
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিনা দরপত্রে ১৪টি বিমান কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। নিজেদের আর্থিক সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও এর লাভজনকতা যাচাই-বাছাই না করে বা কোনোরূপ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই ঋণের টাকায় এত বিশাল ব্যয়ে এতগুলো উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি নিয়ে তখন চারদিকেই ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছিল। আর সে সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৩০ আগস্ট খোদ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, বোয়িংয়ের কাছ থেকে বাংলাদেশ আরও ১১টি উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে। এরূপ খবরের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ১ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, ‘কোনো চাপে নয়, প্রয়োজনেই বোয়িং কেনা হচ্ছে।’
এ সূত্রে প্রথমেই জানাই, জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইসিএও) এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা যায় যে, চলতি একুশ শতকের এ পর্যন্ত সময়ের (২০০১-২০২৪) সবচেয়ে ভয়াবহ ২০টি বিমান দুর্ঘটনার মধ্যে ৮টিই ঘটেছে বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজের দ্বারা, ৫টি ফ্রান্সের এয়ারবাসের তৈরি উড়োজাহাজের মাধ্যমে এবং বাকি ৭টি অন্যান্য বিভিন্ন কোম্পানির উড়োজাহাজের যুক্ততায়। এর বাইরে এ সময়ে অন্য যেসব মাঝারি ও ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর মধ্যে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ যুক্ত থাকার হার আরও বেশি। এমনকি বাংলাদেশ বিমানের বহরে থাকা যেসব উড়োজাহাজ বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনা ও কারিগরি ত্রুটির শিকার হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেও বোয়িংয়ের উড়োজাহাজের সংখ্যাই বেশি। আর আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের ক্ষেত্রে বোয়িংয়ের জন্য এরূপ একটি নাজুক পরিস্থিতি বিরাজমান থাকার কারণে বাণিজ্যক দিক থেকে তারা এখন খুবই চাপের মধ্যে আছে। তাদের যান্ত্রিক ও কারিগরি মানের এরূপ বহুসংখ্যক প্রমাণিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক দেশ ও দেশের বিমান সংস্থাই বোয়িংয়ের দিক থেকে ক্রমান্বয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে।
এমনকি শুনলে অবাক হওয়ার মতো ঘটনা যে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বেসরকারি বিমান সংস্থাও এখন তাদের নিজ দেশে উৎপাদিত অর্থাৎ বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজ কিনতে চাচ্ছে না। তো উৎপাদক দেশের বিমান সংস্থা নিজেরাই যদি বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কিনতে না চায়, তাহলে তা অন্যেরা কিনবে কেন? অথচ সেইসব উড়োজাহাজই এখন ভূ-রাজনৈতিক পোষ্যতাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের কাছে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রায় প্রশ্নহীন আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ ও আমিরশাসিত বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থাগুলোও এখন বোয়িং ছেড়ে এয়ারবাস বা অন্যান্য কোম্পানির উড়োজাহাজের দিকে ঝুঁকছে। এমনই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার যে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইসরায়েল, সৌদি আরব ইত্যাদির মতো দেশগুলোর কাছে এসব উড়োজাহাজ গছিয়ে দিতে চাইবে, সেটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই কি বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তাতে সাড়া দেবে?
মোটকথা, নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও যাত্রী-নিরাপত্তার বিবেচনায় বোয়িংয়ের কাছ থেকে এই মুহূর্তে উড়োজাহাজ কিনতে যাওয়ার কোনোই যুক্তি নেই। তা সত্ত্বেও সরকার কেন তা কিনছে, সেটাই এখন প্রশ্ন এবং সেই সঙ্গে প্রশ্ন রয়েছে আরও অনেকগুলো।
এক. নিজেদের প্রয়োজনেই যদি উড়োজাহাজ কিনতে হয়, তাহলে সবচেয়ে উত্তম মূল্যে কোন পদ্ধতিতে কোত্থেকে সর্বাধিক নিরাপদ উড়োজাহাজ কেনা যাবে, তা কি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়েছে?
দুই. বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী বিমানগুলোর মধ্যে গত আড়াই দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ বেসামরিক আকাশযান হচ্ছে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ—এটি জানা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন ঝুঁকি নিয়ে তা কিনছে?
তিন. বিমান যেখানে একটি দীর্ঘকালীন লোকসানি ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান, সেখানে ওইসব লোকসান ও দুর্নীতি বন্ধের উদ্যোগ না নিয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়াই এভাবে একসঙ্গে এতগুলো উড়োজাহাজ কেনা অনেকটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়ে গেল না?
চার. সম্পদের অভাবে সরকারকে যেখানে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতি যেখানে চরম নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এপ্রিলে ১৪টির পর নতুন করে আরও ১১টি বিমান কিনতে যাওয়ার বিষয়টি কি সত্যি কোনো বিবেকবান সিদ্ধান্ত হলো?
পাঁচ. গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে দেশে যেখানে একের পর এক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছে, ডিজেলের অভাবে সেচপাম্প বন্ধ হয়ে আগামী মৌসুমের কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তখন নিজেদের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে যেয়ে এসব উড়োজাহাজ ক্রয় কি কোনো দায়িত্বশীল সরকারের অগ্রাধিকার হতে পারে?
ছয়. উল্লিখিত উড়োজাহাজগুলো বাংলাদেশ বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার ফলে বিমানের লোকসানের পরিমাণ আগামী অর্থবছরগুলোতে ক্রমান্বয়ে কমে আসবে—এমনটি কি সরকার তার পাঁচ বছরের কার্যকালের
মধ্যে প্রমাণ করতে পারবে?
সাত. উল্লিখিত ২৫টি উড়োজাহাজ ধারে কেনার জন্য কমপক্ষে যে ১ লাখ কোটি টাকা লাগবে, তা কি বাংলাদেশ বিমান তার আয় থেকে পরিশোধ করতে পারবে, নাকি তা পরিশোধের জন্য জনগণকেই বাড়তি কর দিতে হবে?
উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর মধ্যে কোনো জটিল কারিগরিতা নেই। খুবই সাদমাটা সরল প্রশ্ন, যা এ দেশের কর পরিশোধকারী ও ভোটদাতা অগণিত সাধারণ মানুষেরও জিজ্ঞাসা। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, সরকার কি এ প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব দেবে বা জবাব দেওয়ার জন্য বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবে? বিরোধী দল কি এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা চায়? এরূপ অন্যায় ও অস্বচ্ছতাপূর্ণ প্রক্রিয়ায় বিমান ক্রয়ের বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কি জনসমক্ষে কোনো প্রতিবাদ জানাবে? বিরোধী দল অসাংবিধানিক গণভোটের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নামতে পারে, কিন্তু তারা অস্বচ্ছ পন্থায় উড়োজাহাজ ক্রয়ের প্রতিবাদ জানাতে পারে না। বরং এ উড়োজাহাজ কেনার ‘সুযোগদানে’র জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার মাত্রা সরকারের চেয়েও একধাপ বেশি হবে বলেই তাদের সাম্প্রতিক কথাবার্তা, চালচলন ও গতিবিধি থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে। আর এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আমলারা তো কিছু বলবেনই না। কারণ, এরাই তো ভেতরে থেকে গত ৫৫ বছর ধরে বিমানকে খুবলে খেতে খেতে এক-একটি শ্বেতহস্তীতে পরিণত করেছে! অথচ পৃথিবীজুড়ে বিমান পরিবহন এখন একটি অতি লাভজনক ব্যবসা।
বিদেশের কাছ থেকে বিমানের জন্য যদি উড়োজাহাজ কিনতেই হয়, তাহলে সেটি তো বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাজ। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াতেই দেখা যাচ্ছে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। বিষয়টি কেমন খটকা লাগছে না? বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে প্রায় একই অবস্থা দেখা গেছে। কাজটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হলেও এটির আগাগোড়াই তখন দেখভাল করতে দেখা গেছে তৎকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই একই ধরনের পদ্ধতিগত ব্যত্যয় এখন একটি নির্বাচিত সরকারের আমলে কেন দেখা যাবে? এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ-ও জানিয়েছেন যে, বিমানের আরও ৭০-৮০টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন। তাঁর এ বক্তব্য কি এ ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, সেগুলোও ক্রমান্বয়ে এভাবে বোয়িং থেকে বিনা দরপত্রে ক্রয় করা হবে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি স্বাক্ষরকরণ ও সে দেশে থেকে এভাবে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি নিয়ে দেশের মানুষ সত্যি উদ্বিগ্ন। এআরটি স্বাক্ষরের পর ইতিমধ্যে মাত্র ৬ মাস পেরিয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলকভাবে উচ্চমূল্যে গম ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রী ক্রয়, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাক-অনুমতি প্রার্থনা, ঋণ করে বিনা দরপত্রে উড়োজাহাজ ক্রয় ইত্যাদি যেসব ভয়াবহ চিত্র সামনে আসছে, তাতে পরবর্তী বছরগুলোতে এ আগ্রাসনের মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বোধ করি সরকারও জানে না। জানে শুধু বাংলাদেশের এ সময়ের মূল বন্ধু ও সুহৃদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র! আর সে বন্ধুত্বেরই নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টির পর আরও ১১টি উড়োজাহাজ কিনতে যাওয়া। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথায় যেগুলো মোটেও কোনো চাপ নয়, শুধুই নির্মল বন্ধুত্ব। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এই বন্ধুত্বের বন্ধন যত নিবিড় হবে, বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ততই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। বাংলাদেশ কি এসব জেনেশুনেও সে ঝুঁকি গ্রহণ করবে?
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক

বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ে আবার নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর সবশেষ তথ্যমতে, গত আগস্টে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এফএওর সার্বিক খাদ্য মূল্যসূচক আগস্টে এক লাফে গড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা আগের মাসের চেয়ে বেশি।
১ ঘণ্টা আগে
শাহানারা আক্তার নামের একজন এনজিওকর্মীকে পটুয়াখালী কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও কলেজটির পরিচালনা -পর্ষদের সভাপতি ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী। অভিযোগ উঠেছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একটি স্পর্শকাতর জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে অযোগ্য ব্যক্
১ ঘণ্টা আগে
সাধারণত সরকারি কর্মচারীদের বেতন পাঁচ বছর পরপর মূল্যায়ন করা উচিত। দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, জীবনযাত্রার ব্যয়ে পরিবর্তন—এসব কারণেই এই পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এর আগে ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়ে আগের বেতনের দ্বিগুণ হয়েছিল।
১ দিন আগে
কেউ যদি এখন জানতে চায়, সরকারের কোন কোন মন্ত্রী রাতে চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে যান। সবাই এক বাকে বলবে বিদ্যুৎমন্ত্রী ছাড়া আপাতত অন্যরা রিলাক্সে ঘুমাতে যান! তবে মাঝেমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে একটু চাপান-উতোর চলে।
১ দিন আগে