিল। ওর তাতে কিছুই যায়-আসে না। দিব্যি কৃষ্ণচূড়া গাছটির গায়ে কী যেন আঁকতে শুরু করল।
বাক্সপেটরা হাতে সেই মানুষটা মনে মনে ঠিক করে নিল রোদের দিনে একসময় দেখে নিবে কী এঁকেছিল ছেলেটা। পৃথিবীর সব শিশুদের তার ভীষণ আপন মনে হয়। ঠিক শরতের বৃষ্টি ধোয়া আকাশের মতো—যতই মলিন করে দিতে চাও ওরা কিছুতেই কোমলতা হারাবে না।
আচ্ছা, এই যে সে প্রতিদিন পথে নামে, এ কীসের টান? রোদ হোক, বৃষ্টি হোক, বিপদের আভাস হোক, পথে নামতেই হবে। ব্যাপারটা সব সময় যে ভাবায় তা নয়, শুধু যেদিন অকারণে খুব রাগ হয়, অভিমান উপচে পড়তে থাকে মনের চারধার থেকে, অপ্রকাশিত ব্যথার দল সমস্ত চরাচর আঁধার করে আনে, সে একলা বসে ভাবে, ‘কীসের জন্য এমন টান? কীসের সেই ব্যথা যা আমার ভেতর মহলের বন্ধ দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে ক্লান্ত হয় না?’
ছাদে যায়, বারান্দায় দাঁড়ায়, বৃষ্টি হচ্ছে জেনেও দুই-তিন বালতি কাপড় ধুয়ে ফেলে, খুব কয়েক পদ রান্নাও করে ফেলে কিন্তু ‘পথে’র কথা মন থেকে তাড়াতে পারে না। তার অপ্রকাশিত রাগ-অভিমানের ভার নিতে যেন বেচারা ‘পথ’টার বয়েই গেছে! সবটা বুঝেও এই যে বোকার মতো বুঝতে না চাওয়া, এইখানেই তার মাঝেও হয়তো সেই ‘ফেলে আসা আমি’। এমনটা ভাবাও যে একটা বেশ রকম বোকামি এটা বুঝেও যে ‘বোকাই’ থেকে যায়, তার জন্যই বুঝি শরৎকাল।
এমন প্রিয় বৃষ্টির দিনগুলো স্মৃতি হয়ে যাবে? আসলে কি ‘কেউ’ আছে এমন নামে, বর্ষাকে ফিরিয়ে দিয়ে যাকে আসতেই হয়?
এই যে আবার শরৎকালটাকেই মানুষ বানিয়ে দিতে চাচ্ছি, আর ভাবছি এটাই সত্যি, এখানেই হয়তো আমার তার কাছে হেরে যাওয়া। কতদিন ধরে এমন ‘হেরে যাচ্ছি’ আমি। দিন গড়িয়ে, মাস ছুঁয়ে আজ তা বছরের হাত ছেড়ে যুগের সঙ্গে বসবাস করছে, তবু ‘তার’ একটুও মায়া হলো না আমার জন্য। মনে মনে চেঁচিয়ে বলি, ‘আমারও একদম মায়া নেই তোমার জন্য, তোমাদের জন্য। শুধু মনে রেখ, যে আমায় তৈরি করেছিল সে খুব বেখেয়ালে ছিল তাই আমি এমনধারা মানুষ আর এই সব ভুলভাল সবটা মনে রেখে দিই।’
‘মেয়ে-টেয়ে’ না, আমি একজন সত্যিকার ‘মানুষ’। শক্তিতে, ইচ্ছায় কত কিছু পারি না, জানি না, বুঝি না তবু একজন ‘আস্ত মানুষ’।
আর এখানেই কেমন করে যেন বর্ষা হটিয়ে শরতের আকাশটা এসে দাঁড়ায় আমার সামনে। সে কেমন হেসে হেসে বলে উঠে—‘খুব তো সাহস দেখানো হলো, এবার যাও ওই যে খুব শেওলা পড়েছিল যে পথটার কোণে, সেখানে দেখ কী রাখা আছে তোমার জন্য। সারা দিন পথটার সঙ্গে ঝগড়া করলে কিন্তু দেখ সে তোমাকে কতটা মনে রাখে!’
আড় চোখে দেখে নিই চারপাশ। না, কেউ দেখেনি আমি কেমন হ্যাংলা হয়ে আকাশের দিকে কান পেতে, চোখ মেলে চেয়েছিলাম আর শুনছিলাম। আর দেখলেই বা বয়েই গেল আমার। আজ আমি ‘শরৎ’ নামের সেই নারী। কদিন পরেই ‘শ্রাবণ’ নামের তাকে বিদায় দিব, তাই খুব মন কেমন করছে। নীল শাড়িটা পরবার আগে থেকেই আকাশটাকে বকছিলাম মনে মনে—‘কিচ্ছু যায় আসে না তোমার তাই না! এই যে এত দিনের মেঘগুলো—ভাসছে, উড়ছে, মাতামাতি, ভালোবাসাবাসি করছে, ঝগড়া দিয়ে জীবনটা ওলট-পালট করে দিচ্ছে—তুমি তাদের স্রেফ ভুলে যাবে!’
আকাশ একটুও রাগ হয় না। সে আজ থেকে অন্য দলে। মুচকি হাসি দিয়ে আরও যেন রাগিয়ে দিতে চায়। রাগ পুষে না রেখে সেই পথটার কাছে যেতে থাকি। ওর শরীরেও আজ শ্রাবণের স্পর্শ লেগে আছে। মনটা নরম হতে গিয়েও হয় না।
‘বোকা পথ, সারা জীবন শুধু নিয়মের হুকুম পালন করে গেলে। অত সুন্দর বর্ষাকালটা চলে যাবে, কুর্চি-কদম-কনক চাঁপার জন্য মন কেমন করবে না?’
লেখক: আবৃত্তিশিল্পী

‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে কী জানি পরান কী যে চায়!’
আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুদিন পরেই বৃষ্টিতে নাজেহাল হয়ে ওঠা মানুষদের এমনটাই মনে হবে। বাইরে হয়তো রোদ তখন তেমন কড়া নয়, আবার কড়াও হতে পারে, শেফালির শাখে বিহগ-বিহগী কে জানে কী গেয়ে যাবে!
শ্রাবণ বাতাসে একলা মানুষটা যার আভাস পেয়েছিল সে বাক্সপেটরা গুছিয়ে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে হাজির। সেই জন হয়তো কোনো নারী অথবা শুধুই একজন মানুষ!
কাঠখোট্টা শহরে দাঁড়িয়েও যারা আকাশের দিকে তাকানোর সময় পায় তাদের বেশ আপন মনে করি। এই যে একটু আগে মলিন জামা গায়ে কিশোরটা ভীষণ অবহেলায় বৃষ্টিভেজা আকাশ তাক করে একটা পাথর ছুড়ে মারল। কী একটা একরোখা রাগ তার চোখে-মুখে। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হেরে যাওয়া তার দিনলিপিই যেন এর কারণ! পাশে বসে থাকা ওর খিটখিটে মা ওকে খুব বকে দিল। ওর তাতে কিছুই যায়-আসে না। দিব্যি কৃষ্ণচূড়া গাছটির গায়ে কী যেন আঁকতে শুরু করল।
বাক্সপেটরা হাতে সেই মানুষটা মনে মনে ঠিক করে নিল রোদের দিনে একসময় দেখে নিবে কী এঁকেছিল ছেলেটা। পৃথিবীর সব শিশুদের তার ভীষণ আপন মনে হয়। ঠিক শরতের বৃষ্টি ধোয়া আকাশের মতো—যতই মলিন করে দিতে চাও ওরা কিছুতেই কোমলতা হারাবে না।
আচ্ছা, এই যে সে প্রতিদিন পথে নামে, এ কীসের টান? রোদ হোক, বৃষ্টি হোক, বিপদের আভাস হোক, পথে নামতেই হবে। ব্যাপারটা সব সময় যে ভাবায় তা নয়, শুধু যেদিন অকারণে খুব রাগ হয়, অভিমান উপচে পড়তে থাকে মনের চারধার থেকে, অপ্রকাশিত ব্যথার দল সমস্ত চরাচর আঁধার করে আনে, সে একলা বসে ভাবে, ‘কীসের জন্য এমন টান? কীসের সেই ব্যথা যা আমার ভেতর মহলের বন্ধ দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে ক্লান্ত হয় না?’
ছাদে যায়, বারান্দায় দাঁড়ায়, বৃষ্টি হচ্ছে জেনেও দুই-তিন বালতি কাপড় ধুয়ে ফেলে, খুব কয়েক পদ রান্নাও করে ফেলে কিন্তু ‘পথে’র কথা মন থেকে তাড়াতে পারে না। তার অপ্রকাশিত রাগ-অভিমানের ভার নিতে যেন বেচারা ‘পথ’টার বয়েই গেছে! সবটা বুঝেও এই যে বোকার মতো বুঝতে না চাওয়া, এইখানেই তার মাঝেও হয়তো সেই ‘ফেলে আসা আমি’। এমনটা ভাবাও যে একটা বেশ রকম বোকামি এটা বুঝেও যে ‘বোকাই’ থেকে যায়, তার জন্যই বুঝি শরৎকাল।
এমন প্রিয় বৃষ্টির দিনগুলো স্মৃতি হয়ে যাবে? আসলে কি ‘কেউ’ আছে এমন নামে, বর্ষাকে ফিরিয়ে দিয়ে যাকে আসতেই হয়?
এই যে আবার শরৎকালটাকেই মানুষ বানিয়ে দিতে চাচ্ছি, আর ভাবছি এটাই সত্যি, এখানেই হয়তো আমার তার কাছে হেরে যাওয়া। কতদিন ধরে এমন ‘হেরে যাচ্ছি’ আমি। দিন গড়িয়ে, মাস ছুঁয়ে আজ তা বছরের হাত ছেড়ে যুগের সঙ্গে বসবাস করছে, তবু ‘তার’ একটুও মায়া হলো না আমার জন্য। মনে মনে চেঁচিয়ে বলি, ‘আমারও একদম মায়া নেই তোমার জন্য, তোমাদের জন্য। শুধু মনে রেখ, যে আমায় তৈরি করেছিল সে খুব বেখেয়ালে ছিল তাই আমি এমনধারা মানুষ আর এই সব ভুলভাল সবটা মনে রেখে দিই।’
‘মেয়ে-টেয়ে’ না, আমি একজন সত্যিকার ‘মানুষ’। শক্তিতে, ইচ্ছায় কত কিছু পারি না, জানি না, বুঝি না তবু একজন ‘আস্ত মানুষ’।
আর এখানেই কেমন করে যেন বর্ষা হটিয়ে শরতের আকাশটা এসে দাঁড়ায় আমার সামনে। সে কেমন হেসে হেসে বলে উঠে—‘খুব তো সাহস দেখানো হলো, এবার যাও ওই যে খুব শেওলা পড়েছিল যে পথটার কোণে, সেখানে দেখ কী রাখা আছে তোমার জন্য। সারা দিন পথটার সঙ্গে ঝগড়া করলে কিন্তু দেখ সে তোমাকে কতটা মনে রাখে!’
আড় চোখে দেখে নিই চারপাশ। না, কেউ দেখেনি আমি কেমন হ্যাংলা হয়ে আকাশের দিকে কান পেতে, চোখ মেলে চেয়েছিলাম আর শুনছিলাম। আর দেখলেই বা বয়েই গেল আমার। আজ আমি ‘শরৎ’ নামের সেই নারী। কদিন পরেই ‘শ্রাবণ’ নামের তাকে বিদায় দিব, তাই খুব মন কেমন করছে। নীল শাড়িটা পরবার আগে থেকেই আকাশটাকে বকছিলাম মনে মনে—‘কিচ্ছু যায় আসে না তোমার তাই না! এই যে এত দিনের মেঘগুলো—ভাসছে, উড়ছে, মাতামাতি, ভালোবাসাবাসি করছে, ঝগড়া দিয়ে জীবনটা ওলট-পালট করে দিচ্ছে—তুমি তাদের স্রেফ ভুলে যাবে!’
আকাশ একটুও রাগ হয় না। সে আজ থেকে অন্য দলে। মুচকি হাসি দিয়ে আরও যেন রাগিয়ে দিতে চায়। রাগ পুষে না রেখে সেই পথটার কাছে যেতে থাকি। ওর শরীরেও আজ শ্রাবণের স্পর্শ লেগে আছে। মনটা নরম হতে গিয়েও হয় না।
‘বোকা পথ, সারা জীবন শুধু নিয়মের হুকুম পালন করে গেলে। অত সুন্দর বর্ষাকালটা চলে যাবে, কুর্চি-কদম-কনক চাঁপার জন্য মন কেমন করবে না?’
লেখক: আবৃত্তিশিল্পী

এমনিতে আমরা তুলনামূলকভাবে গরিব ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। মুসলিম সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইরানের প্রতিও আমাদের অবস্থান বরাবরই সহানুভূতিশীল। ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা যতই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক হোক না কেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে...
১৭ ঘণ্টা আগে
দুই সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত একটি বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন আর কেবল মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দরপতনের বিরুদ্ধে নয়; এটি সরাসরি সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
১৭ ঘণ্টা আগে
আমাদের সমাজে নীরবে এক ভয়ংকর সংকট বাড়ছে—প্রবীণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন বাড়ে যত্ন, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ আজ ঠিক তার উল্টো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন...
১৭ ঘণ্টা আগে
সম্পাদকীয়র শিরোনাম দেখে যেকোনো পাঠক ভাবতে পারেন সমাজসেবায় জড়িত কোনো ‘সুপারহিরোদের’ দলের কথা বলা হচ্ছে। তবে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বাসিন্দারা খুব ভালো করেই জানেন এটি কোনো মহানায়কদের দল নয়, বরং চাঁদাবাজি করার জন্য গড়ে ওঠা একটি বাহিনী।
১৭ ঘণ্টা আগে